ফিল্ড মার্শাল রবার্ট নিজের হিন্দুস্তান মে ৪১ সাল গ্রন্থে লিখেছেন, শুধু ১৮৫৭ সালেই ২৭ হাজার মুসলমানকে ফাঁসি দেয়া হয়েছে! আর নির্বিচারে গণহত্যার শিকার হয়েছে অগণিত মুসলমান! ইতিহাস বিশেষজ্ঞ এডওয়ার্ড থমাস লিখেছেন, ১৮৬৪ থেকে ১৮৬৭ পর্যন্ত মাত্র তিন বছরে ১৪ হাজার মুসলমানকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে!
ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলমানদের অবদান বিশেষভাবে রয়েছে। অনেক ব্যক্তি একটি স্বাধীন জাতি গঠনের জন্য তাদের কারাবাস, নির্বাসন, এমনকি জীবনহানি সহ্য করেছে। এই আত্মত্যাগগুলি কারণের প্রতি তাদের অটল অঙ্গীকারের একটি স্থায়ী প্রতীক হয়ে ওঠে, যা ভবিষ্যত প্রজন্মকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে অনুপ্রাণিত করে।
যদি মুসলমানরা ভারত স্বাধীন করতে ময়দানে অবতীর্ণ না হতেন, হয়তো আজও ভারতবাসী ইংরেজদের গোলাম হয়ে থাকত!
কিন্তু আফসোসের বিষয়, আজ জেনে-বুঝে পরিকল্পনা করে ভারতবর্ষের স্বাধীনতার গল্প-ইতিহাস থেকে মুসলমানদের নাম-নিশানা নিশ্চিহ্ন করার কুচেষ্টা চলছে! ফলে মুসলমানদের জন্য আবশ্যক হলো, স্বাধীনতার ইতিহাস অধ্যয়ন করা, পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস জানানো। নিজেদের অতীত মনীষীদের বীরত্বপূর্ণ ও আলোকিত সংগ্রামের কথা জানানো। বিশেষ করে ১৫ আগস্ট ও ২৬ জানুয়ারি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব অনুষ্ঠান হয়, তখন মুসলমানদের বীর মুজাহিদ ও নেতাদের বীরত্বগাঁথা স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি।
‘ইসলাম ইন ইন্ডিয়া’ গ্রন্থের লেখক স্যার যদুনাথ সরকার ভারতে মুসলমানদের বিশেষ ১১টি অবদানের কথা বর্ণনা করেছেন। সেগুলো হলো: ১. বহিঃবিশ্বের সাথে সংস্পর্শের প্রত্যার্পণ, ভারতীয় নৌ-শক্তির পুনরুজ্জীবন। ২. ভারতের ব্যাপক অংশের ওপর অভ্যন্তরীণ শান্তি। ৩. প্রসাশনিক সামঞ্জস্য। ৪. উচ্চতর শ্রেণীর লোকদের মধ্যে সামাজিক রীতিনীতি ও পোশাকের সমতা। ৫. ভারত ও আরবের শিল্পকলার সম্মিলন। ৬. একটি সাধারণ ভাষা, যা সরকারি ভাষা হিসেবে গঠিত। ৭. দিল্লি-আগ্রার রাজদরবারের কাছে স্বদেশি সাহিত্যের উত্থান। ৮. একেশ্বরবাদী ধর্মীয় ভাবধারার পুনরুজ্জীবন ও সুফিবাদ। ৯. অত্যন্ত মূল্যবান ঐতিহাসিক সাহিত্যকর্ম, যা মধ্যযুগের ইতিহাস পুনরায় গঠন করতে সাহায্য করেছে। ১০. যুদ্ধের কলাকৌশলের উৎকর্ষ সাধন। ১১. অভ্যাস ও স্বভাবের সূক্ষ্মতা।
২০০৭ সালে, তেহেলকা ম্যাগাজিনটি ” সত্য: গুজরাত ২০০২ “ প্রকাশ করেছিল, যে প্রতিবেদনটি রাজ্য সরকারকে সহিংসতায় জড়িত করেছিল এবং দাবি করেছিল যে যাকে যাকে স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিশোধের কাজ বলা হয়েছিল, বাস্তবে এটি ছিল “রাষ্ট্র-অনুমোদিত পোগ্রোম”।
উইকিপিডিয়া, মুক্ত বিশ্বকোষ থেকে সরাসরি নেয়া তথ্য বলছে , দেশের বৃহত্তম ধর্মীয়-সংখ্যালঘু হওয়া সত্ত্বেও, ভারতের মুসলিম সম্প্রদায়গুলি প্রায়শই হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা সহিংস আক্রমণ ও হামলার শিকার হয়েছে। অতীতে, এই আক্রমণগুলি সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসেবে বিবেচিত ছিল এবং হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব হিসাবে চিহ্নিত হয়েছিল। তবে, বাবরি মসজিদ ভেঙে দেওয়ার পরে হিন্দু-জাতীয়তাবাদের উত্থানের সাথে সাথে আক্রমণগুলি আরও নিয়মতান্ত্রিক হয়ে উঠেছে, রাষ্ট্র-অনুমোদিত কার্য্যক্রমের আকার নিয়েছে। ১৯৫০ সাল থেকে শুরু হওয়ার পর ১৯৫৪ সাল থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনাবলীতে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় প্রায় ১০০০০ মুসলিম নিহত হয়েছেন।
SETALVAD, TEESTA। “Gory winter”। Frontline (ইংরেজি ভাষায়) থেকে জানা যায় , হিন্দু জাতীয়তাবাদীদের দ্বারা বাবরি মসজিদ ধ্বংসের ফলে ১৯৯২ সালের বোম্বাই দাঙ্গা সরাসরি হয়েছিল। দ্য হিন্দু ফ্রন্টলাইন ম্যাগাজিনে গরি উইন্টার নামে প্রকাশিত একটি নিবন্ধ অনুসারে, “আনুষ্ঠানিকভাবে, পুলিশের দ্বারা জনতা দাঙ্গা ও গুলি চালিয়ে ৯০০ মানুষ মারা গিয়েছিলেন, ২,০৩৬ জন আহত এবং হাজার হাজার অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন।” বিবিসির সংবাদদাতা তোরাল ভারিয়া দাঙ্গাগুলিকে “একটি পূর্বপরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক সহিংসতা” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন যা ১৯৯০ সাল থেকে চলছে, এবং বলেছিল যে মসজিদ ধ্বংস “চূড়ান্ত উসকানি”।
গরুর মূল্য তাদের কাছে থাকলেও মুসলিমদের মূল্য নেই।
