তৈরি পোশাক শিল্পের চলমান শ্রমিক অসন্তোষ ও সংকটজনক পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাছে ১৫ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিরসনে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে দ্রুত একটি কার্যকর ত্রিপক্ষীয় সংলাপ আয়োজনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) মগবাজারে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, পোশাক শিল্পের বর্তমান অস্থিরতা কেবল কোনো সাধারণ শ্রমিক-মালিক বিরোধ নয়, বরং এটি দেশের উৎপাদন, রপ্তানি বাণিজ্য এবং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতির জন্য একটি বড় সংকট। সম্প্রতি গাজীপুরে শ্রমিক বিক্ষোভ চলাকালে সংঘর্ষে গুরুতর আহত তৌফিক শেখ (২১) নামের এক শ্রমিকের চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে নিহত ও আহতদের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানানো হয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে শ্রমিকদের জন্য যৌক্তিক ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ এবং তা ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার দাবি জানায় দলটি।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের পক্ষ থেকে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও কারখানায় নাশকতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলা হয়, কোনো কারখানা ধ্বংস করে শ্রমিকদের অধিকার প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। চলমান এই অসন্তোষের পেছনে নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠন আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও শ্রমিক লীগের কোনো উসকানি বা নাশকতা রয়েছে কি না, তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করার দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ ছাড়া সাধারণ শ্রমিকদের ওপর বলপ্রয়োগ, গণগ্রেপ্তার ও হয়রানিমূলক মামলা বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংকট উত্তরণে জামায়াতের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে— বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত চালুর উদ্যোগ নেওয়া, অবৈধ শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করা, বকেয়া বেতন-ভাতা দ্রুত পরিশোধ এবং শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য ‘রেশনিং ব্যবস্থা’ চালু করা।
১৫ দফা দাবি:
১. নবগঠিত মজুরি বোর্ডকে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়, মূল্যস্ফীতি ও পরিবারের মৌলিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি নির্ধারণ করতে হবে। ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে তা কার্যকর করতে হবে।
২. গাজীপুরে নিহত শ্রমিক তৌফিক শেখের মৃত্যুর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আহত শ্রমিকদের সুচিকিৎসা এবং নিহতের পরিবারকে উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
৩. কারখানা ও যানবাহনে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নাশকতা ও সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
৪. আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে শ্রমিকদের ওপর অযাচিত বলপ্রয়োগ, নির্যাতন, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শন বন্ধ করতে হবে।
৫. চলমান শ্রম অসন্তোষের ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত নিরপরাধ শ্রমিক ও শ্রমিক নেতাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে এবং হয়রানিমূলক ও ভিত্তিহীন মামলা প্রত্যাহার করতে হবে।
৬. রাজনৈতিক বা দলীয় পরিচয়ে সাধারণ শ্রমিকদের ওপর হামলা, নির্যাতন ও হয়রানি বন্ধ করতে হবে।
৭. শ্রমিক, কারখানা, শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শিল্পাঞ্চলে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৮. পোষাক শিল্পের চলমান সংকট নিরসনে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক প্রতিনিধিসহ এই সেক্টরের স্টেক হোল্ডারদের নিয়ে অবিলম্বে কার্যকর সংলাপের আয়োজন করতে হবে।
৯. শ্রমিকদের ন্যায্য আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার উদ্দেশ্যে নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামিলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ বা স্বার্থান্বেষী মহলের উসকানি, ষড়যন্ত্র ও নাশকতার অপচেষ্টা থাকলে তা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রতিরোধ করতে হবে।
১০. বন্ধ কারখানাগুলো দ্রুত খুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিতে হবে এবং শ্রমিকদের নিরাপদ ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করে কর্মস্থলে ফিরিয়ে আনতে হবে।
১১. অন্যায় ও বেআইনিভাবে শ্রমিক ছাঁটাই বন্ধ করতে হবে। কালো তালিকাভুক্ত শ্রমিকদের বিষয়টি পর্যালোচনা করে তাঁদের পুনরায় কাজের সুযোগ দিতে হবে।
১২. শ্রমিকদের বকেয়া বেতন, ভাতা, ওভারটাইম ও অন্যান্য আইনগত পাওনা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে।
১৩. পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ন্যায্যমূল্যে খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের জন্য রেশনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।
১৪. নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্যকর ও নিরাপদ নিরাপত্তাপূর্ণ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পদক্ষেপ নিতে হবে।
১৫. দেশের পোশাকশিল্প, শ্রমিকদের চাকরি, মালিকদের বিনিয়োগ এবং জাতীয় অর্থনীতি রক্ষায় শ্রমিক-মালিকসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালন করতে হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন নায়েবে আমীর ও সাবেক এমপি মাওলানা আনম শামসুল ইসলাম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি, সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম ও এডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব মো. আবদুর রব, অধ্যক্ষ মো. শাহাবুদ্দিন, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমীর জনাব নূরুল ইসলাম বুলবুল এমপি এবং ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর জনাব মো. সেলিম উদ্দিন, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ এমপি, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান, ঢাকা মহানগরী উত্তরের প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি আতাউর রহমান সরকার, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সেক্রেটারি আবদুস সাত্তার সুমন প্রমুখ।