• ২রা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ১৯শে বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ১৫ই জিলকদ, ১৪৪৭ হিজরি

তিতুমীর ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অনন্য ব্যক্তিত্ব

usbnews
প্রকাশিত মার্চ ১০, ২০০৮
তিতুমীর  ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের অনন্য ব্যক্তিত্ব
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর।  তার সাফল্যে হিন্দু জমিদাররা ভয় পেয়ে যায়৷ এরপর শুরু হয় ওয়াহাবীদের ওপর জমিদারদের অত্যাচার। এমনকি দাড়ি, মসজিদ নির্মাণ, নাম পরিবর্তনের ওপর খাজনা আদায় শুরু হয়। এসব কারণে তিতুমীরের সঙ্গে স্থানীয় জমিদার ও ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হয়। স্থানীয় জমিদারদের সঙ্গে কয়েকটি সংঘর্ষে জয়লাভ করেন তারা৷ তার নির্দেশে হিন্দু-মুসলমান প্রজারা খাজনা দেওয়া বন্ধ করে।এরপর বারাসাতে সরকারের বিপক্ষে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেন। চব্বিশ পরগণার কিছু অংশ, নদীয়া ও ফরিদপুরের একাংশ নিয়ে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। বারাসাত বিদ্রোহ নামে পরিচিত এ বিদ্রোহে বর্ণহিন্দুর অত্যাচারে জর্জরিত অনেক হিন্দু কৃষকও অংশগ্রহণ করে। এতে গোবরা গোবিন্দপুরের জমিদার নিহত হন।

ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর ১৭৮২ সালের ২৭ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমার চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি তিতুমীর নামেই বেশি পরিচিত। জমিদার ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে তার নির্মিত দুর্গ বাঁশের কেল্লা এ অঞ্চলের স্বাধীনতাকামীদের যুগে যুগে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে।

 

সৈয়দ নিসার আলি ‘তিতুমীর’ নামে সমধিক প্রসিদ্ধ। স্বাধীনতাসংগ্রামী ও কৃষক বিদ্রোহের নেতা হিসাবে তাঁর নাম ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে। তিতুমীর ১৭৭২ খ্রিস্টাব্দের ১৪ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। কারো মতে, ১৭৮২ খ্রিস্টাব্দে তিনি ভূমিষ্ট হন। সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালি কৃষকের ঘরেই তাঁর জন্ম। উত্তর চব্বিশ পরগনার বাদুড়িয়া থানার অন্তর্গত চাঁদপুর, যার নাম বর্তমান হায়দারপুর গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। বাল্যকালে তিনি প্রায়ই ঘুষঘুষে জ্বরে ভুগতেন। রোগমুক্ত হওয়ার জন্য তৎকালীন গ্রাম্যধারা অনুযায়ী চিকিৎসা মতে প্রায়ই শিউলিপাতা বা অনুরূপ অন্যান্য তেতো পাতার রস তাকে খেতে হত। তিতুমীর ‘তিতাপাতা’ খেতে আপত্তি করতেন না বলে জয়নাব খাতুন আদর করে নাতিকে তিতামিঞা বলে ডাকতেন। পরবর্তীকালে মীর তিতামিঞা ‘তিতুমীর’ নামে অভিহিত হন। কিশোর বয়সে কৃষিকার্যে নিযুক্ত থাকায় তাঁর স্বাস্থ্য বেশ ভালো ছিল। শরীর চর্চার সঙ্গে তিনি মল্লযুদ্ধ, লাঠি-সড়কি চালনা এবং অন্যান্য ক্রীড়ায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