১৯৪৭ সালে জম্মুতে মুসলমানদের হত্যাযজ্ঞ, হায়দরাবাদে অপারেশন পোলোর পরে মুসলমানদের ব্যাপকহারে হত্যা, ১৯৫০ সালে বরিশাল দাঙ্গা ও ১৯৬৪ সালে পূর্ব-পাকিস্তান দাঙ্গার পরে কলকাতায় মুসলিম দাঙ্গা, ১৯৬৯ সালের গুজরাত দাঙ্গা, ১৯৮৪ ভীভান্দি দাঙ্গা, ১৯৮৫ গুজরাত দাঙ্গা, ১৯৮৯ ভাগলপুর দাঙ্গা, বোম্বাই দাঙ্গা, ১৯৮৩ সালে নেলি এবং ২০০২ সালে গুজরাতের দাঙ্গা , ২০১৩ সালে মুজাফফরনগর দাঙ্গা ও ২০২০ সালে দিল্লি দাঙ্গা।
১৯৫০ সাল থেকে হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ১০,০০০ জনেরও বেশি মানুষ মারা গেছে। সরকারী পরিসংখ্যান অনুসারে, ১৯৫৪ থেকে ১৯৮২ সালের মধ্যে এবং ১৯৬৮ থেকে ১৯৮০ সালের মধ্যে ৬,৯৩৩ জন সাম্প্রদায়িক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, সেখানে ৫৩০ জন হিন্দু এবং ১৫৯৮ জন ছিল মুসলিম, মোট ৩,৯৯৯ জন সহিংসতার ঘটনায় মারা গিয়েছিল।
Hazarika, Sanjoy (২৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৪)। “Peace fragile in Assam a year after carnage”। The New York Times। সংগ্রহের তারিখ ২০১৫-০৪-০৮। থেকে জানা যায় , নেলি গণহত্যার বিষয়ে তিওয়ারি কমিশনের সরকারী প্রতিবেদন এখনও একটি নিবিড়ভাবে রক্ষিত গোপনীয় বিষয় (কেবল তিনটি অনুলিপি বিদ্যমান)। ৬০০ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনটি ১৯৮৪ সালে আসাম সরকারকে জমা দেওয়া হয়েছিল এবং কংগ্রেস সরকার ( হিতেশ্বর সাইকিয়া নেতৃত্বে) এটিকে প্রকাশ্যে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল এবং পরবর্তী সরকারগুলিও তার অনুসরণ করেছিল। আসাম ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট এবং অন্যরা তিওয়ারি কমিশনকে জনসমক্ষে প্রকাশ করার জন্য আইনি প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, যাতে ঘটনার কমপক্ষে ২৫ বছর পরে ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে যুক্তিসঙ্গত ন্যায়বিচার সরবরাহ করা যায়।
এতে জানা যায়, মুসলিমরা কখনই অত্যাচারী ছিল না। অন্য সম্প্রদায়কে সবসময় সম্মান ও সুযোগসুবিধা দিত। মিলেমিশে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ থাকত। কিন্তু বিনিময়ে আজ ওরা কী পাচ্ছে?
জয় শ্রী রাম বলে যারা হত্যাযজ্ঞে মেতেছে, তারা প্রকৃত হিন্দু কিংবা সনাতনী নয়। প্রকৃত হিন্দু কখনও অন্য জাতির ওপর আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখাতে পারেন না।
ধর্মের বাণী প্রচার করা, আর হত্যা করে ধর্ম প্রতিষ্ঠা করা অনেক পার্থক্য। ভারতের সংবিধান অসাম্প্রদায়িক চেতনার। সেখানে সব জাতির প্রতি সমান দৃষ্টি রাখার কথা বলা হয়েছে।
মোতাহার হোসেন চৌধুরী তার ‘স্বাধীনতা : জাতীয়তা ও সাম্প্রদায়িকতা’ প্রবন্ধে উল্লেখ করেছেন, ভারতবর্ষ কার- এ প্রশ্নের উত্তরে বহু আগেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন : ‘নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ বিস্মৃত হয়ে যে ভারতবর্ষের সেবা করে ভারতবর্ষ তার, কারণ সেবার দ্বারাই সে তাকে আপন করে- তার অভিভাবক হয়ে দাঁড়ায়।’
সুতরাং মোদি পরিচালিত যে ভারত, সে ভারত আর আগের ভারত এক নয়। ভারতের বুদ্ধিজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের উচিত, এর বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রাখা।
“Hashimpura massacre: Rifles given to PAC”। The Times India। ২৭ জুলাই ২০০৬। ৪ নভেম্বর ২০১২ তারিখে মূল থেকে আর্কাইভ করা। সংগ্রহের তারিখ ১০ মে ২০২০ থেকে জানা যায় , ১৯৬৯ সালের গুজরাত দাঙ্গার সময় কয়েকশত মুসলিমকে গণহত্যার শিকার হতে হয়। ১৯৭০-এর ভাওয়ান্দি দাঙ্গা ছিল মুসলিম বিরোধী সহিংসতার একটি উদাহরণ যা ৭ ই মে থেকে ৮ ই মে ভারতের ভিবান্দি, জলগাঁও এবং মাহাদ শহরে সংঘটিত হয়েছিল। সেখানে মুসলিম মালিকানাধীন সম্পদের ব্যাপক পরিমাণে অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর হয়েছিল। ১৯৮০ সালে মুরাদাবাদে আনুমানিক ২,৫০০ মানুষ মারা গিয়েছিল। সরকারী হিসাবে আনুমানিক ৪০০ এবং অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের অনুমান ১৫০০ থেকে ২০০০ এর মধ্যে। স্থানীয় পুলিশকে সহিংসতার পরিকল্পনার জন্য সরাসরি জড়িত করা হয়েছিল।
আনন্দবাজার পত্রিকা ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও ভাষাতাত্ত্বিক অধ্যাপক শেলডন পোলকের মতামত ছাপিয়েছিল। সেখানে তিনি বলেছিলেন, ‘মুসলমান শাসকরা জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করলে বর্তমান ভারতে একজনও হিন্দু থাকত না।’
এতে জানা যায়, মুসলিমরা কখনই অত্যাচারী ছিল না। অন্য সম্প্রদায়কে সবসময় সম্মান ও সুযোগসুবিধা দিত। মিলেমিশে অসাম্প্রদায়িক চেতনায় উদ্বুদ্ধ থাকত। কিন্তু বিনিময়ে আজ ওরা কী পাচ্ছে?
