ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ স্লোগানটি শুনতে উদার, মানবিক ও সম্প্রীতিপূর্ণ। কিন্তু রাজনৈতিক বক্তব্যের চাকচিক্য দিয়ে কোনো কথার ধর্মতাত্ত্বিক তাৎপর্য নির্ধারণ করা যায় না। একটি বাক্য জনসমর্থন অর্জনের কার্যকর হাতিয়ার হতে পারে, অথচ ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রশ্নে সেটিই হয়ে উঠতে পারে অস্পষ্টতা ও বিভ্রান্তির উৎস। বিশেষত মুসলিম রাজনৈতিক নেতাদের মুখে এই স্লোগান উচ্চারিত হলে এর ভাষাগত সৌন্দর্যের পাশাপাশি এর অন্তর্নিহিত অর্থ, ব্যবহারিক প্রয়োগ এবং আকিদাগত সীমারেখাও বিবেচনায় নিতে হবে। কারণ সম্প্রীতির নামে বিশ্বাসের স্বাতন্ত্র্য বিসর্জন দেওয়া যেমন গ্রহণযোগ্য নয়, তেমনি ধর্মীয় পরিচয়ের দোহাই দিয়ে অন্যের অধিকার অস্বীকার করাও ইসলামের ন্যায়নীতির পরিপন্থী।
রাজনীতির একটি পুরোনো ব্যাধি হলো, জনতুষ্টিকে নীতির জায়গায় বসানো। ভোটের হিসাব যখন বিবেককে নিয়ন্ত্রণ করে, তখন ধর্মীয় মূল্যবোধও প্রচারণার উপকরণে পরিণত হয়। কোনো নেতা যদি মানুষের ভালোবাসা অর্জনের জন্য এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যার অর্থ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও বিশ্বাসের পার্থক্যকে আড়াল করে, তবে সেই বক্তব্যের সমালোচনা হওয়া স্বাভাবিক। রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা অর্জনের জন্য ধর্মীয় সংবেদনশীলতাকে অস্পষ্ট করে তোলা দায়িত্বশীল নেতৃত্বের পরিচয় নয়। ধর্ম কোনো নির্বাচনী পোস্টার নয়, আকিদা কোনো জনসভামুখী স্লোগান নয়, আর বিশ্বাসের প্রশ্ন কোনো মৌসুমি জনসংযোগের কৌশল হতে পারে না।
এখানে একটি মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট রাখা জরুরি, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীর প্রতি সম্মান প্রদর্শন এক বিষয়, আর তার ধর্মীয় বিশ্বাস ও উপাসনাকে নিজের ধর্মীয় উৎসব হিসেবে গ্রহণ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়ানো, সংখ্যালঘু নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তার সম্পদ ও উপাসনালয় রক্ষা করা, সামাজিক সৌজন্য বজায় রাখা এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করা ন্যায়বোধের দাবি। কিন্তু এসব দায়িত্ব পালনের সঙ্গে অন্য ধর্মের উপাসনামূলক আচারকে নিজের ধর্মীয় অংশগ্রহণ হিসেবে গ্রহণ করার কোনো অবধারিত সম্পর্ক নেই। এই পার্থক্য মুছে দিয়ে সম্প্রীতির একমাত্র সংজ্ঞা হিসেবে সব ধর্মীয় উৎসবে সবার অংশগ্রহণকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দুর্বল এবং ধর্মীয়ভাবে বিতর্কিত।
ইসলাম অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রতি অবিচার করতে শেখায় না। পবিত্র কুরআনের সূরা আল-মুমতাহিনার ৮ নম্বর আয়াতে যারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে ধর্মীয় কারণে যুদ্ধ করে না এবং তাদের ঘরবাড়ি থেকে বিতাড়িত করে না, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ নিষেধ করেননি। একই সঙ্গে সূরা আল-কাফিরুনের শেষ আয়াত ‘তোমাদের ধর্ম তোমাদের, আর আমার ধর্ম আমার’ ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্যের একটি সুস্পষ্ট ঘোষণা। এই দুই বক্তব্যকে পরস্পরের প্রতিপক্ষ বানানোর সুযোগ নেই। ইসলামের ন্যায়নীতি মানুষকে তার অধিকার দেয়; ইসলামের আকিদা মুসলমানকে তার বিশ্বাসের সীমারেখা চিনিয়ে দেয়। একটি রক্ষা করতে গিয়ে অন্যটি অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই।
