মার্কিন রাজনৈতিক ইতিহাসে কোনো ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় গণপ্রত্যাখ্যানগুলোর একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের ঐতিহাসিক বিজয়কে।
নির্বাচনে বেশ কিছু অঙ্গরাজ্যে উল্লেখযোগ্য রদবদল দেখা গেছে। সাউথ ক্যারোলাইনায় ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও শিশু বিশেষজ্ঞ অ্যানি অ্যান্ড্রুজ প্রয়াত দীর্ঘদিনের সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের বোন রিপাবলিকান ডারলিন গ্রাহামকে পরাজিত করেছেন, যেখানে ১৯৯৮ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট জয় পায়নি। নর্থ ক্যারোলাইনায় সাবেক গভর্নর ডেমোক্র্যাট রয় কুপার তার রিপাবলিকান প্রতিপক্ষ মাইকেল হোয়াটলিকে পরাজিত করেছেন।
রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত টেক্সাসে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও সেমিনারি ছাত্র জেমস ট্যালারিকো অঙ্গরাজ্যের অ্যাটর্নি জেনারেল কেন প্যাক্সটনকে হারিয়ে চমক দেখিয়েছেন, যেখানে ১৯৯৪ সালের পর কোনো ডেমোক্র্যাট জয়ী হয়নি। ওহাইওতে ডেমোক্র্যাট শেরড ব্রাউন বিদায়ী রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডকে পরাজিত করেছেন।
ক্যানসাসে মেগাচার্চের ডেমোক্র্যাট যাজক অ্যাডাম হ্যামিল্টন বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে পরাজিত করেছেন, যা ১৯৩২ সালের পর রাজ্যটিতে ডেমোক্র্যাটদের প্রথম জয়।
অন্যান্য আসনের মধ্যে আলাস্কা, আইওয়া, ক্যানসাস, মেইন, ওহাইও, টেক্সাস এবং মিশিগানের আসনগুলোকে মূল তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে অন্তত সাতটি সিনেট আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা ছিল। অঙ্গরাজ্যগুলো হলো আলাস্কা, আইওয়া, কানসাস, মেইন, ওহাইও, টেক্সাস ও মিশিগান। তবে টেক্সাস ও কানসাস সাধারণত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের তালিকায় থাকে না। কারণ, অঙ্গরাজ্য দুটি রিপাবলিকানদের শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। কানসাসে সর্বশেষ ১৯৩২ সালে কোনো ডেমোক্র্যাট সিনেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বড় ধরনের বিপর্যয়ের পাশাপাশি দেশজুড়ে বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা দেশটির রাজনীতিতে নতুন ইতিহাস গড়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর
নিউ মেক্সিকোর গভর্নর নির্বাচিত হয়ে ইতিহাস গড়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ডেব হালান্ড। রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক মেয়র গ্রেগ হালের বিরুদ্ধে জয়ী হয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম আদিবাসী নারী গভর্নর হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা প্রয়োগের চেষ্টা, ইরানে অজনপ্রিয় যুদ্ধ, জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয়, প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা, দুর্নীতির অভিযোগ এবং মুখোশধারী এজেন্টদের অভিবাসী ধরপাকড়-সবকিছুর বিরুদ্ধে রায় দেয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন মার্কিন ভোটাররা।