ভারতের স্বাধীনতায় মুসলিমদের অবদান
সিপাহসালার হুসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-কে ইংরেজরা আদালতে উপস্থিত করলে বিচারক জিজ্ঞাসা করে, হুসাইন আহমদ, তুমি আমাদের বিরুদ্ধে ফতোয়া দিয়েছ। তোমার জানা আছে, তার কী পরিণতি হবে? মাদানি কাঁধের ওপর থাকা নিজের রুমাল জজকে দেখিয়ে বলেন, এটা আমার কাফন। সব সময় কাঁধে নিয়ে ঘুরি। আমি জানি, আমার সর্বোচ্চ পরিণতি মৃত্যু!
শাইখুল হিন্দ স্বশস্ত্র সেনাবাহিনীর মতো সংগঠিত হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে চাইতেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি রেশমি রুমাল আন্দোলন শুরু করেছিলেন। ইংরেজ গোয়েন্দাদের চোখ ফাঁকি দিতে রেশমের রুমালে চিঠি লিখে অন্যান্য দেশের শাসকদের কাছে পাঠাতেন। তাদের কাছে সাহায্য কামনা করতেন। ষড়যন্ত্র ও গাদ্দারির কারণে এই আন্দোলন সফলতার মুখ না দেখলেও মুসলমানদের ভেতর স্বাধীনতার অগ্নি স্ফুলিঙ্গ তুমুলভাবে জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
পুরো হিন্দুস্তানের শীর্ষস্থানীয় সকল মনীষী আলেম ছিলেন রেশমি রুমাল আন্দোলনের নেতা। উপরোক্ত আন্দোলনসমূহ ব্যতীত উপমহাদেশ স্বাধীন করার জন্য মুসলমানরা অনেক সংগ্রাম করেছিলেন। তারা জেল-জুলুম সহ্য করেছেন, ক্ষুধার যন্ত্রণায় ভুগেছেন, নির্বাসিত হয়েছেন, ফাঁসিতে ঝুলেছেন, আগুনে পুড়েছেন, বুকে বুলেট বিদ্ধ হয়েছেন। এসব নারকীয় নির্যাতন সহ্য করেছেন, কিন্তু হিন্দুস্তানে লাল চামড়ার ইংরেজদের গোলামি সহ্য করেননি।
মাওলানা শাহ আব্দুল আজিজ, শাহ আব্দুল গনি, শাহ রফিউদ্দীন, শাহ ইসহাক, হাজি ইমদাদুল্লাহ, কাসেম নানুতবি, রশিদ আহমদ গাঙ্গুহি, হুসাইন আহমদ মাদানি, মাহমুদুল হাসান মাদানি, মনির নানুতবি, আতাউল্লাহ শাহ বুখারি, উবাইদুল্লাহ সিন্ধি, শাহ আব্দুর রহিম রায়পুরি, ফজলে হক খয়রাবাদি, হাফেজ জামেন শহিদ, মুহাম্মদ বাকের, শাহ ইসমাইল শহিদ, আবুল কালাম আজাদ, সানাউল্লাহ অমৃতসরি, নজির হুসাইন, হাকিম আজমল খান, ইশফাকুল্লাহ খান, খান আব্দুল গাফফার খান, আমজাদি বেগম, হজরত মহল, হাসরাত মুহানি, মুফতি কেফায়েতুল্লাহ, হাকিম নুসরাত হুসাইন, মুহাম্মদ আলি জাওহার, শওকত আলি জাওহার, কারামাত আলি, সাইদুর রহমান কাবুলি, ফয়জ আহমদ বাদায়ুনি (রহ.) প্রমুখ মহান মনীষীরা ছিলেন হিন্দুস্তান স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতা।
উল্লিখিত মুজাহিদ ব্যতীত আরো অসংখ্য মুসলমান ও উলামায়েকেরাম মাতৃভূমি প্রিয় হিন্দুস্তানের জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকার করেছেন। ভয়াবহ অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। মুসলমান-উলামায়েকেরামের আলোচনা ব্যতীত হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস কোনোভাবেই পূর্ণতা পেতে পারে না। মুসলমানরা ভারত স্বাধীন করতে যেসব বিসর্জন দিয়েছেন, তা এই ছোট্ট প্রবন্ধে বর্ণনা করা অসম্ভব। যদি মুসলমানরা ভারত স্বাধীন করতে ময়দানে অবতীর্ণ না হতেন, হয়তো আজও ভারতবাসী ইংরেজদের গোলাম হয়ে থাকত!