এ কারণেই ‘উৎসব সবার’ কথাটির অর্থ নির্দিষ্ট করা অপরিহার্য। যদি এর অর্থ হয়, কোনো ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে কারও ওপর হামলা হবে না, উপাসনালয় আক্রান্ত হবে না, কেউ বিদ্বেষের শিকার হবে না, রাষ্ট্র সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে এবং নাগরিকেরা পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখবে তবে তা ন্যায়সংগত ও সমর্থনযোগ্য। কিন্তু যদি এর অর্থ দাঁড়ায়, সব ধর্মের উপাসনা ও ধর্মীয় আচার মুসলমানের কাছেও একইভাবে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য, অথবা সম্প্রীতি প্রমাণ করতে প্রত্যেককে অন্যের ধর্মীয় উৎসবে অংশ নিতেই হবে, তবে সেই ব্যাখ্যা ইসলামের বিশ্বাসগত স্বাতন্ত্র্যের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করে। একটি অস্পষ্ট স্লোগানকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়, যাতে সৌজন্য ও ধর্মীয় অনুমোদনকে একাকার করে ফেলা হয়।
অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে মুসলমানের অংশগ্রহণ, শুভেচ্ছা বিনিময় এবং সামাজিক সৌজন্যের সীমা নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। এই মতপার্থক্য গোপন করে এক পক্ষের মতকে সমগ্র ইসলামের একমাত্র সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রচার করা সততার পরিচয় নয়। শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যার আলোচনায় অমুসলিমদের স্বতন্ত্র ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান পাওয়া যায়। অন্যদিকে মিসরের দারুল ইফতা নির্দিষ্ট শর্ত ও ধর্মীয় বিশ্বাসের স্বীকৃতি না দেওয়ার সীমা বজায় রেখে অমুসলিমদের ধর্মীয় উপলক্ষে শুভেচ্ছা জানানোর অনুমোদন দিয়েছে। তবে শুভেচ্ছা জানানো, সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকা এবং সরাসরি উপাসনামূলক আচার পালনে অংশ নেওয়া এক বিষয় নয়, এগুলোর বিধানও এক করে দেখা যায় না।
সুতরাং কোনো রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য বা উপস্থিতির মূল্যায়ন করতে হলে তাঁর সুনির্দিষ্ট কাজ, বক্তব্যের অর্থ, অনুষ্ঠানের প্রকৃতি এবং সংশ্লিষ্ট আলেমদের ফিকহি বিশ্লেষণ বিবেচনা করতে হবে। শুধু একটি স্লোগান উচ্চারণ, ছবি তোলা কিংবা সামাজিক সৌজন্য প্রদর্শনের ভিত্তিতে কারও ঈমানের চূড়ান্ত রায় দেওয়া দায়িত্বজ্ঞানহীনতা। একইভাবে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য ধর্মীয় বিধানকে ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা করাও গ্রহণযোগ্য নয়। সমালোচনার অধিকার যেমন আছে, তেমনি সমালোচনাকে প্রমাণ, জ্ঞান ও ন্যায়নীতির সীমার মধ্যে রাখার বাধ্যবাধকতাও আছে।
মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃত্বের দায়িত্ব দ্বিমুখী। একদিকে তাদের নিশ্চিত করতে হবে, কোনো অমুসলিম নাগরিক ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নিপীড়িত হবেন না, অন্যদিকে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় ও বিশ্বাসের বিষয়ে এমন অস্পষ্টতা তৈরি করা যাবে না, যা সমর্থকদের কাছে নীতিগত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ধর্মীয় পরিচয় গোপন করতে হয় না। অন্যের উপাসনালয় রক্ষা করতে নিজের আকিদা বিসর্জন দিতে হয় না। বরং প্রকৃত নৈতিক সাহস হলো নিজের বিশ্বাসে অবিচল থেকে অন্যের অধিকার রক্ষা করা, সংখ্যাগরিষ্ঠতার শক্তি দিয়ে কাউকে দমন না করা এবং জনপ্রিয়তার জন্য ধর্মকে বিকৃত না করা।