তিতুমীর নির্মাণ করেছেন তাঁর ঐতিহাসিক বাঁশের কেল্লা। ১৫ নভেম্বর ১৮৩১-এ বিদ্রোহীরা বারঘরিয়া নীলকুঠি আক্রমণ করে। তারা পিরোঁ সাহেবকে না পেয়ে তাঁর কুঠি ও বাংলো ধ্বংস করে। বইপত্র যা পায় সব ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে। ১৬ নভেম্বর স্মিথ সাহেব বারঘরিয়া পৌঁছে শুধু ধ্বংসস্তূপই দেখতে পান। স্টর্ম সাহেবের হুগলি কুঠির ম্যানেজার ছিলেন মি. হেনরি ব্লন্ড। বিদ্রোহীরা হুগলির নীলকুঠি আক্রমণ করে এবং ব্লন্ড সাহেব ও তাঁর স্ত্রী শিশুপুত্রকে ধরে নিয়ে বাঁশের কেল্লায় তিতুমীরের সামনে হাজির করে। সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ ও তিতুমীরের পক্ষে নীল চাষ করার প্রতিশ্রুতিতে ব্লন্ড সাহেব সপরিবারে মুক্তি পান। অবশ্য বাঁশের কেল্লা ইংরেজদের দখলে এলে তিনি তিতুমীরের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক হলফনামা দিয়েছিলেন।

এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, তিতুমীর সিলেটের ভারত বিখ্যাত পীর হজরত শাহজালালের অন্যতম শিষ্য ছিলেন। পীর হজরত গোরাচাঁন হাড়োয়া খাসবালান্দা রাজীর কনিষ্ঠ ভ্রাতা সৈয়দ শাহাদাত আলির একত্রিশতম অধস্তন পুরুষ। তখনকার দিনে একটা ধারণা মানুষের মনে অত্যন্ত দৃঢ় ছিল, ‘ধর্মই মানুষকে পরম মুক্তি দিতে পারে।’ হয়তো সেই আশাতেই তিতুমীর মক্কা শরিফে গমন করেন। সেখানে তাঁর সঙ্গে সংযোগ ঘটে শাহ সৈয়দ আহমদ ব্রেলভীর। তাঁর সাহচর্যে এসে তিতুমীর হারানো মানসিক স্থৈর্য ফিরে পান। এই ব্রেলভী ভারতের অযোধ্যা রাজ্যের রায়বেরিলিতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ওয়াহাবী সম্প্রদায়ের অনুসৃত মতের অন্যতম প্রচারক। তিতুমীর তাঁর কাছেই ওয়াহাবী আদর্শে দীক্ষা নেন।

দরিদ্র মুসলিম কৃষক সমাজে তিতুমীরের প্রভাব ক্রমশই বৃদ্ধি পাচ্ছিল। ১৮৩১ সালের ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত তিতুমীর জমিদারের কাছে হয়ে উঠেছিলেন প্রায় অপ্রতিরোধ্য। ভূষাণার জমিদার মনোহর রায়ও তিতুমীরের দলভুক্ত হয়ে শক্তিসামর্থ ও অর্থসাহায্য দেন।

 

১৮৩১ সালের ১৩ নভেম্বর ব্রিটিশ সৈন্যরা তাদের চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে। তিতুমীর স্বাধীনতা ঘোষণা দিলেন, ‘ভাই সব, একটু পরেই ইংরেজ বাহিনী আমাদের কেল্লা আক্রমণ করবে। লড়াইতে হার–জিত আছেই, এতে আমাদের ভয় পেলে চলবে না। দেশের জন্য শহীদ হওয়ার মর্যদা অনেক। তবে এই লড়াই আমাদের শেষ লড়াই নয়। — আমরা যে লড়াই শুরু করলাম, এই পথ ধরেই একদিন দেশ স্বাধীন হবে’। ১৯ নভেম্বর কর্নেল হার্ডিং–এর নেতৃত্বে ব্রিটিশ সৈন্যরা তিতুমীর ও তার অনুসারীদের আক্রমণ করে। ১৯ নভেম্বর তিতুমীর ও তার  সহচর শহীদ হন।

 