মুসলিম নেতারা ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস এবং অন্যান্য রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে প্রধান ব্যক্তিত্ব হিসেবে আবির্ভূত হন। মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, একজন বিশিষ্ট স্বাধীনতা সংগ্রামী এবং পণ্ডিত, হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে ঐক্যের জন্য তিনি আহ্বান করেন। তাঁর বাগ্মিতা এবং বুদ্ধি উভয় সম্প্রদায়ের সাথে অনুরণিত হয়েছিল। মাওলানা মোহাম্মদ আলী জওহর ব্রিটিশ নিপীড়নের বিরুদ্ধে ঐক্যফ্রন্টের প্রয়োজনীয়তার উপর জোর দিয়েছিলেন। আরেকজন বিশিষ্ট নেতা, অসহযোগ আন্দোলন এবং খিলাফত আন্দোলনে তার কণ্ঠস্বর দেন, যার লক্ষ্য ছিল ভারতে এবং আন্তর্জাতিকভাবে মুসলিম অধিকার রক্ষণাবেক্ষন।
খান আবদুল গফফার খান, যিনি স্নেহের সাথে “সীমান্ত গান্ধী” নামে পরিচিত। তিনি অহিংস প্রতিরোধের পক্ষে ওকালতি করতেন। নিপীড়িতদের সংগঠিত করার জন্য তার প্রচেষ্টা, তাদের ধর্মীয় অনুষঙ্গ নির্বিশেষে, স্বাধীনতার জন্য বৃহত্তর সংগ্রামকে তুলে ধরে যা সমস্ত ভারতীয়কে একত্রিত করেছিল।
ব্রিটিশরা তখন খুব বেষি পরিমানে ভারতীয় মানবদের কাড়াগারে বন্ধি করতো, ফলে ব্রিটিশ রাজা সপ্তাহে একবার জেল দর্শন করত। ঠিক সেই রকম এক দিন রাজা জেল ভ্রমন করতে যায়। ক্ষুদিরাম বসু এই অত্যাচারিকে মারার ভিষন চেষ্টা করেন কিন্তু তিনার চেষ্টায় অসাফলতা অর্জন করে।কিন্তু সর্ব শেষে সেই অত্যাচারিকে এই দুনিয়া থেকে বিদায় করে এই শেরে-আলি খান পাঠান। এই অপরাধের জন্য ব্রিটিশরা শেরে-আলি খান পাঠানকে লটকিয়ে পিঠিতে হত্যা (শহীদ ) করে।বীর বিপ্লবী শের আলীর কথা না বললে আজকের লেখা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের জন্য তার চৌদ্দ বছর জেল হয়। শের আলী আন্দামানে জেল খাটছিলেন। এমন সময় কুখ্যাত লর্ড মেয়ো আন্দামান সেলুলার জেল পরিদর্শনে আসে। শের আলী সুযোগ বুঝে বাঘের মতোই রক্ষীদের পরাস্ত করে তার উপরে চাকু হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। লর্ড মেয়ো আন্দামান জেলেই শের আলীর চাকুর আঘাতে মৃত্যুবরণ করে। শর আলীর দ্বিতীয়বার বিচার আরম্ভ হয়। বিচারে ফাঁসির রায় হয়। শের আলী বীরের শহীদি মৃত্যুবরণ করেন ফাঁসির কাষ্ঠে। অথচ কি আশ্চর্য, শের আলীর স্থান ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে হয়নি। ঠিক এমনিভাবে ভুলিয়ে দেয়া ইতিহাস, আর ভুল বোঝানো ইতিহাস নিয়ে আরেকটা বই আসছে গার্ডিয়ান থেকে, ইতিহাসের ধুলোকালি নামে। কাজ চলছে। অনেক কাজ বাকি আছে, লিখতে তো ইচ্ছে হয় অনেক কিছু, কিন্তু কবে শেষ হবে কে জানে। কি আজব বিষয় এই নামটি ও মুখে নিতে অনেকের লজ্জায় যেন গঙ্গাস্নান অবস্থা।
হাকিম আজমাল খানঃ নিজের জীবনের দিকে না তাকিয়ে তিনি এসেছিলেন স্বাধীন কারির দলে। তিনি হলেন সেই যুগের বিখ্যাত ডাক্তার; প্রতেক্য রোগির প্রতি ১০০০ টাকা ছিল তার বেতন। কিন্তু তিনি কোনো রোগির কাছে এক পয়সাও নিতেন না। এবং চলে এলেন স্বাধীনতা অর্জন করার মাঠে।
আজ পুরো বিশ্বজুরে মহাত্মা গান্ধীর গুনগান চলছে। কিন্তু আমরা ওই ব্যাক্তিকে ভুলে ফেলেছি, যেই ব্যাক্তির নিমিষে মহাত্মা গান্ধীর নিজের গান্ধী উপাধি পায়। তিনি হলেন এই হাকিম আজমল খান।
আব্দুল্লাহ খানঃ সেই যুগে এমন এক ব্যাক্তি ছিলেন, তিনার মাথামন্ডু কেটে আনার জন্য ৫০০০০ হাজার টাকা পুরুষ্কার রাখা হয়েছিল। ওই কালে টাকার মূল্য ছিল আগুনের চেয়েও বেশি গরম কিন্তু তা সত্যেও আব্দুল্লাহ খান কে ধরার জন্য এত বেশি পরিমানে পুরুষ্কার রাখা হয়েছিল।
ইতিহাসে সবচেয়ে নির্মম ও জঘন্যভাবে তাদের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো হয়। হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামে দুই লাখের বেশি মুসলমান শহিদ হয়েছিল
মুসলিম বুদ্ধিজীবী, লেখক ও সাংবাদিকরা জাতির সম্মিলিত বিবেককে জাগ্রত করতে অবিচ্ছেদ্য ভূমিকা পালন করেছেন। আল্লামা ইকবাল, একজন স্বপ্নদর্শী কবি এবং দার্শনিক, ১৯৩০ সালে তার বিখ্যাত এলাহাবাদ ভাষণে একটি পৃথক মুসলিম রাষ্ট্রের ধারণার কথা তুলে ধরেন। যদিও তার দৃষ্টিভঙ্গি শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সৃষ্টিতে বিকশিত হয়েছিল, তবে একটি স্বাধীন ভারতে মুসলমানদের অবস্থানকে ঘিরে ভাষণ দেওয়ার প্রভাব। অবমূল্যায়ন করা যাবে না।
মাওলানা জাফর আলী খান এবং মাওলানা হাসরাত মোহানি লিখিত শব্দের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে স্বাধীনতার পক্ষে সমর্থন জোগাড় করেন। তাদের সংবাদপত্র এবং প্রকাশনাগুলি তথ্য প্রচার করেছে, কর্মকে অনুপ্রাণিত করেছে এবং সংলাপকে উৎসাহিত করেছে। সমাজের মধ্যে ব্যবধান দূর করেছে। এবং সংগ্রামের গুরুত্ব সম্পর্কে একটি ভাগ করা বোঝার উৎসাহ দিয়েছে।
