• ২৬শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১০ই কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৫ই জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

শিক্ষককে আঘাত করার আগে সত্যটা জানা জরুরি—আবেগ নয়, প্রমাণই হোক বিচারের ভিত্তি

Usbnews.
প্রকাশিত অক্টোবর ২৪, ২০২৬
শিক্ষককে আঘাত করার আগে সত্যটা জানা জরুরি—আবেগ নয়, প্রমাণই হোক বিচারের ভিত্তি
নিউজটি শেয়ার করুনঃ
আমার সাত বছর বয়সী ছেলেকে যদি তার স্কুলের কোনো ম্যাডাম চুমু দেন, তাহলে প্রথমেই কি আমি একজন নারী বডিবিল্ডার খুঁজব, যিনি গিয়ে ম্যাডামকে চড় মেরে আসবেন? নাকি আগে বোঝার চেষ্টা করব—ঘটনাটি নিছক স্নেহের বহিঃপ্রকাশ, নাকি এর আড়ালে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত স্পর্শ বা অসৎ উদ্দেশ্য ছিল?
একজন অভিভাবক হিসেবে সন্তানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই আমার দায়িত্ব। কিন্তু একই সঙ্গে অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকারও আমার নেই।
শিক্ষককে পেটানো যেন একশ্রেণির মানুষের কাছে বীরত্ব প্রদর্শনের উপলক্ষ হয়ে উঠেছে! বিশেষত অভিযুক্ত শিক্ষক যদি কোনো মাদরাসার শিক্ষক হন, তাহলে তো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচার, রায় ও শাস্তি—সবকিছুই যেন মুহূর্তের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যায়। অথচ অভিযোগের সত্যতা যাচাই, প্রমাণ পর্যালোচনা এবং ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করার দায়িত্ব কি আমাদের নেই?
আলোচিত মাদরাসাটিতে সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। তাহলে ফুটেজ পরীক্ষা করে ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানা কি সম্ভব নয়?
সংবাদ সম্মেলনে অন্য এক শিক্ষকও এ বিষয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। অথচ প্রকাশ্যে আসা তথ্যের ভিত্তিতে এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না—আসলে কী ঘটেছিল, আদৌ চুমু দেওয়া হয়েছিল কি না, কিংবা ঘটনাটির প্রকৃত তাৎপর্য কী।
তাহলে সিসিটিভি ফুটেজ দেখে সত্যতা যাচাইয়ের আগেই একজন শিক্ষককে আঘাত করার এই প্রবণতাকে কীভাবে সমর্থন করি? আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কি ন্যায়বিচারের পথ হতে পারে?
আমারও তো ইচ্ছা করে, মাসল বানিয়ে এমন পরিস্থিতিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই! কিন্তু মাসল বানানোর উদ্দেশ্য কি আইন অমান্য করে কাউকে আঘাত করা? শক্তি যদি ন্যায় প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে আবেগের বশবর্তী হয়ে অন্যের ওপর প্রয়োগ করা হয়, তাহলে সেই শক্তির প্রশংসা করব কীভাবে?
তবে এ কথাও স্পষ্ট—কোনো শিক্ষক যদি সত্যিই শিশুর প্রতি অনাকাঙ্ক্ষিত বা যৌন উদ্দেশ্যপ্রণোদিত স্পর্শ করে থাকেন, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস চলবে না।
অন্যদিকে, ঘটনাটি যদি নিছক স্নেহের প্রকাশ হয়ে থাকে, তাহলে সেই কারণে একজন শিক্ষককে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করাও অন্যায়। স্নেহ আর অসদাচরণের মধ্যে পার্থক্য নির্ধারণ করতে হবে ঘটনার প্রকৃতি ও প্রমাণের ভিত্তিতে—পূর্বধারণা কিংবা আবেগের ভিত্তিতে নয়।
বিশেষ করে মাদরাসার শিক্ষকদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। সামাজিক বাস্তবতা, প্রতিষ্ঠানের সুনাম এবং শিশুদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় শারীরিক স্পর্শ এড়িয়ে চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। এতে যেমন শিশুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা সহজ হয়, তেমনি ভুল বোঝাবুঝি ও মিথ্যা অভিযোগের ঝুঁকিও কমে। তবে সতর্কতা মানে এই নয় যে, কোনো অভিযোগ উঠলেই শিক্ষককে অপরাধী ধরে নিতে হবে।
আমাদের সমাজে অনেক সময় ব্যক্তিস্বার্থ, অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও রাজনৈতিক প্রভাবও অভিযোগের সঙ্গে জড়িয়ে যেতে পারে। আমার পরিচিত এলাকার একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে এক স্টাফকে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ তুলে তাঁকে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পরে একজন প্রভাবশালী ব্যক্তির স্ত্রী সেই পদে আসীন হন। স্থানীয় শিক্ষকদের অনেকেই ঘটনাটিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ফল বলে মনে করেন, যদিও ভয়ে প্রকাশ্যে কেউ মুখ খোলেননি। এমন অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি—প্রতিটি অভিযোগের পেছনের বাস্তবতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
আমি অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষ নিয়ে অন্ধ সমর্থন দিতে চাই না। আবার একজন ব্যক্তি আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে কাউকে আঘাত করলেন বলেই তাঁকে বীরের আসনে বসাতেও রাজি নই। একই সঙ্গে শিশুর প্রতি কোনো অন্যায় হয়ে থাকলে সেটিকে আড়াল করার পক্ষেও নই।
আমার বক্তব্য খুবই স্পষ্ট—আগে সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য প্রমাণের ভিত্তিতে ঘটনার সত্যতা প্রকাশ করা হোক। তারপর অপরাধী হলে অপরাধীর বিচার হোক, আর নির্দোষ হলে তাঁর সম্মান ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হোক।
বিচারের আগে কাউকে অপরাধী বানানো যেমন অন্যায়, তেমনি প্রমাণিত অপরাধকে আড়াল করাও অন্যায়।
আসুন, আবেগের বশবর্তী হয়ে কাউকে দেবতা কিংবা শয়তান বানিয়ে না ফেলি। সত্য জানি, প্রমাণ দেখি, তারপর কথা বলি।
কারণ, ন্যায়বিচার মানে কাউকে অন্ধভাবে সমর্থন করা নয়; ন্যায়বিচার মানে সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো—সে সত্য যার পক্ষেই যাক না কেন।
– Abdullah AL Mahmud