• ২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৭ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১২ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর : প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে যা জানাল জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট

Usbnews.
প্রকাশিত অক্টোবর ২২, ২০২৬
দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর : প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে যা জানাল জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

সৌদি আরেব দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের চার দিন পর প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি পাঠিয়েছে জেদ্দাস্থ বাংলাদেশ কনস্যুলেট জেনারেলের কার্যালয়। সেই চিঠিতে বলা হয়েছে, দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট জেনারেলকে কিছুই জানায়নি।

সৌদি আরবে গত ১৪ অক্টোবর দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনায় বাংলাদেশে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে, জেদ্দায় অবস্থিত বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল জানিয়েছে, এ বিষয়ে তাদের আগে থেকে কিছু জানানো হয়নি।

সৌদি কর্তৃপক্ষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির পরিচয় প্রকাশ করেছে। তারা হলেন নাজরুল ইসলাম আবদুল বশির এবং সিটি আখতার, যিনি সুইটি আখতার নামেও পরিচিত।

তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা সৌদি আরবে ফৌজদারি মামলায় অভিযুক্ত বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিকদের বিচারপ্রক্রিয়া ও তাদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ সালের পর থেকে সৌদি আরবে অন্তত ১৯ জন বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০১০ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ১৬ জন, ২০২৪ সালে একজন এবং ২০২৬ সালের অক্টোবরে দুজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

গত ১৮ অক্টোবর প্রবাসী কল্যাণে পাঠানো ঐ চিঠিতে জানানো হয়, গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশি নজরুল ইসলাম ও সুইটি আক্তার পৃথক অভিযোগে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে আটক ছিলেন। গত ৩০ সেপ্টেম্বর কনস্যুলেটের পাওয়া বন্দিদের তালিকা অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ১ আগস্ট সৌদি আরবের সাইবার অপরাধ আইনে নজরুলকে আটক করা হয়। পরদিন ব্যভিচারের অভিযোগে আটক করা হয় সুইটিকে। নজরুল জেদ্দা সংশোধনাগারে এবং সুইটি জেদ্দা মহিলা কারাগারে বন্দি ছিলেন। তারা দুই জনই ‘আল মাজাল কোম্পানি’তে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

চিঠিতে বলা হয়, বন্দি তালিকায় ৭ নম্বর কলামে রায় ঘোষিত কয়েদিদের সাজার সংক্ষিপ্ত বিবরণ উল্লেখ থাকলেও ঐ দুই জনের সাজার তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। এছাড়া, সৌদি আরবে সাইবার আইন এবং ব্যভিচারের অপরাধে আগে কোনো বাংলাদেশিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার নজির নেই। জেদ্দা কনস্যুলেটের আওতাধীন সৌদি আরবের পশ্চিমাঞ্চলের কারাগারে বিভিন্ন ধরনের চারিত্রিক মামলায় ৩০৬ বাংলাদেশি আটক আছেন। এর মধ্যে ১৪৭ জনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা ঘোষিত হয়েছে। তাদের সর্বনিম্ন এক মাস এবং সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে, সাইবার বা তথ্যপ্রযুক্তি আইনের অপরাধে মক্কায় অপর তিনটি পৃথক মামলায় সর্বনিম্ন ছয় মাস এবং সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সৌদি আরবের ক্রিমিনাল কোর্টসহ অন্যান্য কোর্টে বর্তমানে অনুবাদক নিয়োগের ক্ষেত্রে ‘মারকাযুত তারজামাহ আল মুওয়াহহাদ’ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুনানি চলাকালে অনুবাদের সহায়তা নেওয়া হয়। এক্ষেত্রে এসব কোর্টে মিশনের পক্ষ থেকে বিচারিক কর্মকাণ্ডে আসামির পক্ষে অনুবাদক হিসেবে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে না। তবে বিচার চলাকালে এই দুই বাংলাদেশির পক্ষে দোভাষী বা আইনি প্রতিনিধিত্ব ছিল কি না, তা চিঠিতে উল্লেখ করা হয়নি।

চিঠির তথ্য অনুযায়ী, দুই বন্দির পরিবারের পক্ষ থেকে আইনি সহায়তা চেয়ে কনস্যুলেটে কোনো আবেদন বা যোগাযোগ করা হয়নি। এছাড়া, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষ অনানুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ দূতাবাস বা কনস্যুলেট জেনারেলকে কিছুই জানায়নি।

প্রসঙ্গত, গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) ঐ দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানায়। পরদিন ১৫ অক্টোবর জেদ্দায় বাংলাদেশ কনস্যুলেট মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত দুই বাংলাদেশির ব্যাপারে বিস্তারিত জানাতে সৌদি আরবের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি কূটনৈতিক পত্র দিয়েছিল। এরপর গত ১৮ অক্টোবর ঢাকায় নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতের কাছে এই কূটনৈতিক পত্র পুনরায় দেওয়া হয়। সর্বশেষ, গত সোমবার জেদ্দার বাংলাদেশের কনস্যুলেট জেনারেল সাখাওয়াত হোসেন সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক ফরিদ বিন সাদ আল সেহেরির সঙ্গে বৈঠক করে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ডের তথ্য বাংলাদেশকে কেন জানানো হয়নি, সৌদি আরবের কাছে তা জানতে চেয়ে আরো একটি কূটনৈতিকপত্র দিয়েছেন।

২০২৪ সালে একজনের মৃত্যুদণ্ড

ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার ২০২৫ সালের ৫ জানুয়ারি প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে সৌদি আরবে ৩৪৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাদের মধ্যে ১৩৮ জন ছিলেন বিদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বাংলাদেশি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৩ সালে সৌদি আরবে ১৭২ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল। ২০২৪ সালে এই সংখ্যা দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে যায়।

মাদকসংক্রান্ত অপরাধসহ বিভিন্ন অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় মানবাধিকার সংগঠনগুলো নতুন করে সমালোচনা শুরু করে। এসব সংগঠন মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

২০২৬ সালের অক্টোবরে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড

সৌদি প্রেস এজেন্সির মাধ্যমে প্রকাশিত দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

সৌদি কর্তৃপক্ষ জানায়, একটি মসজিদের ভেতরে ‘অনৈতিক’ কাজ করার অভিযোগে ওই দুই ব্যক্তি দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন। এ অপরাধে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

ইসলামী আইনের ‘তাআজির’ বিধান অনুযায়ী তাদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। এই বিধানে নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তি নির্ধারণের ক্ষমতা বিচারকের হাতে থাকে।

সৌদি আরবে প্রতিবছর শত শত মানুষের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

ইউরোপীয় সৌদি মানবাধিকার সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশটিতে ৩৪৫ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে রেকর্ড ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।

এই পরিসংখ্যানগুলোতে শুধু বাংলাদেশি নয়, সব দেশের নাগরিকদের হিসাব অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

সৌদি আরবে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি অভিবাসী শ্রমিক কাজ করেন। ফলে দেশটিতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের এই প্রবণতা বাংলাদেশের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়।