• ৫ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২০শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৫শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

কালো সাগরে যুদ্ধের আগুন, ন্যাটোর সীমা পরীক্ষা করছে রাশিয়া

Usbnews.
প্রকাশিত নভেম্বর ৪, ২০২৬
কালো সাগরে  যুদ্ধের আগুন, ন্যাটোর সীমা পরীক্ষা করছে রাশিয়া
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

ইউক্রেন যুদ্ধের উত্তাপ এবার আরও গভীরভাবে ছড়িয়ে পড়ছে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে। একের পর এক বাণিজ্যিক জাহাজে ড্রোন হামলা, জাহাজডুবি এবং ন্যাটোর সদস্যদেশগুলোর উপকূলের কাছাকাছি সামরিক তৎপরতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার সংঘাত এখন ন্যাটোর নিরাপত্তা এবং সামরিক প্রতিক্রিয়ার সীমা পরীক্ষা করছে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা।

গত অক্টোবর মাসে ন্যাটোর সদস্যদেশ রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার কাছাকাছি অন্তত সাতটি কার্গো জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষ্ণসাগরে নিজেদের পূর্বাঞ্চলীয় প্রতিরক্ষা আরও শক্তিশালী করার ঘোষণা দেয় ন্যাটো। এ জন্য সমুদ্র টহল বিমান, রাডার ব্যবস্থা এবং ড্রোন মোতায়েনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এর মাত্র তিন দিন পর, ২৩ অক্টোবর রোমানিয়ার জলসীমার ঠিক বাইরে আরেকটি জাহাজে হামলা হয়। এর পর গত সপ্তাহে বুলগেরিয়ার একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চলে (ইইজেড) নৌ-ড্রোনের আঘাতে ডুবে যায় গ্রিসের একটি কনটেইনারবাহী জাহাজ।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব হামলা কৃষ্ণসাগরে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার সামুদ্রিক সংঘাতকে আরও বিস্তৃত করছে। এতে রোমানিয়া ও বুলগেরিয়ার মতো ন্যাটো সদস্যদেশগুলো সরাসরি নিরাপত্তাঝুঁকির মুখে পড়ছে।

হামলার পেছনে রাশিয়ার সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ

কৃষ্ণসাগরে ধারাবাহিক হামলার পেছনে রাশিয়ার ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন বেশ কয়েকজন সামরিক বিশ্লেষক। বিশেষ করে সর্বশেষ জাহাজে হামলায় ব্যবহৃত নৌ-ড্রোনের ভিডিও বিশ্লেষণ করে সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রের এক বিশ্লেষক জানিয়েছেন, সেটির নকশার সঙ্গে রাশিয়ার তৈরি একটি ড্রোনের মিল রয়েছে।

লন্ডনভিত্তিক নিরাপত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের (রুসি) জ্যেষ্ঠ গবেষক সিদ্ধার্থ কৌশল ঘটনাগুলোকে স্পষ্টতই সংঘাতের নতুন উত্তরণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

অন্যদিকে, ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের কৃষ্ণসাগর কর্মসূচির পরিচালক ইলিয়া জোজা মনে করেন, পশ্চিমা দেশগুলো সরাসরি সংঘাতে জড়াতে অনিচ্ছুক, এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখেই রাশিয়া হামলার পরিধি বাড়াচ্ছে। তাঁর মতে, ন্যাটো কতটা কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে, সেটিও যাচাই করার চেষ্টা চলছে।

তবে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রতিবেশী দেশগুলোকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। মস্কোর দাবি, ইউরোপীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে সামরিক সহায়তা দিয়ে যুদ্ধকে আরও উসকে দিচ্ছে। ফলে হামলাগুলোর জন্য রাশিয়াকে সরাসরি দায়ী করার ক্ষেত্রে এখনো সতর্ক অবস্থানে রয়েছে সংশ্লিষ্ট দেশগুলো।

