• ৭ই নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ২২শে কার্তিক, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৭শে জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৮ হিজরি

জনগণের মনের ভাষা বুঝে দেশ পরিচালনা করতে হবে : জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের আলোচনায় ডা. শফিকুর রহমান

Usbnews.
প্রকাশিত নভেম্বর ৭, ২০২৬
জনগণের মনের ভাষা বুঝে দেশ পরিচালনা করতে হবে : জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের আলোচনায় ডা. শফিকুর রহমান
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

৭ নভেম্বরের চেতনা ধারণ করে দেশে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের প্রকৃত অধিকার প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, ৭ নভেম্বরের চেতনা হচ্ছে অন্যায়-অবিচার, একনায়কতন্ত্র ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার চেতনা। জনগণের মনের ভাষা বুঝে দেশ পরিচালনা করতে হবে। যারা জনগণের প্রত্যাশা ও অধিকার উপেক্ষা করবেন ইতিহাস তাদের কাউকে ক্ষমা করবে না।

গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তরের উদ্যোগে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। সভাপতিত্ব করেন ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৭২ সালে ক্ষমতায় আসার পর তৎকালীন সরকার দেশের প্রায় সব ইসলামী সংগঠন নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। অথচ ১৯৭০ সালের নির্বাচনে এসব সংগঠন সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিল। নির্বাচনের আগে কুরআন-সুন্নাহর ওপর কোনো আঘাত করা হবে না বলে আশ্বাস দেওয়া হলেও ক্ষমতায় যাওয়ার পর সেই প্রতিশ্রুতির বিপরীত অবস্থান নেওয়া হয়। জনগণের বিপুল সমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার পরপরই সরকার জনগণের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলে। সেনাবাহিনী, পুলিশ, আনসার ও অন্যান্য বাহিনী থাকা সত্ত্বেও নিজেদের কর্মকাণ্ডের পরিণতি নিয়ে শঙ্কিত হয়ে রক্ষীবাহিনী নামে একটি বিশেষ বাহিনী গঠন করা হয়। রক্ষীবাহিনীকে সীমাহীন ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল; তাদের বিরুদ্ধে বিচার ও জবাবদিহির কার্যকর ব্যবস্থা ছিল না। তার অভিযোগ, এ বাহিনীর হাতে ৩৪ হাজার মানুষ নিহত হন, যাঁদের মধ্যে অন্তত ১০ হাজার মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন।

তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ শিকদারকে বিনা বিচারে হত্যার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে যে বক্তব্য দিয়েছিলেন তা বিচারব্যবস্থা ও আইনের শাসনের প্রতি চরম অবজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। দেশে হত্যা, নির্যাতন, লুটপাট ও মানুষের সম্মানহানির বিচার ছিল না। একদিকে বিরোধী মত দমন করা হয়েছে, অন্যদিকে ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ডে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। একজন কর্মরত সেনা কর্মকর্তার স্ত্রীকে অপহরণের ঘটনায় বিচার চাইতে গিয়ে ওই কর্মকর্তাকে চাকরি হারাতে হয়েছিল। ক্ষমতাসীনদের ঘনিষ্ঠদের বিরুদ্ধে ব্যাংক লুট ও নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। হোটেল শেরাটনের একটি স্যুটকে কেন্দ্র করে সংঘটিত অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ভয়ে অভিভাবকেরা মেয়েদের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।

জামায়াত আমীর বলেন, জনগণের জন্য বিদেশ থেকে পাঠানো ত্রাণসামগ্রীও যথাযথভাবে মানুষের কাছে পৌঁছায়নি। অনেক ত্রাণ বাইরে বিক্রি হয়ে গেছে। এ বিষয়ে প্রশ্নের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সাত কোটি মানুষের জন্য আট কোটি কম্বল আসার হিসাব তুলে ধরে নিজের কম্বল না পাওয়ার কথা বলেছিলেন।

তিনি আরও বলেন, দেশের সম্পদ লুটপাট, দুর্নীতি, মানুষের অধিকার হরণ এবং বিনা বিচারে হত্যার মধ্য দিয়ে তৎকালীন সরকার একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে। সংবিধানে এমন ব্যবস্থা করা হয়েছিল, যাতে শেখ মুজিবুর রহমান জীবিত থাকা পর্যন্ত রাষ্ট্রের প্রধান হিসেবে বহাল থাকতে পারেন। বহুদলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে বহুদলীয় গণতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি একদলীয় শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের কবর রচনা করা হয়।

