নবাব খাজা আবদুল গনি (১৮১৩ – ১৮৯৬) ঢাকার বড় জমিদারদের মধ্যে অন্যতম। তিনি উনিশ শতকের শেষার্ধে পূর্ববঙ্গের সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন। ঢাকার জমিদার নবাব খাজা আহসানউল্লাহ্ ছিলেন তার পুত্র এবং নবাব সলিমুল্লাহ ছিলেন তার নাতি। ঢাকার এই নবাব পরিবারের সদস্যরা আজীবন ঢাকাতেই বাস করেছেন এবং ঢাকাতেই তারা পরলোকগমন করেছিলেন। নবাব আবদুল গণির পূর্বপুরুষেরা ছিলেন কাশ্মিরী। এ পরিবারটি ঢাকাবাসীর কাছে ‘নবাব পরিবার’ ও ‘খাজা পরিবার’ হিসেবে পরিচিত ছিল।
১৮৫৬ সালে ঢাকার প্রথম সংবাদ পত্র সাপ্তাহিক ঢাকা নিউজ। যার প্রতিষ্টাতা ও মালিক ছিলেন খাজা আব্দুল গনি।
খাজা আব্দুল গনি মুসলিম হিন্দু সহ সকল ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সবার জন্য অবৈতনিক হাইস্কুল করেছিলেন।
কেন এসব জাতিকে জানানো হয় না ? সমস্যা কি লেখকদের ? নাকি অন্য কোন কারণ জড়িত ?
১৮৪৬-১৮৯৬
পূর্বসূরি নবাব খাজা আলীমুল্লাহ
উত্তরসূরি নবাব খাজা আহসানুল্লাহ
জন্ম ৩০ জুলাই ১৮১৩
বেগম বাজার, ঢাকা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
মৃত্যু ২৪ আগস্ট ১৮৯৬ (বয়স ৮৩)
আহসান মঞ্জিল, ঢাকা, বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি, ব্রিটিশ ভারত
সমাধি বেগম বাজার, ঢাকা
দাম্পত্য সঙ্গী ইসমাতুন্নেসা
প্রাসাদ ঢাকা নবাব পরিবার
পিতা নবাব খাজা আলীমুল্লাহ
মাতা জিনাত বেগম
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
নবাব আবদুল গণির জন্ম ১৮১৩ সালে। তাকে নবাব উপাধিতে ভূষিত এবং তা বংশানুক্রমে ব্যবহার করার অধিকার দিয়েছিলেন তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। তার জমিদারি এবং ব্রিটিশ সরকারের সাথে সু-সম্পর্ক তাকে আরও প্রভাবশালী করে তুলেছিল। তার বাসভবন আহসান মঞ্জিলে দরবার ছিল যেখান থেকে তিনি পঞ্চায়েত এর মাধ্যমে তার জমিদারির প্রজাদের সহ ঢাকার মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণ করতেন। তিনি বর্তমান ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলের আদি ছাত্রদের একজন। তার সহপাঠীদের মধ্যে, ঢাকা ব্রাহ্মসমাজের প্রতিষ্ঠাতা ব্রজসুন্দর মিত্র, জমিদার নিকি পোগজ, জমিদার মৌলভী আব্দুল আলী ছিলেন অন্যতম। আবদুল গণিকে মাত্র আঠারোো বছর বয়সে পরিবারের কর্তৃত্ব গ্রহণ করতে হয়েছিল।
কর্মজীবন
নবাব আবদুল গণির ইংরেজ শাসকদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন মাত্র সাতাশ বছর বয়সে। ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লবের সময় তিনি ইংরেজদের অর্থ, হাতি, ঘোড়া, নৌকা সবকিছু দিয়ে খুবই সক্রিয়ভাবে সাহায্য করেছিলেন। সে জন্য বাংলার শাসক হ্যালিডের রিপোর্টে গণি মিয়ার নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল। ১৮৬০ সালে ঢাকায় মুসলমান শিয়া-সুন্নীদের দাঙ্গা যখন ইংরেজ সরকার থামাতে ব্যর্থ হয়েছিল তখন নবাব আবদুল গণি নিজের চেষ্টায় মাত্র তিন দিনের মধ্যে ঢাকা শহরকে শান্ত করেছিলেন। এ জন্য সরকার তাকে সি.এস.আই (কম্পানিয়ন অব দি অর্ডার অফ দি স্টার অব ইন্ডিয়া) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন। ১৮৬৭ সালে ভাইসরয় তাকে আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনীত করেন। ১৮৭৫ সালে তাকে বংশানুক্রমিক ‘নবাব’ উপাধি দেওয়া হয়। ১৮৬৮ সালে কে.সি.এস.আই (কিং কম্পানিয়ন অব দি অর্ডার অফ দি স্টার অব ইন্ডিয়া) উপাধি লাভ করেন।