প্রতি বছরের ১৫ই আগস্ট ভারতবর্ষের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে সারা ভারতে সেজে উঠে খুশির উদযাপন। আর প্রতি বছরের ন্যায় এই বৎসরেও ভারত মানাবে ৭৬তম স্বাধীনতা দিবস এই স্বাধীনতা আমরা খুব সহজ ভাবে পাইনি। শত সহস্র ভারতীয়দের নিরলস প্রচেষ্টা ও রকমারী আন্দোলন এর পিছনে রয়েছে। পিছনে রয়েছে রক্তরাঙা ইতিহাস, ফাঁসির মঞ্চ তথা দ্বীপান্তরের অকল্পনীয় লোমহর্ষক কাহিনী।
সুতরাং এই অবসরে সেই সব বীরগণকে স্মরণ করা, তাঁদের প্রতি শ্রোদ্ধা জ্ঞাপন করা প্রত্যেক ভারতীয়র দায়িত্ব। তাই আমরা উক্ত দিনটিকে অত্যান্ত গুরুত্ব দিই এবং নানা রকমের অনুষ্ঠান করি। বিভিন্ন মঞ্চে সেই সব বীরপুরুষদের বিরত্বের অমর কাহিনী তুলে ধরা হয়। ফলতঃ আমরা শৈশব থেকেই শুনে আসছি মাননীয় মহন দাস করম চাঁদ গান্ধী, সুভাষ চন্দ্র বসু, ক্ষুদিরাম বসু,মাতঙ্গিনী হাজরা,ঝাঁসির রাণী লক্ষী বাঈ, ভগত সিং,তাতিয়া টোপির মতো অমুসলিম প্রমুখ যোদ্ধাদের নামগুলো।
ভারতের স্বাধীনতায় মুসলিমদের অবদান নিয়ে অনেকের লজ্জা আছে। তিনারা লিখতে লজ্জিত হোন অথবা লেখনীর জন্য প্রাপ্ত সুবিধাবঞ্চিত হবার চিন্তা ও করে থাকেন। রাস্তায় লাইন ধরে মুসলিমদের ফাঁসি দেয়া হয়। অপরাধ একটাই
কেন তারা ভারতের স্বাধীনতা চেয়েছিলো। কেন আজাদ ভারত স্লোগান করেছিলেন।
১৮৫৭ সালে আবার স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হয়। এই সময় হিন্দুস্তানের সমস্ত জনগণ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ইংরেজ খেদাও আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মুসলমানরা এ সময় তুলনাহীন ও অবর্ণনীয় ত্যাগ স্বীকার করেন। হাজারো মুসলমান-উলামায়েকেরামকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। গ্রেফতার করে কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে নিক্ষেপ করা হয়। ইতিহাসে সবচেয়ে নির্মম ও জঘন্যভাবে তাদের ওপর নির্যাতনের স্টিম রোলার চালানো হয়। হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা সংগ্রামে দুই লাখের বেশি মুসলমান শহিদ হয়েছিল!

মুসলমানরা যেভাবে দেশপ্রেম, আগ্রহ ও উদ্দীপনা, দৃঢ়তা ও সাহস, বীরত্ব ও বাহাদুরির সঙ্গে জীবন-প্রাণ উৎসর্গ করে স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ করেছিলেন, তার উদাহরণ হিন্দুস্তানের পুরো ইতিহাসে দ্বিতীয়টি নেই। ইতিহাস সাক্ষ্য, হিন্দুস্তানের স্বাধীনতার জন্য মুসলমানরাই প্রথম বিদ্রোহের পতাকা উঁচু করেছিলেন। মুসলমানরাই সবার আগে স্বাধীনতার মশাল জ্বালিয়েছিলেন। এই মশাল স্বাধীনতার আগুন বিকিরণ শুরু করলে অন্যরাও এসে আন্দোলনে শামিল হয়।
বলা হয়ে থাকে, ১৮৫৭ সাল থেকে স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয়েছিল। এই কথাটি সম্পূর্ণ ভুল। ইংরেজ হায়েনাদের নাপাক অভিপ্রায় বুঝতে পারে মুসলমানরা, বিশেষত হিন্দুস্তানের উলামায়ে কেরাম আরো আগে থেকেই ইংরেজ বেনিয়াদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য লড়াই শুরু করেছিলেন। ১৭৫৭ সালে নবাব সিরাজুদ্দৌলা, ১৭৯৯ সালে মহিশুরের সিংহ টিপু সুলতান হিন্দুস্তানের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে করতে শাহাদাত বরণ করেন। মহাবীর টিপু সুলতানকে ইংরেজরা সবচেয়ে বেশি ভয় পেত। তাকেই দখলদারিত্বের পথে সবচেয়ে ভয়ংকর কাঁটা মনে করত। এ জন্য টিপু সুলতানকে শহিদ করার পর ইংরেজ রক্তপিপাসুরা ঘোষণা করেছিল, ‘আজ থেকে হিন্দুস্তান আমাদের’!

পরবর্তীতে ১৮০৩ সালে বিখ্যাত আলেম শাহ আব্দুল আজিজ ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের ফতোয়া দিয়ে উপমহাদেশ থেকে দখলদার ইংরেজ বিতাড়নের মূলভিত্তি তৈরি করেছিলেন। তার ফতোয়ার কারণেই সমগ্র হিন্দুস্তানে স্বাধীনতার মহাজাগরণ শুরু হয়েছিল। রেশমি রুমাল আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, বালাকোট আন্দোলনসহ এ ধরনের আরো যত আন্দোলন-সংগ্রাম পরবর্তীতে সংঘটিত হয়েছে, সবই ছিল শাহ আব্দুল আজিজের ফতোয়ার ফলাফল।
বিভিন্ন স্বাধীনতা আন্দোলনে মুসলমানদের অংশগ্রহণ তাদের প্রতিশ্রুতি প্রদর্শন করে। অসহযোগ আন্দোলনের সময়, মুসলমানরা ঔপনিবেশিক যন্ত্রকে ব্যাহত করার জন্য তাদের সংকল্প প্রদর্শন করে ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠান ও পণ্য বয়কট করার জন্য অন্যান্য সম্প্রদায়ের সাথে হাত মিলিয়েছিল। আইন অমান্য আন্দোলন দেখেছে মুসলিমরা বিক্ষোভ, ধর্মঘট এবং অবাধ্যতামূলক কর্মের নেতৃত্ব দিচ্ছে, শান্তিপূর্ণ উপায়ে বিদেশী শাসনের অবসান ঘটাতে তাদের নিবেদন প্রদর্শন করে।