১৮৩১ সালের ১৭ অক্টোবর সরফরাজপুর থেকে নারকেলবাড়িয়ায় চলে আসেন তিনি। ২৩ অক্টোবর বাঁশ এবং কাদা দিয়ে দুই স্তরবিশিষ্ট বিখ্যাত বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন। বাঁশের কেল্লা তৈরিতে সহযোগিতা করেছিল জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সব শ্রেণীর মানুষ। এ সময় তার অনুসারী সংখ্যা প্রায় ৫,০০০ জন।

২৯ অক্টোবর কৃষ্ণদেব নারকেলবাড়িয়া আক্রমণ করে বহু লোক হতাহত করে। ৩০ অক্টোবর এ বিষয়ে মামলা দায়ের করতে গেলে কোনো ফল হয় না। ৬ নভেম্বর কৃষ্ণদেব আবার নারকেলবাড়িয়ায় আক্রমণ করে। প্রচণ্ড সংঘর্ষে হতাহত হয় প্রচুর। এরপর গোবরডাঙ্গার আটি নীলকুটির ম্যানেজার মি. ডেভিস ৪০০ হাবশি যোদ্ধা নিয়ে নারকেলবাড়িয়া আক্রমণ করলেন। শেষ পর্যন্ত মি. ডেভিস প্রাণ নিয়ে পালিয়ে গেলেন। ২-৩ দিন পর জমিদার দেবনাথ বাহিনী নিয়ে নারিকেলবাড়িয়া আক্রমণ করে সংঘর্ষে প্রাণ হারান। আরও কয়েকটি সংঘর্ষের পর ১৩ নভেম্বর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্নেল স্টুয়ার্ডকে সেনাপতি করে একশত ঘোড়া, তিনশত পদাতিক সৈন্য ও দুটি কামানসহ নারকেলবাড়িয়ায় পাঠান। প্রচণ্ড সংঘর্ষে উভয়পক্ষের অসংখ্য লোক হতাহত হয়। দারোগা ও একজন জমাদ্দার বন্দি হন।

১৯ নভেম্বর গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক তিতুমীরকে শায়েস্তা করতে কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে সেনাবহর পাঠান। স্টুয়ার্ট বিরাট সেনাবহর ও গোলন্দাজ বাহিনী নিয়ে বাঁশের কেল্লা আক্রমণ করেন। তিতুমীরের ছিল মাত্র চার-পাঁচ হাজার সৈনিক। ছিল না পর্যাপ্ত গোলাবারুদ-বন্দুক। তবুও প্রচণ্ড যুদ্ধ হলো। কিন্তু তারা তলোয়ার ও হালকা অস্ত্র নিয়ে ব্রিটিশ সৈন্যদের আধুনিক অস্ত্রের সামনে দীর্ঘসময় দাঁড়াতে পারেননি। গোলার আঘাতে ছারখার হয়ে যায় কেল্লা। শহীদ হন বীর তিতুমীরসহ অসংখ্য মুক্তিকামী সৈনিক। ২৫০ জনেরও বেশি সৈন্যকে ইংরেজরা বন্দি করে। পরে এদের কারও কারাদণ্ড আবার কারও ফাঁসি হয়।

১৮ বছর বয়সে তিতুমীর কোরআনে হাফেজ হন এবং হাদিস বিষয়ে পাণ্ডিত্য লাভ করেন। একই সাথে তিনি বাংলা, আরবি ও ফার্সি ভাষায় পারদর্শীতা অর্জন করেন। ১৮২২ সালে তিতুমীর মক্কায় হজ্জব্রত পালনের উদ্দেশ্যে যান। তিনি সেখানে আরবের স্বাধীনতার অন্যতম পথপ্রদর্শক সৈয়দ আহমেদ শহীদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন ও ওয়াহাবী মতবাদে অনুপ্রাণিত হন। সেখান থেকে এসে (১৮২৭) তিতুমীর তার গ্রামের দরিদ্র কৃষকদের সাথে নিয়ে জমিদার এবং ব্রিটিশ নীলকদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হয়ে আন্দোলন শুরু করেন। তিতুমীর জমিদার কৃষ্ণদেব রায় কর্তৃক মুসলমানদের উপর বৈষম্যমূলকভাবে আরোপিত ‘দাঁড়ির খাজনা’ এবং মসজিদের করের তীব্র বিরোধিতা করেন। তিতুমীর ও তার অনুসারীদের সাথে স্থানীয় জমিদার ও নীলকর সাহেবদের মধ্যে সংঘর্ষ তীব্রতর হতে থাকে। তিনি তার অনুসারীদের প্রশিক্ষণ সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে তোলেন।