৭ নভেম্বরের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সেনাবাহিনীকে অবজ্ঞা ও অপমান করার পাশাপাশি সামরিক কর্মকর্তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছিল, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পেছনে সেটিও একটি কারণ ছিল। ১৫ আগস্টের পর থেকে ৩ নভেম্বর পর্যন্ত দেশে একের পর এক ক্ষমতার পালাবদল ও অস্থিরতা চলতে থাকে। ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানের পর ৩ থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত জিয়াউর রহমান বন্দী ছিলেন। ৭ নভেম্বর ভোরে সিপাহিরা সংগঠিত হয়ে তাকে মুক্ত করেন। সিপাহিরা ট্যাংক নিয়ে রাস্তায় নামলে মসজিদ থেকে নামায শেষে বের হওয়া মানুষ তাকবির ধ্বনি দিয়ে তাদের স্বাগত জানায়। সেই ধ্বনি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ শহরে একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সিপাহিরা বিপ্লব সংঘটিত করেছিলেন, আর জনগণ তাতে সংহতি প্রকাশ করেছিল। এ কারণেই দিনটি ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

তিনি বলেন, পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান প্রথমে সামরিক প্রশাসক, পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন এবং পর্যায়ক্রমে রাজনৈতিক দল গঠন করেন। ১৯৭১ সালে বিএনপি ছিল না, ১৯৭৫ সালেও দলটি প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তাই ইতিহাসের কোনো ব্যক্তির অবদানকে ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে কৃতিত্বের লড়াই না করে যার যেখানে অবদান, তাকে সেখানে স্বীকৃতি দিতে হবে। স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনসহ মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে যারা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের অবদানও যথাযথভাবে স্মরণ করতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব ও অবদানের স্বীকৃতি কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি হতে পারে না।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৫ আগস্ট ও ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পেছনে ছিল দুঃশাসন, একদলীয় শাসন এবং জনগণের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ। মানুষ একটি স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে কথা বলার অধিকার, বেঁচে থাকার অধিকার, চাকরির অধিকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারসহ অন্যান্য নাগরিক অধিকার চেয়েছিল। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করে চারটি সংবাদমাধ্যম ছাড়া অন্যগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

সংবাদমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সেই সময়ের একটি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, একজন সাংবাদিক ও সংসদ সদস্য তাকে জানিয়েছিলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সংবাদমাধ্যমগুলো বন্ধ করে দেওয়ার পরিকল্পনার কথা তাকে জানালে তিনি ইত্তেফাকসহ সংবাদমাধ্যমগুলোকে বাঁচানোর অনুরোধ করেন। কিন্তু সেই অনুরোধের জবাবে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা হয়।ওই ব্যক্তি সংসদ সদস্য হয়েও একদলীয় শাসনব্যবস্থার বিরোধিতা করেছিলেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি সংসদ থেকে বেরিয়ে আসা দুই সদস্যের একজন ছিলেন জেনারেল ওসমানী, অন্যজন সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন।

তিনি বলেন, ১৯৯০ সালেও জনগণ দুঃশাসন, দুর্নীতি ও অদক্ষতার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। জনগণের ভোটে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি ক্ষমতা সেনাপ্রধানের হাতে তুলে দেওয়ায় গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়। পরবর্তী সময়ে এরশাদও মানুষের বাকস্বাধীনতা ও ভোটের অধিকার হরণ করে দীর্ঘদিন শাসন করেছেন। শেষ পর্যন্ত জনগণের আন্দোলনের মুখে তাকেও ক্ষমতা ছাড়তে হয়। জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে তার সঙ্গে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে শুধু তিনিই নিহত হন, অন্যদের গায়ে গুলির আঁচড়ও লাগেনি। বিষয়টি ইতিহাসে প্রশ্ন হয়ে রয়েছে।

