• ৭ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৭শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

প্রকল্প নিয়ে আলোচনা : রাশিয়ার গ্যাসে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা চায় বাংলাদেশ

Usbnews.
প্রকাশিত নভেম্বর ৭, ২০২৬
প্রকল্প নিয়ে আলোচনা : রাশিয়ার গ্যাসে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা চায় বাংলাদেশ
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণে রাশিয়ার কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সরবরাহ নিশ্চিত করতে চায় বাংলাদেশ। এ লক্ষ্যে ইথেনসমৃদ্ধ গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কমপ্লেক্সের সম্ভাবনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি রাশিয়ার সাখালিন-২ প্রকল্প ও পোর্টোভায়া এলএনজি প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস আমদানির বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। জ্বালানি সহযোগিতার পাশাপাশি বাণিজ্যিক লেনদেন সহজ করতে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা করেছে দুই দেশ। গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) বাংলাদেশ-রাশিয়া আন্তসরকার কমিশনের (আইজিসি) বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতাবিষয়ক পঞ্চম সভায় এ বিষয় উঠে আসে।

বাংলাদেশের পক্ষে সভায় অংশ নেন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) ইউরোপ উইংয়ের কর্মকর্তারা। রাশিয়ার ফেডারেল এজেন্সি ফর ফিশারিজের প্রধান ও কমিশনের রুশ অংশের চেয়ারম্যান ইলিয়া শেস্তাকভের নেতৃত্বে দেশটির প্রতিনিধিদল সভায় অংশ নেয়।

দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সরবরাহে আগ্রহ: সভায় রাশিয়ার জ্বালানি কোম্পানি গ্যাজপ্রম জানায়, বাংলাদেশ আগ্রহী হলে সাখালিন-২ প্রকল্প থেকে এলএনজি সরবরাহের বিষয়ে পেট্রোবাংলা ও সাখালিন এনার্জির মধ্যে সরাসরি আলোচনা সহজতর করতে প্রস্তুত তারা।

এ ছাড়া উস্ট-লুগা প্ল্যান্ট থেকে এলএনজি সরবরাহের সম্ভাবনা এবং পোর্টোভায়া এলএনজি প্ল্যান্ট থেকে গ্যাস আমদানির বিষয়েও আলোচনা হয়েছে। ইথেনসমৃদ্ধ গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ কমপ্লেক্সের অংশ হিসেবে এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করেছে দুই পক্ষ।

বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং দুই দেশের জ্বালানি খাতের সহযোগিতা সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থায় গুরুত্ব: জ্বালানি সহযোগিতার পাশাপাশি দুই দেশের বাণিজ্যিক লেনদেন নিষ্পত্তিতে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে রাশিয়া। পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে রুশ ব্যাংকগুলোর সঙ্গে প্রচলিত আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেনের জটিলতা তৈরি হয়েছে।

সভায় রুশ ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো, ডিজিটাল আর্থিক উপকরণ ব্যবহার এবং বিকল্প পেমেন্ট অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে আলোচনা হয়।

ইআরডির কার্যপত্র অনুযায়ী, রুশ এক্সপোর্ট সেন্টার গ্রুপের আওতাধীন এক্সিম ব্যাংক অব রাশিয়া বাংলাদেশের আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে আগ্রহী। তবে প্রতিষ্ঠানটি ও এর মূল সংস্থা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকায় সরাসরি সহযোগিতার ক্ষেত্রে আইনি ও আর্থিক জটিলতা রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, সোনালী ব্যাংকে রাশিয়ার ঋণ পরিশোধের জন্য রাখা অর্থ নিষেধাজ্ঞার কারণে সংশ্লিষ্ট রুশ ব্যাংকে স্থানান্তর করা যাচ্ছে না। ফলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঋণের কিস্তি পরিশোধ নির্বিঘ্ন করাও বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার অন্যতম কারণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের আমদানি পরিশোধের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাশিয়া থেকে পণ্য আমদানির বিপরীতে বাংলাদেশ ১৩৬ কোটি ২৫ লাখ ডলার পরিশোধ করেছে।

জ্বালানি, সার ও বিনিয়োগে সহযোগিতা: রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র দুই দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার অন্যতম বড় প্রকল্প। ২০১৩ সালের ১৫ জানুয়ারি কেন্দ্রটি নির্মাণে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তার জন্য স্টেট এক্সপোর্ট ক্রেডিট চুক্তি সই হয়। এ ছাড়া রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান গ্যাজপ্রম ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে গ্যাস অনুসন্ধানে কাজ করছে। ভোলায় একাধিক কূপ খননের পাশাপাশি ২০২৩ সালে আরও পাঁচটি কূপ অনুসন্ধানের জন্য চিহ্নিত করে প্রতিষ্ঠানটি।

কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তায়ও রাশিয়া বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। বিশেষ করে গম ও পটাশ সার আমদানিতে দেশটির সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে। এবারের সভায় সার সরবরাহ বাড়ানো, কৃষি গবেষণায় যৌথ উদ্যোগ এবং শিল্প ও কৃষি খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।

বাণিজ্য ও প্রযুক্তিতে নতুন উদ্যোগ: বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়াতে রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন করপোরেশন ভিইবি.আরএফ এবং ইনভেস্ট বাংলাদেশের মধ্যে সহযোগিতা ও তথ্য বিনিময়বিষয়ক সমঝোতা স্মারক সইয়ের উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তৈরি পোশাকের পাশাপাশি ওষুধ, চামড়াজাত পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, সিরামিক এবং জনশক্তি রপ্তানির সুযোগ কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া শুল্কবিষয়ক সহযোগিতা ও পারস্পরিক সহায়তা চুক্তি সইয়ের প্রস্তুতি, রাশিয়ার উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা বরাদ্দ এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।

ইআরডির একজন কর্মকর্তা জানান, সভায় ব্যাংকিং ও আর্থিক লেনদেন, জ্বালানি, কৃষি, শিল্প, শিক্ষা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্র পর্যালোচনা করেছেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা।