ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইস ইনাসিও লুলা দ্য সিলভা গতকাল রোববারের নির্বাচনে জয়ী হয়েছেন। এ নিয়ে তিনি নজিরবিহীনভাবে ব্রাজিলের ইতিহাসে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন। দেশটির নির্বাচনী আদালত এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
এই বিস্ময়কর ফলাফল বুথফেরত জরিপ, পূর্ববর্তী রেকর্ড এবং বিশ্বজুড়ে বিদায়ী সরকারের বিরুদ্ধে জনমতের প্রভাবকে পাশ কাটিয়ে পুরো লাতিন আমেরিকাজুড়ে ডানপন্থীদের জয়ের ধারাকে থামিয়ে দিয়েছে।
বিশ্ব রাজনীতিতে বামপন্থীদের অন্যতম প্রতীক এবং এই শতাব্দীতে ব্রাজিলের রাজনীতির সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব লুলা পরাজিত করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট জেইর বলসোনারোর জ্যেষ্ঠ পুত্র, সিনেটর ফ্ল্যাভিও বলসোনারোকে। প্রথম ধাপের নির্বাচনে এগিয়ে থাকায় সিনেটর বলসোনারো আশা করেছিলেন যে তিনি তাঁর বাবার চরম-ডানপন্থী আন্দোলনকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারবেন।
দুর্নীতি কেলেঙ্কারি এবং নিত্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির ফলে বছরের পর বছর ধরে ভোটাররা লুলার নেতৃত্বাধীন ওয়ার্কার্স পার্টির ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন। ফলে একসময় লুলার পুনর্নির্বাচন অনেকটাই অনিশ্চিত মনে হচ্ছিল। এ ছাড়া অ্যাপভিত্তিক আধুনিক অর্থনীতি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের ক্রমবর্ধমান কর্মীদের কাছে সাবেক এই মেটালওয়ার্কার ও শ্রমিক নেতা কিছুটা বেমানান বা যুগের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়েছিলেন।
ব্রাজিলের নির্বাচনে বামপন্থী নেতা ও বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা তার প্রতিদ্বন্দ্বী সিনেটর ফ্লাভিও বলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েছেন। রোববারের দ্বিতীয় দফার ভোটে বৈধ ভোটের ৫১ দশমিক ৭৯ শতাংশ, অর্থাৎ ৬ কোটি ৪০ লাখের বেশি ভোট পেয়েছেন লুলা। অন্যদিকে বলসোনারো পেয়েছেন ৪৮ দশমিক ২১ শতাংশ ভোট।
১৯৮০-এর দশকে ব্রাজিলে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর লুলাই প্রথম প্রার্থী যিনি প্রথম ধাপের নির্বাচনে দ্বিতীয় স্থানে থাকা সত্ত্বেও চূড়ান্তভাবে বিজয়ী হয়েছেন। ২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা লুলা বাস্তববাদিতা ও জনপ্রীতিবাদের (পপুলিজম) এক শক্তিশালী মিশ্রণে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। গত অর্ধশতক ধরে জাতীয় রাজনীতিতে এই কৌশলই তাঁকে পরিচিতি দিয়েছে। এর অংশ হিসেবে তিনি শ্রমিক ও দরিদ্র ব্রাজিলীয়দের জীবনমান উন্নত করতে বেশ কিছু সংস্কার বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন।
প্রচারণার শেষ দিকে তিনি দেশজুড়ে বিনা মূল্যে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে গণপরিবহন সেবা (যা কংগ্রেসে আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করতে হবে) থেকে শুরু করে তাঁর স্বপ্নের সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচির তহবিল ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি করার মতো প্রতিশ্রুতি দেন, যা ইতিমধ্যেই বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এ ছাড়া লুলা একটি সাংবিধানিক সংশোধনীর পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখেন, যা বিগত কয়েক দশকের মধ্যে ব্রাজিলের সবচেয়ে বড় শ্রম সংস্কার হিসেবে কংগ্রেসে ব্যাপক সমর্থনে পাস হয়।
ট্রাম্প বলেন, নির্বাচন নিয়ে যেন কোনো ধরনের বিতর্ক না থাকে। তার মতে, ব্রাজিলের এই নির্বাচন আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে নেতিবাচক চিত্র তুলে ধরেছে।
সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘নির্বাচন হতে হবে সন্দেহাতীত। কিন্তু আমার কাছে এটিকে খুবই খারাপ মনে হয়েছে।’
