ইউরোপের অন্তত নয়টি দেশে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক গণবিক্ষোভের ঢেউ এবার গ্রিসেও ছড়িয়ে পড়েছে।
উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, আবাসনের সংকট, জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি ব্যবস্থার অবনতির কারণে দেশটিতে ছাত্র, শিক্ষক ও তরুণদের নেতৃত্বে তীব্র প্রতিবাদ ও আন্দোলন চলছে।
শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কারের দাবিতে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকায় দেশটির হাইস্কুলগুলোর ক্লাস স্থগিত করেছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়েন লেকর্নু। গত মঙ্গলবার বিভিন্ন শহরে হাইস্কুল অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা।
ইউরোপের অন্তত নয়টি দেশে ছড়িয়ে পড়া ব্যাপক গণবিক্ষোভের ঢেউ এবার গ্রিসেও ছড়িয়ে পড়েছে। হাজার হাজার শিক্ষার্থী, শিক্ষক এবং সরকারি খাতের কর্মীরা রাস্তায় নেমে এসেছেন। এথেন্স ও থেসালোনিকির মতো বড় শহরগুলোতে এই বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করেছে, যা পুরো ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া সামাজিক অস্থিরতারই একটি অংশ।
কর্তৃপক্ষের হিসাবে, মঙ্গলবারের বিক্ষোভে দেশজুড়ে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন।
তবে আয়োজকদের দাবি, শিক্ষার্থী ও কর্মী মিলিয়ে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ। হাইস্কুল শিক্ষার্থীদের একটি ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ২ হাজার হাইস্কুল অবরোধ করা হয়েছিল অথবা ওই দিন বন্ধ রাখা হয়।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি প্যারিস অঞ্চলের একটি হাইস্কুল থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন পরে দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। গত কয়েক সপ্তাহে ক্লাস বর্জন ও স্কুল অবরোধের ঘটনায় ৬ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বেশিরভাগই অপ্রাপ্তবয়স্ক।
স্ট্রাসবুর্গ, লিওঁ ও রেঁনে শহরে বিক্ষোভ একপর্যায়ে সহিংস হয়ে ওঠে। কিছু বিক্ষোভকারী আগুন জ্বালানোর পাশাপাশি পুলিশের দিকে বিভিন্ন বস্তু ছুড়ে দেন। প্যারিসের কয়েকটি এলাকাতেও ময়লার পাত্র দিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে আবর্জনায় আগুন ধরানো হয়। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে।
এই আন্দোলনের মূল কারণগুলো হলো:
জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট: আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি, স্থবির মজুরি এবং জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট সংকট থেকে অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানাচ্ছেন বিক্ষোভকারীরা। মানুষের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা অত্যন্ত কমে যাওয়ায় অনেক পরিবার নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতেই হিমশিম খাচ্ছে।
আবাসন সংকট: বাড়িভাড়া অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় তরুণ প্রজন্মের নাগালের বাইরে চলে গেছে আবাসন। এথেন্সে শিক্ষার্থীরা সিনতাগমা স্কোয়ারে পার্লামেন্টের সামনে তাবু খাটিয়ে অবস্থান নিয়েছে, যার মাধ্যমে তারা সাশ্রয়ী ছাত্রাবাসের তীব্র অভাবকে সবার সামনে তুলে ধরেছে।
ভেঙে পড়া শিক্ষাব্যবস্থা: পর্যাপ্ত তহবিলের অভাব, কর্মী সংকট এবং স্কুল ভবনগুলোর জরাজীর্ণ অবস্থার প্রতিবাদ করছেন শিক্ষক ইউনিয়ন ও শিক্ষার্থী গোষ্ঠীগুলো। প্রাথমিক ও উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষের উন্নত পরিবেশ এবং উচ্চ বেতনের দাবিতে ধর্মঘট ও কর্মবিরতি পালন করছেন।
গ্রিসের এই বিক্ষোভ ফ্রান্স, ইতালি এবং আলবেনিয়ায় সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বড় ধরনের আন্দোলনের দ্বারা অনুপ্রাণিত। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড বহন করছিলেন, যার মধ্যে লেখা ছিল— “গ্রিস থেকে ফ্রান্স—শিক্ষাক্ষেত্রে অর্থ বরাদ্দ করো” এবং “পড়াশোনা করব, নাকি টিকে থাকার লড়াই করব?”।
পরিস্থিতি সামাল দিতে গ্রিক পুলিশ এথেন্সে হাজার হাজার সদস্য মোতায়েন করেছে এবং সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় রয়েছে, যাতে এই বিক্ষোভ অন্য ইউরোপীয় রাজধানীগুলোর মতো সহিংসতা, সম্পত্তির ক্ষয়ক্ষতি বা সংঘর্ষের দিকে মোড় না নেয়।