১৯৪২ সালের ভারত ছাড়ো আন্দোলনে, মুসলমানরা আবার তাদের দেশবাসীর সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়িয়েছিল। সম্প্রদায়ের মধ্যে উদ্বেগ এবং বিভাজন থাকা সত্ত্বেও, অনেক মুসলমান সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিল। ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষকে চ্যালেঞ্জ করে এবং এই ধারণাটিকে শক্তিশালী করেছিল। যে, ভারতের স্বাধীনতা ধর্মীয় পার্থক্য অতিক্রম করে একটি সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
পড়ালেখা সমাপনীর পর মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী লাহোরে ফিরে গিয়ে অধ্যায়ন ও গবেষণায় লিপ্ত হোন। এর মধ্যে তিনি হাদীসের প্রসিদ্ধ ১০-১২টি গ্রন্থ মুখস্থ করেন এবং ইলমে হাদীস ও হানাফি ফিকাহ্ সম্পর্কে দুটি গ্রন্থ রচনা করেন।
১৯০৯ সালে শায়খুল হিন্দ তাকে আবার দেওবন্দে ডেকে পাঠান এবং দেওবন্দের সমাপনী ছাত্রদের দ্বারা ‘জমিয়তুল আনসার’ সংগঠনের দায়িত্ব প্রদান করেন।
শাহ্ ওয়ালিউল্লাহর রাজনৈতিক দর্শনের ভিত্তিতে ১৯১৩ সালে দিল্লীর ফতেহপুর মসজিদে ‘নাযযারাতুল মা’আরিফ’ নামে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। এই সংগঠনের পৃষ্ঠপোষক শায়খুল হিন্দ ছাড়াও হাকিম আজমল খান এবং নওয়াব ভিকারুল মুলক ছিলেন।
এ সময় শায়খুল হিন্দ তাকে দিল্লীর অন্যান্য বিপ্লবী সংগঠক ড. আনসারী এবং তার মাধ্যমে মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ও মাওলানা মুহাম্মাদ আলীর সঙ্গে পরিচিত করিয়ে দেন। (মুহাম্মাদ সারওয়ার, মাওলানা উবায়দুল্লাহ সিন্ধী,লাহোর ১৯৬৪,পৃ.২৯)
প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময় দেওবন্দে শায়খুল হিন্দের বাসায় বিপ্লবীদের একটি মিটিং হয়।
মিটিংয়ে এ সিদ্ধান্ত হয় যে,১৯১৭ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি দিল্লীতে অভ্যুত্থান ঘটানো হবে এবং চুক্তি সাক্ষর করে তুর্কি ও আফগান সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য উবায়দুল্লাহ সিন্ধীকে দায়িত্ব দেয়া হয়।
এই সিদ্ধান্ত ইতিহাসে রেশমি রুমাল নামে খ্যাত হয়ে আছে। উবায়দুল্লাহ সিন্ধীকে আফগানিস্তানে গিয়ে একটি সেনাবাহিনী গড়ে তোলার দায়িত্ব দেওয়া হয়।
ইংরেজ গোয়েন্দারা এসময় মাওলানা মুহাম্মাদ আলী, মাওলানা শওকত আলী এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতার এড়িয়ে শায়খুল হিন্দ হেযাযের পথে এবং উবায়দুল্লাহ সিন্ধী কাবুলের পথে দুটি বৃহৎ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ১৯১৫ সালে হিজরত করেন। (আবুল ফাতাহ মুহা: ইয়াহইয়া, দেওবন্দ আন্দোলন,পৃ.২০১)
মুহাম্মাদ আহমদ আলী, ফাতেহ মুহাম্মাদ এবং আব্দুল্লাহ এই তিনজনকে সঙ্গে নিয়ে উবায়দুল্লাহ সিন্ধী বেলুচিস্তান ও ইয়াগিস্তান হয়ে কাবুল পৌছেন। সেখানে গিয়ে তিনি শায়খুল হিন্দের ছাত্রদের ও স্বাধীনতাকামী ভারতীয়দের একত্র করেন।
আফগান বাদশাহ আমীর হাবিবুল্লাহ তাকে হিন্দুদের সঙ্গে নিয়ে এক প্লাটফর্মে কাজ করার নির্দেশ দেন। ১৯২২ সালে তিনি কংগ্রেসের কাবুল শাখা গঠন করেন এবং এটিই ছিল বহির্বিশ্বে কংগ্রেসের প্রথম শাখা।
সিন্ধী ছিলেন এই শাখার প্রথম প্রেসিডেন্ট। তুর্কি-জার্মান মিশনের প্রতিনিধি রাজা মহেন্দ্র প্রতাপ ও বরকতুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে তিনি ‘অস্থায়ী ভারত সরকার’ গঠন করেন।
রাজা সাহেব রাষ্ট্রপতি, রবকতুল্লাহ প্রধানমন্ত্রী এবং উবায়দুল্লাহ সিন্ধী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নির্বাচিত হোন। মাওলানা সিন্ধী ‘জুনদুল্লাহ’ নামে একটি সেনাবাহিনীও গঠন করেন। ইরান,জার্মান,রাশিয়া, তুরস্ক প্রভৃতি দেশে এই সরকারের প্রতিনিধি প্রেরণ করেন।
ঐতিহাসিক রেশমি রুমাল ইংরেজ গোয়েন্দাদের হাতে পরলে ব্রিটিশ সরকারের নির্দেশে আমীর হাবিবুল্লাহ তাকে বন্ধি করেন আর শায়খুল হিন্দকে মক্কার শরীফ সরকার গ্রেফতার করে। আমীর নাসরুল্লাহ খানের আমলে মুক্তি মিললেও আন্তর্জাতিক চাপে তাকে কাবুল ত্যাগ করতে হয়।
এরপর তিনি মস্কো হয়ে তুরস্কে গমন করেন। সাত মাস মস্কোতে অবস্থান করে কমিউনিজমের ওপর গবেষণা করেন। এরপর তিনি ইস্তাম্বুল হয়ে মক্কায় পৌঁছান।
