যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের গভর্নর গ্যাভিন নিউসম এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত সমস্ত ৫৪৮ জন আসামির সাজা মওকুফ করেছেন। মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে তাঁদের সাজা কমিয়ে প্যারোল বা মুক্তির সুযোগহীন আমৃত্যু কারাদণ্ড করা হয়েছে।
এক চিঠিতে সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে ডেমোক্রেটিক গভর্নর নিউসম লেখেন, ‘আমরা এখন এই অপরাধীদের বিস্মৃতির আড়ালে তিলে তিলে মারা যেতে দিতে পারি, অন্যদিকে আমরা ভুক্তভোগীদের স্মৃতিকে চিরকাল সম্মান ও স্মরণ করব।’
২০০৬ সালের পর থেকে ক্যালিফোর্নিয়ায় কোনো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়নি। তাই আদালতের বিশাল আইনি খরচ বাঁচানো ছাড়া ক্যালিফোর্নিয়ার প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্তের প্রভাব মূলত প্রতীকী। ১৯৭৮ সালে রাজ্যটির ভোটাররা মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহাল করার পর থেকে মাত্র ১৩ জনের সাজা কার্যকর করা হয়েছে।
ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের সংবিধান প্রদত্ত ক্ষমা প্রদর্শনের বিশেষ ক্ষমতার বলে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানান নিউসম।
জনসেবায় দীর্ঘ তিন দশকের অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে নিউসম তাঁর চিঠিতে লেখেন, ‘দীর্ঘ প্রায় ৩০ বছর সরকারি দায়িত্ব পালন করার পর রাষ্ট্র কী ন্যায়সংগতভাবে অর্জন করতে পারে, তার সীমাবদ্ধতা আমি উপলব্ধি করেছি। আমি এই পদক্ষেপ নিয়েছি কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি যে রাষ্ট্র-অনুমোদিত হত্যা ক্যালিফোর্নিয়ার মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এটি আমাদের আইনি ব্যবস্থার ভিত্তিকে দুর্বল করে এবং আমাদের মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে।’
মৃত্যুদণ্ডকে একটি ‘ব্যর্থ ব্যবস্থা’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, নিষ্ঠুর অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডই উপযুক্ত সাজা মনে হলেও নৈতিকভাবে রাষ্ট্র কাউকে হত্যা করতে পারে না। তিনি জানান, ভুল বিচারে নির্দোষ ব্যক্তিদের সাজা পাওয়ার ঝুঁকি এবং বর্ণভিত্তিক বৈষম্যের কারণে এই ব্যবস্থা সঠিকভাবে প্রয়োগ করা সম্ভব হয়নি।
নিজের সিদ্ধান্তের আইনি ও রাজনৈতিক দায়িত্ব নিয়ে গভর্নর বলেন, ‘ক্যালিফোর্নিয়ার সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যের কল্যাণে বিবেক থেকে এই কঠিন ও ন্যায়সংগত সিদ্ধান্ত নেওয়া আমার দায়িত্ব।’
তবে এই সিদ্ধান্তকে চূড়ান্ত রূপ দিতে ক্যালিফোর্নিয়া সুপ্রিম কোর্টের সাতজন বিচারকের মধ্যে অন্তত চারজনের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে।
ক্যালিফোর্নিয়ায় মেয়াদ শেষের পথে থাকা গ্যাভিন নিউসমকে ২০২৮ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্রেটিক পার্টির সম্ভাব্য শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুদণ্ডের পক্ষে জনমত থাকলেও নির্বাচনের আগে মৃত্যুদণ্ডবিরোধী অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিকভাবে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও দেওয়ানি স্বাধীনতা বিষয়ক অধ্যাপক বার্নার্ড ই হারকোর্ট বিবিসিকে বলেন, এ ধরনের সিদ্ধান্ত মার্কিন রাজনীতিতে অভূতপূর্ব নয়। ১৯৮১ সালে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁও একই ধরনের নীতিগত অবস্থান নিয়েছিলেন এবং জনগণের সমর্থন পেয়েছিলেন। নিউসমের ক্ষেত্রেও ভোটাররা এই নৈতিক অবস্থানকে সম্মান জানাতে পারেন।
এই সিদ্ধান্তটি এমন এক সময়ে এল যখন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে টেনেসিতে একটি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করতে গিয়ে চরম বিশৃঙ্খলা তৈরির ঘটনা মার্কিনজুড়ে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল।
আমেরিকান সিভিল লিবার্টিজ ইউনিয়ন (এসিএলইউ)-এর নির্বাহী পরিচালক অ্যান্টনি ডি রোমেরো নিউসমের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এই সাজা মওকুফ ইনসাফের দাবিকেই প্রতিফলিত করে। এটি ক্যালিফোর্নিয়ার বর্ণবাদী, ভুল-প্রবণ এবং অমানবিক শাস্তির ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়েছে।’
তবে লস অ্যাঞ্জেলেস কাউন্টির প্রধান কৌঁসুলি নাথান হচম্যান সমালোচনা করে বলেন, গভর্নর সাজা কমানোর ক্ষমতা রাখলেও মৃত্যুদণ্ড পুরোপুরি বিলুপ্ত করার ক্ষমতা কেবল আইনসভা বা সাধারণ ভোটারদের হাতে রয়েছে। ক্যালিফোর্নিয়ার ভোটাররা অতীতে দু’বার গণভোটে মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখার পক্ষে রায় দিয়েছিলেন।
কেন্দ্রীয় পর্যায়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই মৃত্যুদণ্ডের কট্টর সমর্থক। ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম দিনেই তিনি কেন্দ্রীয় পর্যায়ে মৃত্যুদণ্ড পুনর্বহালের নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ২৭টি অঙ্গরাজ্যে মৃত্যুদণ্ড বৈধ থাকলেও ২৩টি অঙ্গরাজ্য এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে এটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়েছে।