নির্বাচনে কোনো প্রার্থীকে সমর্থন না দেওয়া বা কোনো পক্ষ না নেওয়ার দাবি পুনর্ব্যক্ত করলেও ভোটের প্রক্রিয়ার সমালোচনা অব্যাহত রাখেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, ‘আমি নির্বাচনটি দেখেছি। এটিকে অত্যন্ত দুর্নীতিগ্রস্ত ও ভয়াবহ মনে হয়েছে।’
তা সত্ত্বেও, লুলার এই চতুর্থ মেয়াদটি সবচেয়ে কঠিন হতে পারে। কারণ, দেশটিতে ১৯৮০-এর দশকে গণতন্ত্র ফিরে আসার পর সবচেয়ে রক্ষণশীল কংগ্রেস (সংসদ) নির্বাচিত হয়েছে। বলসোনারোর লিবারেল পার্টি (পিএল) এবং তাদের মিত্র দলগুলো যৌথভাবে নিম্নকক্ষে ২৮০টিরও বেশি আসন এবং সিনেটে ৫০টি পর্যন্ত আসন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যা উভয় কক্ষে তাদের সুবিধাজনক সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেবে।
গাজায় ইসরায়েলের আগ্রাসন নিয়ে লাতিন আমেরিকার সাধারণ মানুষের মধ্যে যখন ক্ষোভ ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে, তখন অঞ্চলটির রাষ্ট্রক্ষমতা যেন হাঁটছে ঠিক উল্টো পথে। একের পর এক নির্বাচনে ডানপন্থি ও জনতুষ্টিবাদী নেতাদের উত্থান ঘটছে, আর তাদের অনেকেই ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা, সামরিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ককে নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের অংশ করে তুলছেন।
কলম্বিয়া, বলিভিয়া, পেরুসহ একাধিক দেশে বামঘেঁষা নীতির বদলে ডানদিকে এই মোড় এখন স্পষ্ট। অপরাধ, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ক্ষোভে ভোটাররা যখন ‘শক্ত হাতে’ শাসনের প্রতিশ্রুতিতে ঝুঁকছেন, তখন সেই রাজনৈতিক পালাবদলের সুযোগেই ইসরায়েলপন্থি শক্তি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছে।
লাতিন আমেরিকাজুড়ে এক বিভাজন তৈরি হচ্ছে। একের পর এক জনমত জরিপে দেখা যাচ্ছে, অঞ্চলটির জনগণ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্রমশ অবস্থান নিচ্ছে। গাজায় ইসরায়েলের তিন বছরব্যাপী অভিযানকে শীর্ষস্থানীয় বহু গবেষক ও মানবাধিকার সংগঠন ব্যাপকভাবে গণহত্যা হিসেবে বিবেচনা করছে। কিন্তু এল সালভাদর, আর্জেন্টিনা, চিলি, ইকুয়েডর, পেরু, বলিভিয়া, হন্ডুরাস, কোস্টারিকা এবং এখন কলম্বিয়ায় নতুন একের পর এক ডানপন্থি সরকারের উত্থান সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। এসব সরকার ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা, কূটনীতি ও প্রযুক্তিগত সম্পর্ক আরও গভীর করছে, একই সঙ্গে ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে মৌলিক অধিকারটুকুও অস্বীকার করছে।
ব্রাজিলের দণ্ডিত সাবেক প্রেসিডেন্টের ছেলে ফ্লাভিও বলসোনারো বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভার বিরুদ্ধে নিজের নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন নেতানিয়াহুর ভিডিও সমর্থন নিয়ে। তাঁর পাশে রয়েছে আর্জেন্টিনার নেতা হাভিয়ের মিলেইয়ের উগ্র সমর্থন। মিলেই নিজেকে ‘ইসরায়েলের এক ফ্যানাটিক বা পাগল ভক্ত’ বলে অভিহিত করেছেন এবং তিনিও আর্জেন্টিনার দূতাবাস অধিকৃত জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছেন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা প্রতিটি ডানপন্থি প্রার্থীই কে কার চেয়ে বেশি ইসরায়েলপন্থি এবং তথাকথিত ‘সন্ত্রাসীবিরোধী’ হতে পারেন, সেই প্রতিযোগিতায় নেমেছিল ।
এর বিপরীতে বর্তমান প্রেসিডেন্ট লুলা এখনো লাতিন আমেরিকার হাতে গোনা কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রপ্রধানের একজন, যিনি গাজায় ইসরায়েলের অভিযানকে গণহত্যা বলতে প্রস্তুত। এমনকি তিনি এটিকে হলোকাস্টের সঙ্গেও তুলনা করেছেন, যার ফলে বিভিন্ন মহলে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
ব্রাজিল ও মেক্সিকো উভয় দেশই তাদের এই অবস্থানের কারণে ওয়াশিংটনের ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে রয়েছে। মেক্সিকো বর্তমানে ইহুদি বংশোদ্ভূত বামপন্থি প্রেসিডেন্ট ক্লদিয়া শেইনবাউমের নেতৃত্বে পরিচালিত হচ্ছে। দুই দেশই অর্থনৈতিক যুদ্ধ, হামলার হুমকি, নিষেধাজ্ঞা এবং এমন সন্ত্রাসী তকমার চাপের মুখে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে সামরিক অনুপ্রবেশের পথ খুলে দিতে পারে।