ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণের জন্য দেওয়া নয় দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন আকারে আদালতে জমা দিতে বিবাদীদের নির্দেশ দিয়েছে হাইকোর্ট। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের হলফনামা আকারে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৬ নভেম্বর দিন ধার্য করেছে আদালত।
বিচারপতি জেবিএম হাসান এবং বিচারপতি আজিজ আহমদ ভূঁইয়ার সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে সোমবার (২ নভেম্বর) মামলাটি আদেশের জন্য ওঠে। হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) করা আবেদনের শুনানি শেষে আদালত এ নির্দেশ দেয়।
আবেদনকারী পক্ষের দাবি, ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে ঢাকার বায়ুদূষণ বাড়ছে। কিন্তু এ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আদালতের আগের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না। এতে নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছে।
ঢাকার বায়ুদূষণ রোধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা চেয়ে এইচআরপিবির করা এক জনস্বার্থমূলক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২০ সালে বিবাদীদের প্রতি নয় দফা নির্দেশনা দিয়েছিল হাইকোর্ট।
নির্দেশনাগুলোর মধ্যে ছিল- নগরীর বিভিন্ন স্থানে পানি ছেটানো, বালুবাহী ট্রাক ঢেকে পরিবহন, নির্মাণকাজের স্থান ঘিরে রাখা, মার্কেটের বর্জ্য নির্দিষ্ট সময়ে ব্যাগে ভরে অপসারণ এবং ঢাকার আশপাশের অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা। পরে এসব নির্দেশনা বাস্তবায়নে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে প্রতিবেদন চেয়ে আদালতে আবেদন করে এইচআরপিবি। প্রতিবেদন দাখিলে ব্যর্থ হওয়ায় এর আগে পাঁচ জেলার জেলা প্রশাসককে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছিল।
এ মামলার বিবাদীদের মধ্যে রয়েছেন পরিবেশ সচিব, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র, ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালকসহ সংশ্লিষ্ট অন্যরা। আদালতে আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।
পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকায় ১২ দফা পরিকল্পনা; গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ নগরীতে রূপান্তরের ১২ দফা কর্মপরিকল্পনা তুলে ধরেন। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
পরিকল্পনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় আগামী পাঁচ বছরে পাঁচ লাখ গাছ লাগানো। মেট্রোরেল লাইনের মিরপুর-১২ থেকে মিরপুর ডিওএইচএস পর্যন্ত এবং উড়ালসড়কের আবদুল্লাহপুর থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত ফাঁকা জায়গায় বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া নগরীর বিভিন্ন এলাকায় মিয়াওয়াকি পদ্ধতিতে নগর বন গড়ে তোলা হচ্ছে। সড়কের উন্মুক্ত মিডিয়ানগুলোকে মাটিমুক্ত সবুজায়নের আওতায় আনা এবং রাস্তার পাশে গাছ লাগানোর উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ, আধুনিক হচ্ছে ব্যবস্থাপনা: ঢাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন আনতে মাতুয়াইল ল্যান্ডফিলকে সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জ্বালানি উৎপাদন কেন্দ্রে রূপান্তরের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। কোরীয় একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগে বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর লক্ষ্য বর্জ্যকে সম্পদে পরিণত করা এবং পরিবেশের ওপর চাপ কমানো। একই সঙ্গে নগরীর বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্রগুলো আধুনিকায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সড়কের মিডিয়ান, ট্রাফিক আইল্যান্ড ও উন্মুক্ত জায়গায় বৃক্ষরোপণ করছে। দুই সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান, মশক নিয়ন্ত্রণ ও নাগরিক সচেতনতা কর্মসূচিও চলছে।
২৫০ বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগ: রাজধানীর বায়ুদূষণ কমাতে পরিবেশ অধিদপ্তর ও ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে আধুনিক বাসসেবা চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ২৫০টি বৈদ্যুতিক বাস পরিচালনার কথা জানানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক বাস চালু হলে জ্বালানিচালিত যানবাহনের ওপর নির্ভরতা কমানো এবং পরিবহন খাতের দূষণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা পাওয়ার আশা করছে সরকার।
এদিকে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলো শনাক্ত করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কালো ধোঁয়া নির্গমনকারী যানবাহন, নির্মাণকাজ ও নির্মাণসামগ্রী থেকে সৃষ্ট দূষণ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করছে।
ঢাকার আশপাশের অবৈধ ইটভাটা বন্ধেও অভিযান চলছে। দূষণ নিয়ন্ত্রণে সাভার উপজেলাকে অবক্ষয়িত বায়ুমান এলাকার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। সেখানে ইটভাটা পরিচালনা ও খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
খাল পুনরুদ্ধার ও জলাবদ্ধতা নিরসনে তৎপরতা: রাজধানীর পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনরুদ্ধার, সীমানা নির্ধারণ, খনন ও বর্জ্য অপসারণের কাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আওতাধীন ২৯টি খালের সীমানা নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। দক্ষিণ সিটির খালগুলোর সীমানা নির্ধারণের কাজও চলছে।
নদী ও শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণে নজরদারি: রাজধানীর আশপাশের নদী ও জলাশয় রক্ষায় শিল্পকারখানার বর্জ্য নিয়ন্ত্রণেও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তরল বর্জ্য নির্গমনকারী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য বর্জ্য পরিশোধনাগার (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ইতোমধ্যে ২৪৮টি প্রতিষ্ঠান ইটিপি স্থাপন করেছে। এসব ব্যবস্থার কার্যকারিতা পর্যবেক্ষণে ক্যামেরা স্থাপনের কাজ চলছে।
বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, বালু ও তুরাগ নদী এবং ঢাকার ১৯টি গুরুত্বপূর্ণ খালের দূষণের উৎস ও ধরনও শনাক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দূষণ নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রমকে আরও পরিকল্পিত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বাস্তবায়ন ও তদারকিতে গুরুত্ব: সরকারের পরিচ্ছন্ন ও সবুজ ঢাকা পরিকল্পনার পাশাপাশি দূষণ নিয়ন্ত্রণে আদালতের নির্দেশও নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ২ নভেম্বর হাইকোর্ট ২০২০ সালের নয় দফা নির্দেশনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
সড়কে পানি ছিটানো, নির্মাণস্থল ঘিরে রাখা, বালুবাহী ট্রাক ঢেকে পরিবহন এবং অবৈধ ইটভাটা বন্ধের মতো বিষয়গুলো নির্দেশনায় রয়েছে। পরবর্তী শুনানির জন্য আগামী ১৬ নভেম্বর নির্ধারণ করা হয়েছে।