ঢাকা শহরে নবাব আবদুল গণির প্রভাব প্রতিপত্তের প্রতীক ছিল আলী মিয়ার কেনা রংমহল। যা বর্তমানে ‘আহসান মঞ্জিল’ নামে পরিচিত। তিনি বাড়িটিকে মেরামত করে ছেলের আসহানউল্লাহ্ এর নামে নামকরণ করেন। বাড়িটি ঢাকাবাসীর কাছে ‘নবাব বাড়ী’ হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিল। ঢাকা শহরের শাহবাগ, বেগুনবাড়ী সহ অনেকাংশেরই মালিক ছিলেন নবাব আবদুল গণি। তিনি বেগুনবাড়ীতে চা বাগান করেছিলেন। ঢাকায় পেশাদারী ঘোড়দৌড় শুরু করেছিলেন বলে অনেকের মতে ঢাকার রেসকোর্স ময়দানও নাকি নবাব আবদুল গণির সম্পত্তি ছিল। তখন ঘোড়দৌড় ঢাকায় শহুরে বিনোদন হিসেবে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল।
নবাব আবদুল গণিই ঢাকা শহরে প্রথম বিশুদ্ধ পানির সরবরাহের ব্যবস্থা করেছিলেন। ১৮৭৯ সালে নবাব আবদুল গণির কে.সি.এস.আই উপাধি পাওয়া এবং প্রিন্স অফ ওয়েলসের সুস্থ হয়ে ওঠা উপলক্ষে সরকারকে পঞ্চাশ হাজার টাকা দান করেছিলেন। তখন একটি কমিটি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল ঢাকাবাসীর জন্য বিশুদ্ধ খাবার পানির ব্যবস্থা করা হবে। নবাব আবদুল গণি আরও প্রায় দুই লক্ষ টাকা দান করেছিলেন এই প্রকল্পে।
১৮৬০ সালে ঢাকায় মুসলমান শিয়া-সুন্নীদের দাঙ্গা যখন ইংরেজ সরকার থামাতে ব্যর্থ হয়েছিল, তখন নবাব আবদুল গনি নিজের চেষ্টায় তিনদিনের মধ্যে ঢাকা শহরকে শান্ত করেছিলেন। এজন্য সরকার তাকে সি.এস.আই (কম্পানিয়ন অব দি অর্ডার অব দি স্টার অব ইন্ডিয়া) উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
১৮৬৭ সালে ভাইসরয় আবদুল গনিকে আইন পরিষদের সদস্য হিসেবে মনোনীত করেন। ১৮৭৫ সালে তাকে বংশানুক্রমিক’নবাব’ উপাধি দেওয়া হয়। ১৮৬৮ সালে কে.সি.এস.আই (কিং কম্পানিয়ন অব দি অর্ডার অব দি স্টার অব ইন্ডিয়া) উপাধি লাভ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে আবদুল গণি দুই বার বিয়ে করেছিলেন। তার সন্তানাদির সংখ্যা ছিল ছয় জন। ১৮৭৭ সালে খাজা পরিবারের দায়িত্বভার দিয়েছিলেন পুত্র আহসান উল্লাহের উপর। ১৮৯৬ সালে যেদিন তিনি পরলোকগমন করেন সেদিন ঢাকার সকল স্কুল, কলেজ, অফিস-আদালত বন্ধ ছিল।

১৮৭৫ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রিন্স অফ ওয়েলস, এলবার্ট এডওয়ার্ড (সপ্তম এডওয়ার্ড) উপমহাদেশ সফরের অঙ্গ হিসাবে কলকাতায় আসেন। কলকাতায় তার পদার্পণ স্মরণীয় করে রাখতে নবাব আবদুল গণি একটি কারুকার্যমন্ডিত পথপার্শ্ব মন্ডপ স্থাপন করেন। স্থাপত্যটির উৎসর্গ ফলকে এখনো পড়া যায় নবাব গনি ও নবাব আহসানুল্লাহ-র নাম। ভগ্ন ও পরিচর্যাহীন দশাতে আজও কলকাতার ফেয়ারলী প্লেস ও স্ট্র্যান্ড রোডের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে আছে এই স্মৃতিস্তম্ভ। স্থাপত্যটির মধ্যে প্রতিদিন চলে একটি চায়ের দোকান।
সারা ঢাকায় নয়ন জুড়ানো স্থাপত্য, বিদ্যুতায়ন, পানি পরিশোধন, পার্ক, আধুনিক মার্কেট তৈরিসহ নবাবদের বহু অবদান চোখে পড়ে, কিন্তু চোখে পড়ে না, এ রকম অজানা অনেক তথ্যও রয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়।
ব্রিটিশ রাজ দ্বারা ভূষিত ঢাকার প্রথম নবাব ছিলেন খাজা আলিমুল্লাহ আর শেষ নবাব খাজা হাবিবুল্লাহ। তবে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, নবাব সলিমুল্লাহই শিল্প, শিক্ষা, নগর উন্নয়নে তার পরিবারের অন্যদের তুলনায় অনেক বেশি অবদান রেখেছেন।