হাকিম আজমল খাঁ ছিলেন সর্ব ভারতের কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট। সেসময়ের বিখ্যাত চিকিৎসক। দিল্লির বাইরে গেলে ফি নিতেন সেসময়ে এক হাজার টাকা। গরিবদের কাছে থেকে কোনো পয়সা নিতেন না। কংগ্রেস নেতা হিসেবে জেল খেটেছেন বহু বছর, নেহরুর চাইতে তো কম নয়। সর্বভারতীয় কংগ্রেস সভাপতি। তার নামটাও ভারতের ইতিহাসে নেই। এমনকি মওলানা আজাদ যে জেল খেটেছিলেন সেই ইতিহাস ও নেই। খাজা আব্দুল মজিদ, ইংল্যান্ড থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন। নেহরুর সমসাময়িক কংগ্রেস নেতা। তিনি ও তার স্ত্রী দু’জনই জেল খেটেছেন বহু বছর। কোথাও এটার উল্লেখ নেই। নেতাজী সুভাষ বসুর ডানহাত ও বামহাতের মতো ছিলেন, আবিদ হাসান এবং শাহেনেওয়াজ খান। এদের নাম আছে কোথাও? তার রাজনৈতিক সংগ্রামে আর আজাদ হিন্দ ফৌজে ছিলেন, আজিজ আহমেদ, লেফটেন্যান্ট কর্নেল জেড কিয়ানি, ডি এম খান, আব্দুল করিম গনি, কর্নেল জিলানী। ইতিহাসে কারও নাম নেই।
মুসলিম স্বাধীনতা সংগ্রামী বীরদের নাম আজও অজানা
অমৃতসরের জালিয়ানয়ালাবাগের যে ম্যাসাকারের কথা আমরা জানি, সেটা কার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে হয়েছিলো? সেটা হয়েছিলো কংগ্রেস নেতা সাইফুদ্দিন কিচলুর গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে। তিনি ছিলেন অতি জনপ্রিয় নেতা। জনতা তার গ্রেপ্তারের সংবাদে ফুসে উঠেছিলো। জার্মানি থেকে ব্যারিস্টারি পাস করে আসা সাইফুদ্দিন কিচলুকে যাবজ্জীবন দ্বীপান্তরে পাঠানো হয়। জালিয়ানয়ালাবাগের নাম জানি, সেখানে ম্যাসাকার হয়েছিলো সেটা জানি, জেনারেল ডায়েরের কথা জানি যিনি গুলি চালানোর আদেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু যিনি এই প্রতিবাদের প্রাণপুরুষ ছিলেন সেই ব্যারিস্টার সাইফুদ্দিন কিচলু একদম হাওয়া। অদ্ভুত নয়? আমরা গোপন সন্ত্রাসবাদী দল অনুশীলন যুগান্তরের কথা জানি, যেখানে মুসলমানদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিলো, কিন্তু ইনকেলাবি পার্টির কথা জানি না। তাদের নেতা ছিলেন পালোয়ান শিশু খান। পালোয়ান শিশু খান ইংরেজ বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে শাহাদাতবরণ করেন। শিশু খান ইতিহাসে কোথাও নেই। ক্ষুদিরাম কিংস্ফোর্ডকে হত্যা করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছিলেন। কিংস্ফোর্ডের বদলে ভুলে দু’জন ইংরেজ নারী নিহত হয়। ক্ষুদিরাম আমাদের কাছে বীর। কিন্তু মহম্মদ আব্দুল্লাহ কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি নরম্যান যিনি অনেক স্বাধীনতা সংগ্রামীকে নিষ্ঠুরভাবে প্রহসনমূলক বিচারে ফাঁসির আদেশ দিয়েছিলেন তাকে একাই কোর্টের সিঁড়িতে অসমসাহসে প্রকাশ্য দিবালোকে হত্যা করেন ১৭৭১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর। মহম্মদ আব্দুল্লাহ ইতিহাসে স্থান পাননি।
এখান থেকে একটা প্রশ্ন জাগে যে তাহলে স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিমদের কোন অবদান ছিলনা? তারা এবিষয়ে কিছুই করেনি? বরং তারা কেবল লোকদর্শক হয়ে থেকেছে? তারা এদেশের কেবল খেয়েছে, দেশকে ভালোবাসেনি, দেশকে কিছু দেয়নি? তারা স্বার্থপর, অকৃতজ্ঞ? আর যদিও নাম শুনা যায় শুধুমাত্র বিশেষ কিছু ব্যাক্তিদের যেমন মাওলানা আবুল কালাম আজাদ,আব্দুল গফুর খান , শওকত আলী ও মৌলানা আলী জাওহার প্রমুখ।
এই প্রশ্নের বা এই অভিযোগ ও অপবাদের উত্তর দেওয়ার জন্য পরবর্তী বাক্যগুলো তুলে ধরা হলো। আশা করি আপনারা মনোযোগ সহকারে পড়বেন।
স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা ঠিক এভাবে হয়েছিল যে যখন প্রায় সমগ্র ভারত ব্রিটিশদের আয়ত্বাধীন হয়ে যায় তখন ব্রিটিশ প্রশাসন বিশেষ কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করে। যথা (১) ভারতে যত মাদ্রাসা ও ধর্মীয় উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে তা বন্ধ করে দেয়া হয় আর সে সবের বদলে স্কুল চালু করা হয়।
এই সকল স্কুলে এক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে হিন্দু, মুসলিম ইত্যাদি সমস্ত সম্প্রদায়ের ছেলে মেয়েদের একই ধরনের শিক্ষা নিতে বাধ্য করা হয়। অত্র স্কুলগুলোতে প্রথম দিকে উদারতা দেখিয়ে বিভিন্ন বিষয়ে পঠনপাঠন চালু করলেও পরবর্তীতে সকল স্কুলের মূল লক্ষ্য, খ্রীষ্টান ধর্ম প্রচার প্রসার হয়ে দাঁড়ায়। ফলতঃ ভারতীয়দের মধ্যে এমন আশঙ্কা দানা বাঁধে যে পরবর্তীতে সমস্ত ভারতীয়রা যেন খ্রীষ্টান না হয়ে যায়! একারণে সমস্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে গুঞ্জন শুরু হয় এবং অসন্তোষ দেখা দেয়।
(২) গুলির খোলের যে অংশটি দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে গুলি বের করতে হতো সেই অংশটিতে গাই ও শুকরের চর্বি লাগিয়ে দেওয়া শুরু হলো। গাই এর চর্বি লাগানো কার্তুজ গুলো হিন্দুদের আর শুকরের গুলো মুসলিমদের দেওয়া শুরু হলো। স্বভাবতই দুই সম্প্রদায়ের মানুষ বেজায় ক্ষিপ্ত হয়ে গেল।
(৩) ভারতবর্ষে উৎপন্ন সমস্ত আনাজ,শস্য ও খনিজ পদার্থ কেউ ব্যক্তিগত ভাবে স্বাধীন হয়ে অন্য কাউকে বিক্রি করতে পারবেনা। বরং ঐ সমস্তই বাধ্যতামূলক ব্রিটিশ সরকারকে বিক্রি করে দিতে হবে। অতঃপর প্রয়োজনে তাদের কাছ থেকেই ক্রয় করতে হবে।