ঊনবিংশ শতকের প্রথম থেকেই নীলচাষিদের উপর ইংরেজদের প্রচন্ড অত্যাচার শুরু হয়েছিল। সেরা জমিতে নীলচাষ করতে বাধ্য করা, জমি মাপজোকের সময় কারচুপি করা, কুঠিতে নীল জমা নেওয়ার সময় ওজনে ঠকানো, নানাবিধ নির্যাতন ও গালিগালাজ চলতে থাকে প্রতিদিন। ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে পঞ্চম আইনে দাদন নিয়ে নীলচাষ না-করা আইন বিরুদ্ধ ঘোষিত হওয়ায় অত্যাচার ক্রমে চরমে উঠে। এসব কথা ও বহুদিনের পঞ্জীভূত ক্ষোভ কৃষকরা ভুলতে পারেনি। তিতুমীরের অনুগামীরা সাহেবদের দেওয়া দাদনের কাগজপত্র নষ্ট করে কৃষকদের বাঁচাবার জন্য একের পর এক নীলকুঠি আক্রমণ করতে থাকে। তাদের বারঘরিয়ার অভিযান সফল হয়, হুগলির নীলকুঠি তারা তছনছ করে দেয়।

বারঘরিয়া ও হুগলির নীলকুটি মালিক ছিলেন উইলিয়াম স্টর্ম। তার বারঘরিয়া কুঠির ম্যানেজার মিস্টার পিঁরো ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দের ৯ নভেম্বর তিতুমীরের শক্তিবৃদ্ধি ও নীলকুঠির উপর আক্রমণের ঘটনায় শঙ্কিত হয়ে ব্রিটিশ সরকারের সবিশেষ দৃষ্টি আকর্ষণ করে সংবাদ পাঠান। বারাসতের জয়েন্ট ম্যাজিস্ট্রেট মিস্টার আলেকজান্ডার ১১ নভেম্বরে পত্র পেয়ে বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি তৎক্ষণাৎ বিভাগীয় কমিশনার মি. বারওয়েলকে বিষয়টি জানালেন। কমিশনার সাহেবও সরেজমিন-তদন্তে পরিস্থিতির গুরুত্ব উপলব্ধি করে ঊর্ধ্বতন সরকার পক্ষকে রিপোর্ট দিলেন। ১৪ নভেম্বর আলেকজান্ডার সাহেব সরকারের নির্দেশ অনুযায়ী বাগান্ডির নেমোকপোক্তানস্থিত সিপাহিসহ সদলবলে নারকেলবেড়িয়ার মাঠে উপস্থিত হলেন। তিতুমীরকে ভয় দেখানোর জন্যে বন্দুকের ফাঁকা আওয়াজ করলেন এই ইংরেজ পুরুষ। যুদ্ধ ঘোষণায় সাড়া দিয়ে তিতুমীরের বিদ্রোহী বাহিনী সেই গুলির আওয়াজ গ্রাহ্য না করে সিপাহিদের আক্রমণ করল। সেই যুদ্ধে বসিরহাটের দারোগা, জমাদারসহ বহু সিপাহি বন্দি হলো। আলেকজান্ডার সাহের ঘোড়ায় চেপে পালিয়ে যেতে বাধ্য হলেন। ১৪ নভেম্বর মি. স্মিথ তিতুমীরের বিরুদ্ধে অভিযান করেন।