বক্তব্যে ১৯৯১ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও তৎকালীন সরকার গঠনে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, দেশের স্বার্থে দলীয় স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে জামায়াতে ইসলামী সরকার গঠনে সহযোগিতা করেছিল। তবে সরকারে অংশীদার হয়নি এবং ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে রাজনৈতিক জোটেও যায়নি। সে সময় জামায়াতের পক্ষ থেকে নির্বাচনে জনগণের ভোটের মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সেই প্রস্তাবে সম্মত হননি। পরবর্তী সময়ে এ দাবিতে আন্দোলন করতে হয়েছে। জামায়াত শেষ পর্যন্ত নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করার সুযোগ দিয়েছিল। তার মতে, রাজনীতিতে সমঝোতা ও নমনীয়তা থাকা জরুরি; তা না থাকলে রাজনীতি জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে সংঘাতের দিকে চলে যায়।

বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জামায়াত আমীর বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটের রায় মেনে নেওয়া উচিত। কিন্তু এখন সেই রায় মানা হচ্ছে না। মূলত তারা আবার কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ফিরে যাওয়ার সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে। অন্তর্বর্তী সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করেছিল, সংসদের প্রথম অধিবেশনের প্রথম দিনেই রেওয়াজ অনুযায়ী সেগুলো উত্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সব অধ্যাদেশ নিয়ে আলোচনা হয়নি। বরং সেখান থেকে এমন ২০টি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে, যেগুলো বহাল থাকলে ফ্যাসিবাদ আবার নতুন করে ফিরে আসার পথ বন্ধ হতে পারত বলে তিনি মন্তব্য করেন।

তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে দলীয় লোকজনকে বসিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশনসহ বিভিন্ন সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। দুর্নীতি দমন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানে নিরপেক্ষ ও যোগ্য ব্যক্তিদের পরিবর্তে বিতর্কিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব দিয়ে দুর্নীতি দমন সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, শিক্ষার্থীরা মেধার ভিত্তিতে চাকরি ও ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে আন্দোলন করেছিলেন। কিন্তু এখন সরকারি কর্মকমিশনের চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং আরও সদস্যকে চাপের মুখে বিদায় করার অভিযোগ উঠেছে। আন্দোলনে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের দাবিকে সম্মান না করে তাদের সঙ্গে উপহাস করা হচ্ছে। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা প্রকাশ্যে বলছেন, দীর্ঘদিন তাদের কর্মীরা নির্যাতিত ও বঞ্চিত ছিলেন, এখন তাদের মূল্যায়ন করা হবে। দলীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে নিয়োগ ও সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার এমন মনোভাব জাতির যুবসমাজের প্রতি অবিচার।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাসে জনগণের প্রয়োজনেই বারবার বিপ্লব ফিরে এসেছে। জামায়াতে ইসলামী সংসদকে কার্যকর ও অর্থবহ করতে চেয়েছে। প্রথম দিন থেকেই সংসদ অকার্যকর করে দেওয়ার কোনো ঘোষণা দেওয়া হয়নি। ন্যায়সংগত বিষয়ে সহযোগিতা করা এবং অন্যায় হলে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ করাই বিরোধী দলের নীতি। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে একের পর এক সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি শুধু দেশের জনগণ নয়, আন্তর্জাতিক মহল থেকেও উঠেছিল উল্লেখ করে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ক্ষমতাসীনরা এ বাহিনী বিলুপ্ত করার প্রতিশ্রুতি দিলেও পরে বাহিনীর নাম পরিবর্তন করে নতুন কাঠামো গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগের বাহিনীর লোকবল ও কাঠামো বহাল রেখে শুধু নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে না বলে তিনি মনে করেন। প্রয়োজন হলে সময় নিয়ে আলোচনা করে নতুন বাহিনী গঠন করা যেতে পারে। বর্তমান সদস্যদের নিজ নিজ বাহিনীতে ফিরিয়ে দিয়ে দেশপ্রেমিক ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন কাঠামো গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, জনগণ গণভোটে সংবিধান সংস্কারের পক্ষে রায় দিয়েছে। সেই সংস্কারের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন না করে সংবিধান সংশোধনের নামে ভিন্ন পথে যাওয়ার চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণকে দেওয়া অঙ্গীকার রক্ষা করতে হবে। জনগণ শিশু নয়; তারা অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ভোট দিয়ে দায়িত্ব দিয়েছে। অতএব জনগণের সঙ্গে প্রতারণা না করে জুলাই সনদ ও গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিরোধী দলের দায়িত্ব প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অল্প সময়ের মধ্যেই সরকার এমন কিছু সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যেগুলোর প্রতিবাদ না করলে বিরোধী দল হিসেবে জনগণের প্রতি অর্পিত দায়িত্বের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করা হবে। এ কারণেই তারা সাত দফা দাবি নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এসব দাবি কোনো দলের একক দাবি নয়; এগুলো জনগণের দাবি। সংস্কার বাস্তবায়ন ছাড়া বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির পথ খোলা নেই। ফ্যাসিবাদ কোনো নির্দিষ্ট দলের নাম নয়; এটি একটি মানসিকতা, ভাইরাসের মতো। যে কেউ ক্ষমতায় গিয়ে এ মানসিকতায় আক্রান্ত হতে পারে। সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদের লক্ষণ দেখা গেলে তার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে।