ন্যাটোর প্রতিরক্ষা বাড়ানোর উদ্যোগ

পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ন্যাটো। জোটটির পক্ষ থেকে সমুদ্র টহল বিমান, রাডার এবং ড্রোন মোতায়েনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আগামী পাঁচ বছরে ড্রোন প্রতিরোধী প্রযুক্তি ও সক্ষমতা বাড়াতে ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতিও রয়েছে।

ন্যাটোর এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ইউক্রেনকে সহায়তা দেওয়া থেকে মিত্রদেশগুলোকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে রাশিয়ার যেকোনো তৎপরতা গুরুতর নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে। কৃষ্ণসাগরীয় সদস্যদেশসহ জোটের সব সদস্যকে রক্ষার অঙ্গীকারও অটুট রয়েছে।

তবে রোমানিয়ার জন্য পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। দেশটির কর্মকর্তারা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় ব্যবহারের জন্য ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধক এবং আধুনিক রাডার ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।

রোমানিয়ার অভিযোগ, দেশটির বেসামরিক জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হচ্ছে। তবে প্রতিটি হামলার পেছনে কারা রয়েছে, তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ফরেনসিক প্রমাণ সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বুখারেস্ট। অন্যদিকে, বুলগেরিয়া এখনো সরাসরি রাশিয়াকে দায়ী করেনি। দেশটির বক্তব্য, সাম্প্রতিক কিছু হামলার ঘটনায় রাশিয়া লাভবান হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

ছয় মাসে ৩১৭ জাহাজে হামলা

কৃষ্ণসাগরে সামুদ্রিক সংঘাতের ভয়াবহতা বোঝা যায় জাহাজে হামলার পরিসংখ্যানেও। সামুদ্রিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠান অ্যামব্রের বিশ্লেষক টমাস আলেক্সার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগরে মোট ৩১৭টি বাণিজ্যিক ও অন্যান্য জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে। এর আগের ছয় মাসে এই সংখ্যা ছিল ৭৪। অর্থাৎ ছয় মাসের ব্যবধানে হামলার সংখ্যা চার গুণেরও বেশি বেড়েছে।

অ্যামব্রের হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকে ইউক্রেনের পক্ষ থেকে জাহাজে ১৩৭টি হামলা চালানো হয়েছে। একই সময়ে রাশিয়ার হামলার সংখ্যা ছিল ৯২টি। তবে অক্টোবর মাসে পরিস্থিতির চিত্র পাল্টে যায়। ওই মাসে রাশিয়ার পক্ষ থেকে ৩৮টি হামলার বিপরীতে ইউক্রেনের হামলার সংখ্যা ছিল মাত্র পাঁচটি।

এই হামলাগুলো শুধু সামরিক নিরাপত্তার জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জ্বালানি ও খাদ্যশস্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথগুলো ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে।

কমছে রাশিয়া-ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানি

কৃষ্ণসাগরে হামলার কারণে রাশিয়া ও ইউক্রেনের খাদ্যশস্য রপ্তানি মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে দুই দেশকেই বিকল্প বাণিজ্যপথের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

রয়টার্সের হাতে আসা রাশিয়ার রপ্তানি তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে কৃষ্ণসাগর ও আজভ সাগর দিয়ে দেশটি মাত্র ৩ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য রপ্তানি করেছে। অথচ গত বছরের একই মাসে এই পরিমাণ ছিল ৪৭ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন।

অন্যদিকে, রাশিয়ার হামলার কারণে ইউক্রেন গত জুলাইয়ের শেষ দিকে কৃষ্ণসাগরের বন্দরগুলোতে কার্যক্রম স্থগিত করে। এরপর দানিউব নদীর বন্দর এবং রোমানিয়ার সুলিনা খাল ব্যবহার করে খাদ্যশস্য পরিবহনের বিকল্প ব্যবস্থা নেয় কিয়েভ। কিন্তু বিকল্প পথেও রপ্তানি ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ইউক্রেনের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে দেশটির বন্দর দিয়ে খাদ্যশস্য রপ্তানি হয়েছে ৮ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন। গত বছরের একই সময়ে এই পরিমাণ ছিল ২১ লাখ মেট্রিক টন।