তারা সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনে ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (মাগা) শিবিরের একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে দিয়েছেন। প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট-কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ তুলে দিয়েছেন ডেমোক্র্যাটদের হাতে। রিপাবলিকানদের শক্ত ঘাঁটিগুলোতেও নীল ঢেউ আছড়ে পড়ে পুনরুজ্জীবিত হয়েছে মার্কিন সংবিধানের ক্ষমতার ভারসাম্য ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।

আরেকটি ইতিহাস গড়েছেন মিনেসোটার লেফটেন্যান্ট গভর্নর পেগি ফ্লানাগান। রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক এনএফএল সাইডলাইন প্রতিবেদক মিশেল টাফয়াকে হারিয়ে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম আদিবাসী নারী সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন। হোয়াইট আর্থ ব্যান্ড অব ওজিবওয়ে জনগোষ্ঠীর সদস্য ফ্লানাগান।
জর্জিয়ার গভর্নর নির্বাচনেও ঘটেছে ঐতিহাসিক পরিবর্তন। ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কেইশা ল্যান্স বটমস বিজয়ী হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো অঙ্গরাজ্যের গভর্নর হিসেবে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী নির্বাচিত হওয়ার ইতিহাস গড়েছেন তিনি।
এদিকে মিশিগান থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়ে নতুন ইতিহাস গড়েছেন আবদুল এল-সায়েদ। রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সের বিরুদ্ধে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে জিতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেছেন।
টেক্সাসেও গভর্নর নির্বাচনে ঘটেছে ঐতিহাসিক ঘটনা। বর্তমান গভর্নর গ্রেগ অ্যাবটকে প্রত্যাখ্যান করে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জিনা হিনোজোসাকে বেছে নিয়েছেন ভোটারেরা। এর মধ্য দিয়ে অঙ্গরাজ্যটির প্রথম লাতিন নারী গভর্নর হতে যাচ্ছেন তিনি।
ক্যালিফোর্নিয়ার সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল জেভিয়ার বেসেরাও রিপাবলিকান প্রার্থী স্টিভ হিলটনকে পরাজিত করে ইতিহাস গড়েছেন। ১৮৭৫ সালে রোমুয়ালদো পাচেকোর পর তিনিই ক্যালিফোর্নিয়ার প্রথম লাতিনো গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন।
সব মিলিয়ে এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচন যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করেছে। জাতিগত ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যের প্রতিফলন ঘটেছে নির্বাচনের ফলাফলে, যা দেশটির রাজনীতিতে ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
মিশিগানে ইতিহাস গড়ে প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল আল–সাইদ
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান অঙ্গরাজ্যে সিনেট নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে হারিয়ে দেশটির ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ডাক্তার আবদুল আল-সাইদ। কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এ নির্বাচনে জয় পেতে নির্বাচনী প্রচারের পুরো সময়জুড়ে ইসলামবিদ্বেষী আক্রমণের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। মিশিগানে জন্ম নেয়া মিসরীয় বংশোদ্ভূত আবদুল আল-সাইদ গত নভেম্বরে দলীয় মনোনয়ন নিশ্চিত করেছিলেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং শীর্ষস্থানীয় রিপাবলিকান সহযোগীরা জোর দিয়ে প্রচার চালিয়েছিলন, আল-সাইদের মুসলিম পরিচয়, ইসরায়েল ইস্যুতে অবস্থান এবং প্রগতিশীল নীতিগুলো তাদের সম্প্রদায়গুলোকে ঝুঁকিতে ফেলবে এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দেবে।