তিনি বলেন, ৭ নভেম্বরের শিক্ষা হচ্ছে, দেশ পরিচালনায় জনগণের মনের ভাষা বুঝতে হবে। যারা জনগণের আকাঙ্ক্ষা বুঝতে ব্যর্থ হবে, তাদের পরিণতি ইতিহাসে বারবার ফিরে আসবে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে অস্বীকার করারও সুযোগ নেই। একদিকে কেউ বলছেন, ওই আন্দোলনের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না, এটি ছিল কেবল ছাত্রদের আন্দোলন; অন্যদিকে আবার দাবি করা হচ্ছে, আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড তাদের নেতা। এ ধরনের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়ে জাতির সঙ্গে উপহাস করা হচ্ছে।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী ওই আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করেনি; বরং ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানকে দেশের জনগণের জন্য মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি নিয়ামত হিসেবে বিবেচনা করে। ওই আন্দোলনে শহীদদের পরিবার এবং আহত ও পঙ্গুদের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে জামায়াতে ইসলামী। এ ক্ষেত্রে কোনো দলীয় পরিচয় দেখা হয়নি। যারা প্রতিবাদের যোদ্ধা, তাদের পাশে দাঁড়ানো দায়িত্ব বলে মনে করা হয়েছে।

সরকারকে ভুল পথ থেকে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে কথা বললে মাতারবাড়ীসহ জাতীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সরকারের ভূমিকা ও দৃষ্টিভঙ্গি জাতির সামনে পরিষ্কার করতে হবে। দেশের স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্ত জনগণ মেনে নেবে না। বাংলাদেশের জনগণ ও যুবসমাজ আধিপত্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করবে। আধিপত্যবাদের কালো ছায়ামুক্ত স্বাধীন জাতি গঠন, সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং চাঁদাবাজি ও দুর্নীতি নির্মূলের জন্য তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মানবতার মুক্তি এবং প্রকৃত অর্থে স্বাধীন ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন, সংগ্রাম ও রাজনৈতিক লড়াই অব্যাহত থাকবে।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহকে শুধু একটি সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে ছিল একদলীয় শাসন, গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনমনের ক্ষোভ। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানেও জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান করতে হবে। গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে জনগণের প্রত্যাশা পূরণে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমীর মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর জনগণ যে বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখেছিল, তা পূরণ হয়নি। ১৯৭৫ সালের একদলীয় শাসন, দমন-পীড়ন ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের বিরুদ্ধে ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার ঐক্যবদ্ধ অবস্থান ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। কিন্তু চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, বাজার সিন্ডিকেট, দলীয়করণ ও জনদুর্ভোগ অব্যাহত থাকলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। একটি ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে আরও বক্তব্য রাখেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমীর আব্দুর রহমান মূসা, ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা, সহকারী সেক্রেটারি মাহফুজুর রহমান, ডা. ফখরুদ্দিন মানিক ও ইয়াসিন আরাফাত। সভা সঞ্চালনা করেন কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও মহানগরীর সহকারী সেক্রেটারি নাজিম উদ্দীন মোল্লা।