দুঃখজনকভাবে, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ধর্মীয় বক্তব্য অনেক সময় নীতিগত অঙ্গীকারের চেয়ে জনমত ব্যবস্থাপনার উপকরণ হিসেবেই বেশি ব্যবহৃত হয়। কোনো নেতা এক মঞ্চে ধর্মীয় মূল্যবোধের কথা বলেন, অন্য মঞ্চে ভোটের হিসাব অনুযায়ী এমন বক্তব্য দেন, যার ব্যাখ্যা স্পষ্ট নয়। এই দ্বিচারিতা কেবল ধর্মীয় মানুষের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, রাজনীতির নৈতিক ভিত্তিকেও দুর্বল করে। ধর্মকে ব্যবহার করে জনপ্রিয়তা অর্জন করা সহজ হতে পারে, কিন্তু ধর্মীয় নীতি ও রাজনৈতিক আচরণের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রাখাই প্রকৃত নেতৃত্বের পরীক্ষা।
সম্প্রীতির নামে ধর্মীয় পার্থক্য মুছে ফেলার প্রয়োজন নেই, বরং পার্থক্য স্বীকার করেই সহাবস্থান প্রতিষ্ঠা করতে হয়। সবাইকে একই বিশ্বাসে বিশ্বাসী হওয়ার অভিনয় করতে হবে না, একই ধর্মীয় আচার পালন করতে হবে না, কিংবা অন্যের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে নিজের উদারতা প্রমাণ করতে হবে না। প্রয়োজন পারস্পরিক নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও বিবেকের স্বাধীনতা। যে সম্প্রীতি মানুষের বিশ্বাসকে সম্মান করে, সেটিই টেকসই, যে সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বাসের সীমারেখা অস্পষ্ট করতে হয়, তা শেষ পর্যন্ত অবিশ্বাস ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিতে পারে।
‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’ স্লোগানটি তাই অন্ধভাবে গ্রহণ কিংবা নির্বিচারে প্রত্যাখ্যান করার বিষয় নয়, এর অর্থ ও প্রয়োগের বিচার জরুরি। নাগরিক নিরাপত্তা, সামাজিক সৌহার্দ্য ও পারস্পরিক সম্মানের অর্থে এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কিন্তু ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য অস্বীকার করে সব ধর্মীয় আচারকে সবার জন্য সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করার অর্থে এটি ইসলামের আকিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। রাজনৈতিক নেতাদের এই সীমারেখা স্পষ্ট করতে হবে কৌশলী অস্পষ্টতা দিয়ে নয়, নীতিগত সততা দিয়ে।
একজন মুসলিম নেতার গ্রহণযোগ্যতা শুধু তিনি কত মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে সম্প্রীতির কথা বললেন, তার ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে তিনি কতটা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করলেন, কতটা দুর্বল মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করলেন এবং কতটা সততার সঙ্গে নিজের বিশ্বাস ও দায়িত্বের মধ্যে সামঞ্জস্য রাখলেন, তার ওপর। ভোটের জন্য ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করা যায়, কিন্তু সেই ব্যবহার নৈতিক নেতৃত্বের বিকল্প হতে পারে না। অন্যের ধর্মীয় অধিকার রক্ষা করা কর্তব্য; নিজের আকিদাকে রাজনৈতিক স্লোগানের আড়ালে অস্পষ্ট করে ফেলা কোনো কর্তব্য নয়।
❝সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে, জনতুষ্টির অভিনয়ে নয়; ধর্মীয় সহাবস্থান গড়ে উঠুক পারস্পরিক মর্যাদায়, বিশ্বাসের সীমারেখা মুছে দিয়ে নয়।❞
লেখক : জাহেদুল ইসলাম আল রাইয়ান , কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো,মিশর