৪২ বছর বয়সী আবদুল এল-সাইয়েদ মিশিগানের অ্যান আরবারের বাসিন্দা। তিনি ডেট্রয়েট ও ওয়েন কাউন্টির সাবেক জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তা। মার্কিন রাজনীতিতে করপোরেট প্রভাব ও সাধারণ পরিবারের জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের সমালোচক এল-সাইয়েদ শ্রমিক ইউনিয়নের ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ‘মেডিকেয়ার ফর অল’ চালুর পক্ষে প্রচার চালিয়েছেন।
অন্যদিকে, ৬৩ বছর বয়সী মাইক রজার্স হোয়াইট লেক টাউনশিপের সাবেক কংগ্রেস সদস্য। তিনি সাত মেয়াদে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং কংগ্রেসের গোয়েন্দাবিষয়ক কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। নির্বাচনী প্রচারে জ্বালানি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও প্রেসক্রিপশন ওষুধের দাম কমানো, অঙ্গরাজ্যে উৎপাদনশিল্প ফিরিয়ে আনা এবং শিক্ষাকে ‘মতাদর্শিক দীক্ষাদান’-এর ঊর্ধ্বে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন তিনি। এর আগে, ২০১৫ সাল থেকে মিশিগানের এই সিনেট আসনের প্রতিনিধিত্ব করে আসা ডেমোক্র্যাট সিনেটর গ্যারি পিটার্স তৃতীয় মেয়াদে নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় আসনটি শূন্য হয়।
অন্যদিকে, রজার্স জয়ী হলে গত ৫০ বছরে মিশিগান থেকে সিনেটর নির্বাচিত হওয়া দ্বিতীয় রিপাবলিকান হতেন। সর্বশেষ ১৯৯৪ সালে রিপাবলিকান স্পেন্সার আব্রাহাম অঙ্গরাজ্যটি থেকে সিনেটর নির্বাচিত হয়েছিলেন। পরে তিনি ডেমোক্র্যাট ডেবি স্ট্যাবেনোর কাছে পরাজিত হন। ২০২৪ সালের সিনেট নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন রজার্স। ওই নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী এলিসা স্লটকিনের কাছে প্রায় ১৯ হাজার ভোটের ব্যবধানে হেরে যান তিনি।
কংগ্রেসের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্বে ডেমোক্র্যাট মার্সি ক্যাপ্টুর

যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও অঙ্গরাজ্যের অত্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নবম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রতিনিধি মার্সি ক্যাপ্টুর। মঙ্গলবারের নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী ডেরেক মেরিনকে পরাজিত করে কংগ্রেসে নিজের ২৩তম মেয়াদ নিশ্চিত করেছেন ৮০ বছর বয়সী এই রাজনীতিক।
২০২৪ সালের নির্বাচনেও মুখোমুখি হয়েছিলেন ক্যাপ্টুর ও মেরিন। সে সময় ২ হাজার ৪০০ ভোটেরও কম ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন বর্তমান প্রতিনিধি।
১৯৮২ সালে প্রথম কংগ্রেসে নির্বাচিত হন ক্যাপ্টুর। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালন করা নারী তিনি।
বিলিয়নিয়ারকে হারিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর

যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধী দল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রার্থী কেইশা ল্যান্স বটমস যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ নারী গভর্নর হিসেবে নির্বাচিত হয়ে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছেন।