১৮৬৩ খ্রি. নওয়াব আবদুল লতিফের মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি প্রতিষ্ঠার সঙ্গে নওয়াব খাজা আবদুল গনি ও খাজা আহসানুল্লাহ প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।
১৮৭৮ খ্রি. সৈয়দ আমীর আলী ‘সেন্ট্রাল ন্যাশনাল মোহামেডান অ্যাসোসিয়েশন’ প্রতিষ্ঠা করলে ঢাকার নওয়াব তাতে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।
শিক্ষা ও চাকরির ক্ষেত্রে মুসলমানদের সংখ্যানুপাতে সুযোগ আদায়ের লক্ষ্যে ওই অ্যাসোসিয়েশন সরকারকে স্মারকলিপি দেয়ার জন্য ১৮৮৫ খ্রি. এক স্বাক্ষর অভিযান চালায়।
নওয়াব আবদুল গনি এ অঞ্চলের ৫ হাজার লোকের স্বাক্ষর সংগ্রহ করে ১৮৮৫ খ্রি. নভেম্বর মাসে বঙ্গীয় সরকারের কাছে এক স্মারকলিপি পেশ করেন।

ঢাকার প্রথম পানি শোধনাগার ঢাকা ওয়াটার ওয়ার্কস। ১৮৮০-এর দশকের ছবি
১৮৭১ সালে নবাব খাজা আব্দুল গনি কেসিএসআই উপাধি লাভ করেন। এই আনন্দে তিনি পানি শোধনাগার স্থাপনের জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকা দান করার ঘোষণা দেন। উদ্যোগ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি কমিটিও গঠিত হয় তখন। কমিটি অনেক ভেবেচিন্তে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে।
কিন্তু নবাবের সেই দানে এত বড় প্রকল্প বস্তবায়ন সম্ভব ছিল না। আবদুল গনি তখন দানের পরিমাণ দ্বিগুণ করে দেন। শর্ত ছিল, পরিশ্রুত পানি ঢাকাবাসীকে দিতে হবে বিনামূল্যে। নবাব আহসানউল্লাহ বললেন, ওয়াটার ওয়ার্কস নির্মিত হলে তিনি তা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বাড়তি দেবেন ৫০ হাজার টাকা।
একই সময় পানি সরবরাহের জন্য পাইপ বসানোর খরচ হিসেবে ৯০ হাজার টাকা দেয় সরকার। বাস্তবায়নের পালা শুরু হয় ১৮৭৪ সালে। ওই বছর ২৯তম ভাইসরয় লর্ড নর্থব্রুক এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। কাজ শেষে উদ্বোধন করেন ঢাকার কমিশনার এফবি পিকক।
প্রথম দিকে এ পানি সরবরাহের জন্য ঢাকায় চার মাইল দীর্ঘ পাইপলাইন বসানো হয়েছিল। নবাব আহসানউল্লাহর দানে পাইপলাইন আরও সম্প্রসারিত হয়। এক হিসেব বলছে, ১৮৯৩ সালে ১৬ মাইল দীর্ঘ পাইপলাইনের সাহায্যে ৩ লাখ ৬০ হাজার গ্যালন পানি দৈনিক সরবরাহ করা হতো।

১৮৫৭ সালে জলপাইগুড়ির ৩৪তম রেজিমেন্টে সিপাহি বিদ্রোহ ঘটলে এর আঁচ ঢাকাতেও এসে লাগে। খবরটি লালবাগের ৭৩তম রেজিমেন্টে পৌঁছে দেয় জলপাইগুড়ির সিপাহিরা। কিন্তু লালবাগে বিদ্রোহের আগুন ঝলসে ওঠার আগেই ইংরেজ নৌসেনারা তা প্রতিহত করে। তারা পরাস্ত সিপাহিদের আন্টাঘর ময়দানের গাছের সারিতে ফাঁসি দেয় এবং জনগণের প্রদর্শনের জন্য বহুদিন ধরে লাশ ঝুলিয়ে রাখে। সে সময় মড়ার গন্ধে মহল্লার লোকেদের পক্ষে ময়দানের পাশ দিয়ে হাঁটাচলা দুষ্কর হয়ে পড়েছিল। সন্ধ্যার পর অনেকেই সে পথে চলাচল করতে ভয় পেত। তাদের অভিযোগ ছিল, গভীর রাতে ময়দান থেকে গোঙানির আওয়াজ ভেসে আসে! এমনটাই লিখেছেন হৃদয়নাথ মজুমদার তাঁর স্মৃতিচারণায়। এ রকম নানা কেচ্ছাকাহিনি সাহিত্যেও স্থান পেয়েছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ‘ফেরারি’ গল্পের চরিত্র খিজির যেমন পাঠককে সতর্ক করে বলে, ‘আমাগো বাপ–দাদায় আমাগো বহুত কইছে, রাইত হইলে ঐ ময়দানের বগলেও ভি যাইবি না।’