বিদায়ী রিপাবলিকান গভর্নর ব্রায়ান কেম্পের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার লড়াইয়ে তিনি পরাজিত করেছেন বিলিয়নেয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী, রিপাবলিকান প্রার্থী রিক জ্যাকসনকে। রিপাবলিকান প্রার্থী কেম্পের উত্তরসূরি হতে গিয়ে নিজের ব্যক্তিগত তহবিল থেকে ২০ কোটিরও বেশি (২০০ মিলিয়ন) ডলার খরচ করেছিলেন।

ইলিনয় সিনেটে ইতিহাস গড়লেন নাবিলা সৈয়দ, সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচনের রেকর্ড

যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সাধারণ পরিষদ (জেনারেল অ্যাসেম্বলি) নির্বাচনের ইতিহাসে অন্যতম ব্যয়বহুল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়লাভ করে ইতিহাস গড়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী নাবিলা সৈয়দ।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের সিনেট নির্বাচনে জয় পেয়েছেন ২৭ বছর বয়সী ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলিম তরুণী নাবিলা সৈয়দ।
উত্তর-পশ্চিম শহরতলি ইলিনয়ের সিনেটের ২৬ নম্বর ডিস্ট্রিক্ট আসনে বর্তমান রিপাবলিকান সেনেটর ডার্বি হিলসকে পরাজিত করে জয় ছিনিয়ে নেন ২৭ বছর বয়সী এই তরুণী। এই জয়ের মধ্য দিয়ে ইলিনয় সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আরও মজবুত হলো।
তথ্য অনুযায়ী, মোট প্রদত্ত ভোটের প্রায় ৯৪ শতাংশ গণনার পর দেখা যায় নাবিলা সৈয়দ ৫৭ শতাংশ ভোট (৪৮,০৫১ ভোট) পেয়ে বিজয়ী হয়েছেন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী রিপাবলিকান প্রার্থী ডার্বি হিলস পেয়েছেন ৪৩ শতাংশ ভোট (৩৬,২৮২ ভোট)।
নির্বাচনে জেতার পর সমর্থকদের উদ্দেশে নাবিলা বলেন, ‘আমাদের প্রচার দলের সদস্য ও স্বেচ্ছাসেবকরা মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো নিয়ে কথা বলতে পেরেছেন। শুধু ভোট জেতার আকাঙ্ক্ষা নয়, বরং সহমর্মিতা ও সহানুভূতিকে সামনে রেখেই আমরা প্রচার চালিয়েছি।’
রাজনীতিতে নাবিলার উত্থান
নাবিলা সৈয়দের বয়স ২৭ বছর। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কলে ক্যাম্পাস থেকে ২০২১ সালে স্নাতক শেষ করার পর তিনি ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের প্রতিনিধি পরিষদের ৫১তম ডিস্ট্রিক্টের প্রতিনিধি নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি নিজের দ্বিতীয় মেয়াদের দায়িত্ব পালন করছেন।
ইলিনয়ের আইনসভায় নির্বাচিত সবচেয়ে কম বয়সি নারী এবং অল্প কয়েকজন মুসলিম সদস্যের একজন ছিলেন নাবিলা।
অন্যদিকে ড্যান ম্যাককনচির পদত্যাগের পর তার আসনে নিয়োগ পেয়েছিলেন ৫০ বছর বয়সি ডার্বি হিলস। এর আগে ডার্বি একজন সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে কাজ করেছেন। ২০২১ সালে তিনি ‘মিসেস ইলিনয় আমেরিকা’ খেতাবও জিতেছিলেন। নির্বাচনী প্রচারে জননিরাপত্তা, বিশেষ করে শিশুদের নিরাপত্তা, কর কমানো এবং সরকারি ব্যয় নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তিনি।
নির্বাচনী প্রচারে নাবিলার বয়স ও অভিজ্ঞতাকে ইস্যু করেছিলেন ডার্বি। প্রচারের শেষ দিকে নাবিলাকে নিজের নির্বাচনী এলাকার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য ‘অতিরিক্ত চরমপন্থি’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
অন্যদিকে নিজের নির্বাচনী প্রচারে মুসলিমবিরোধী মনোভাবের সমালোচনা করেন নাবিলা। তিনি বলেন, ‘বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট চাইতে গেলে মানুষের কাছ থেকে বিদ্বেষপূর্ণ, ভীতিকর ও হুমকিমূলক কথা শুনতে হচ্ছে। এই এলাকাতেই আমার বেড়ে ওঠা। অথচ আমাকে প্রমাণ করতে হচ্ছে যে আমি এই দেশেই জন্মগ্রহণ করেছি।’
রেকর্ড সাড়ে ৬ মিলিয়ন ডলারের নির্বাচনী লড়াই
নির্বাচনী তথ্য পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘রিফর্ম ফর ইলিনয়’-এর নির্বাহী পরিচালক আলিসা কাপলানের মতে, এই আসনের প্রচারণায় প্রায় ৬৫ লাখ (৬.৫ মিলিয়ন) ডলার ব্যয় করা হয়েছে, যা রাজ্যের ইতিহাসের অন্যতম ব্যয়বহুল সাধারণ পরিষদ নির্বাচনী লড়াই।
প্রচারণার অর্থ সংগ্রহের দিক থেকে নাবিলা সৈয়দ তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে অর্ধেকেরও বেশি ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন। নাবিলা একাই অন্তত ৪৭ লাখ ডলারের তহবিল সংগ্রহ করেন, যার বড় একটি অংশ এসেছে ইলিনয় ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং সিনেট প্রেসিডেন্ট ডন হারমনের নিয়ন্ত্রণাধীন তহবিল ও শ্রমিক ইউনিয়নগুলো থেকে।
অন্যদিকে, রিপাবলিকান প্রার্থী ডার্বি হিলস সংগ্রহ করতে পেরেছিলেন ১৮ লাখ ডলার। ভোটের পর এক বিবৃতিতে হিলস ডেমোক্র্যাটদের বিপুল অর্থ ব্যয় ও প্রচারণার ‘অসাধু কৌশলের’ অভিযোগ তোলেন।
বিজয় উদযাপন ও ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণার বিরুদ্ধে জবাব
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) রাতে জয়ের ঘোষণার পর উচ্ছ্বসিত নাবিলা সৈয়দ তাঁর সমর্থকদের উদ্দেশে বলেন, ‘আমাদের প্রচার দল ও স্বেচ্ছাসেবকেরা ভোটের লোভে নয়, মানুষের জীবনযাত্রার মূল সমস্যাগুলো নিয়ে সহানুভূতি ও অনুভূতির সঙ্গে ঘরে ঘরে কথা বলতে পেরেছে।’
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া (বার্কলে) থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করা নাবিলা সৈয়দ এর আগে ইলিনয় হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সর্বকনিষ্ঠ নারী এবং প্রথম মুসলিম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি মূলত ইনভারনেস এলাকার বাসিন্দা।
নির্বাচনী প্রচারণাকালে তাঁর বয়স এবং ধর্মীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষের আক্রমণের বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে নাবিলা বলেন, ‘প্রচারণায় গিয়ে আমি চরম বিদ্বেষপূর্ণ ও ভীতিকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছি। আমি এই ডিস্ট্রিক্টেই বড় হয়েছি, অথচ আমাকে প্রমাণ করতে হচ্ছিল যে আমি এই দেশেই জন্মেছি।’
অন্যদিকে, সাবেক প্রসিকিউটর ও বারিংটন হিলসের সাবেক ট্রাস্টি ৫০ বছর বয়সী ডার্বি হিলস নাবিলার কম বয়স ও অভিজ্ঞতাকে প্রচারণার মুখ্য বিষয় বানিয়েছিলেন। নির্বাচনের শেষ দিনগুলোতে তিনি নাবিলাকে অতিমাত্রায় ‘উগ্রপন্থী’ হিসেবে আখ্যা দেন।
ইলিনয় জুড়ে ডেমোক্র্যাটদের ব্যাপক জয়
২৬ নম্বর ডিস্ট্রিক্টের পাশাপাশি ইলিনয়ের অন্যান্য আসনেও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা বিশাল জয় পেয়েছেন। ২৪ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্টে আরেকজন বর্তমান রিপাবলিকান সিনেটর সেথ লুইসকে পরাজিত করেছেন ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থী বেঞ্জামিন ম্যাকঅ্যাডামস (৫৫% ভোট)।
৫২ নম্বর হাউস ডিস্ট্রিক্টে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী মারিয়া পিটারসন ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়ে রিপাবলিকান প্রাতিনধি মার্টিন ম্যাকলাফলিনকে পরাজিত করেছেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে মাত্র ৫০ ভোটের ব্যবধানে লিনকে হারিয়ে জয় পেয়েছিলেন ম্যাকলাফলিন।
১৪ নম্বর সিনেট ডিস্ট্রিক্টে ফেডারেল তদন্ত সত্ত্বেও ডেমোক্র্যাটিক সেনেটর এমিল জোন্স ৩য় প্রায় ৭৫ শতাংশ ভোট পেয়ে সহজেই জয় পেয়েছেন।
এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ডেমোক্র্যাটরা ইলিনয় প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—উভয় কক্ষেই নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান ও একক আধিপত্য ধরে রাখতে সক্ষম হলো।
আবারও নির্বাচিত হলেন মুসলিম ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস ইলহান ওমর ও রশিদা তালিব

রশিদা তালিব (বামে) ও ইলহান ওমর।
যুক্তরাষ্ট্রে ইসরায়েলের সবচেয়ে প্রখ্যাত সমালোচকদের অন্যতম ডেমোক্র্যাটিক কংগ্রেস নারী ইলহান ওমর এবং রশিদা তালিব নতুন মেয়াদে পুনরায় নির্বাচিত হয়েছেন। বুধবার (৪ নভেম্বর) ওয়াই নেট গ্লোবালের এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানানো হয়েছে।
ওমর মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য থেকে জয়লাভ করেছেন। এই জয়ের প্রায় তিন সপ্তাহ আগে তার অভিবাসন সংক্রান্ত নথি তদন্তের অংশ হিসেবে ফেডারেল এজেন্টরা তার বাড়িতে তল্লাশি চালিয়েছিল। ওমর তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক নিপীড়নের দাবি করেছেন।
অন্যদিকে কংগ্রেসের প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নারী সদস্য রশিদা তালিব মিশিগান থেকে পঞ্চম মেয়াদের জন্য জয়ী হয়েছেন। দুই জনই ইসরায়েলে মার্কিন সামরিক সাহায্য বন্ধের দাবি জানিয়েছেন এবং গাজায় গণহত্যা চালানোর জন্য ইসরায়েলকে অভিযুক্ত করেছেন।

সোমালিয়া বংশোদ্ভূত অনেকেই আবার নির্বাচিত , নতুন অনেকেই বিজয়ী
ইলহান ওমর, ওমর ফাতেহ আইয়া , জয়নাব মোহাম্মাদ ,মোহামুদ নূর ,সমকাব হুসাইন ,আবদি দাইসানে,মুনিরা আবদুল্লাহি ইসমাইল মোহাম্মদ , আনকুয়াম মাহামুদ মিনেসোটা।

তদন্তের মধ্যেও টানা পঞ্চমবার কংগ্রেসে জয়ী ইলহান ওমর
অভিবাসনসংক্রান্ত তথ্য ও আর্থিক বিবরণী নিয়ে দুটি পৃথক ফেডারেল তদন্ত চললেও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আবারও কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট ইলহান ওমর। মিনেসোটার পঞ্চম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্টে রিপাবলিকান প্রার্থী ও সাবেক অঙ্গরাজ্য পুলিশ কর্মকর্তা জন নাগেলকে হারিয়েছেন সোমালি বংশোদ্ভূত এই রাজনীতিক।
২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রথমবার প্রতিনিধি পরিষদে নির্বাচিত হন ওমর। ইলহান ওমর এবারসহ মোট পঞ্চমবারের মতো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। ২০১৮ সালের পর ২০২০, ২০২২, ২০২৪ ও ২০২৬ সালের নির্বাচনেও জয়ী হয়েছেন তিনি।
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম দুই মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্যের একজন। দেশটির ডেমোক্র্যাট-অধ্যুষিত আসনগুলোর মধ্যে অন্যতম মিনেসোটার এই আসনের প্রতিনিধিত্ব করছেন তিনি।
তবে নির্বাচনী জয়ের পরও তাকে ঘিরে বিতর্ক ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। গত ১২ অক্টোবর ওয়াশিংটন ডিসিতে তার বাসায় অভিযান চালান হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ইনভেস্টিগেশন্সের (এইচএসআই) কর্মকর্তারা। এ সময় তার ফোন, পাসপোর্ট ও কম্পিউটার জব্দ করা হয়। পাশাপাশি সংগ্রহ করা হয় তার ডিএনএ নমুনা।