সম্ভবতঃ এই আইনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বাজারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ ব্রিটিশদের হাতে চলে যাওয়া। যার ফলে ভারতবাসীরা পূর্ণ ভাবে ব্রিটিশদের প্রতি আস্থায়ীত হয়ে যেতো। জনগণ অসহায় হয়ে পড়ত আর তারা স্বেচ্ছামতো চড়া দামে বিক্রি করতো। হয়তো অনাহারে অনেকেই মারাও যেতো। চারিদিকে হাহাকার,অনাহার বিরাজ করতো। এমন অভাব অনটন ও দারিদ্রতার পরিবেশে ব্রিটিশরা যা ইচ্ছা তাই করতে পারত। তাই আমাদের দূরদর্শী বিদ্যানগণ এর ভয়াবহতা অনুভব করে আমাদের সমাজকে জাগাতে শুরু করেন এবং প্রচণ্ড বিরোধীতায় মুখর হন।
(৪) কোন মুসলমান খাতনা (মুসলমানী/সুন্নাত) করতে পারবেনা।
(৫) মহিলাদেরকে পর্দা ছাড়াই বের হতে হবে। হেজাব পড়ার কোন প্রকার অনুমতি থাকবেনা।
এই ধরনেরই আরো বেশ কিছু বিধিনিষেধ চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল যা আমাদের চিন্তাশীল , দূরদর্শী বুদ্ধিজীবী এবং বীর পূর্বপুরুষ গণ কোন মতেই মেনে নিতে পারেননি। তাই কোন কিছুর তোয়াক্কা না করে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ও সংগ্রাম শুরু করে দেন। এভাবেই স্বাধীনতা সংগ্রামের শুভ সূচনা হয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে আমরা ইতিহাস ঘেঁটে জানতে পারি যে এই বিদ্রোহের যিনি মূল কাণ্ডারী এবং মুখ্য উদ্যোক্তা তিনি হলেন ভারতীয় শীর্ষ আলেম অমর শহীদ হজরত আল্লামা মাওলানা ফজলে হক খয়রাবাদী।( রহমাতুল্লাহি আলায়।) ইনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি তদানীন্তন শীর্ষ আলেমদের সমর্থন আদায় করে জেহাদের ফাতওয়া দিয়েছিলেন।
এই ফাতওয়া প্রকাশ হওয়ার পর সমগ্র ভারত জুড়ে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠে। এবং যদিওবা সমস্ত ভারত বাসী স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশ নেয় কিন্তু বিশেষ ভাবে মুসলিম সমাজ মন প্রাণ হৃদয় দিয়ে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। ইংরেজরা হিমশিম খেয়ে যায়।
ঘটনা হলো, ইসলামের ওপর বহু মুখি আক্রমণ, মুসলিমদের প্রতি নির্মম অত্যাচার এমনকি তাদেরকে ধর্মান্তরিত করার ষড়যন্ত্র ইত্যাদি সব আল্লামার হৃদয়কে বিগলিত করে দেয়। তিনি বিভিন্ন আলেম ওলামার সাথে পরামর্শ করেন। এমনকি সম্রাট দ্বিতীয় শাহ্ জাফর এবং জেনারেল বখত খান সাহেবের সাথেও আলোচনা সেরে নেন। সকলের সমর্থন পেয়ে জেহাদের ফাতওয়া দেয়ার কথা মনস্থ করেন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী শুক্রবার দিল্লির শাহী জামে (জামা) মসজিদে জুম্মা নামাজ পর আল্লামা ফজলে হক খয়রাবাদী মসজিদ ভরা মুসল্লিদের সামনে আবেগ ভরা কড়া ভাষণ দেন। ভাষণ মধ্যে তিনি জেহাদের ফজিলত ও গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং জেহাদ করতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেন। ভাষণ শুনে শ্রোতাগণ আবেগ আপ্লুত হন। চতুর্দিক থেকে জেহাদ জেহাদ ধ্বনি ওঠে।
ভাষণ শেষে সেদিন জামে মসজিদে যত বড় বড় আলেম ছিলেন সকলের কাছে তিনি এই মর্মে ফাতওয়া জানতে চান যে,” ব্রিটিশরা অন্যায় ভাবে আমাদের দেশ দখল করে রয়েছে। তারা ইসলামী রীতিনীতি মিটিয়ে দিচ্ছে। ইসলামী শিক্ষা বন্ধ করে দিয়েছে। মহিলাদের পর্দার প্রতি নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। খাতনা বা মুসলমানী করার ওপরও নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এমতাবস্থায় ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বা জেহাদ করা মুসলমানদের ওপর ফরজ, না ফরজ নয়?”
এই প্রশ্ন হওয়ার পর সেদিন জামে মসজিদে যত জন সুন্নী ওলামা, মাশায়েখ ছিলেন যাঁদের সংখ্যা ৩৩ বলা হয় সকলেই এক সুরে সুর মিলিয়ে যৌথভাবে ফাতওয়া দেন ” বর্তমান পরিস্থিতিতে পবিত্র শরীয়তের আলোকে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জেহাদ করা মুসলমানদের ওপর ফরজ।” এই ফাতওয়া টি সে যুগের বিখ্যাত উর্দু সংবাদপত্র ‘ আল যাফার ‘ নামক পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়।
১৮৫৭ সালের অভ্যুত্থান একটি জিহাদ বলে ঘোষণায় স্বাক্ষর করেন রহমতুল্লাহ কাইরনবী, সদরুদ্দিন খান আজুরদা, সরফরাজ আলী এবং ফজলে হক খায়রাবাদী সহ দিল্লির ত্রিশজন পণ্ডিত। আলেমদের মধ্যে অবস্থানের কারণে তিনি বহু আলেমকে প্রভাবিত করেছিলেন এবং তাদের মধ্যে বিদ্রোহের অন্যতম যোদ্ধা ছিলেন মাওলানা আহমদুল্লাহ শাহ মাদ্রাসি। মাদারাসি ছিলেন ভারতীয় বিদ্রোহী আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা যিনি সমস্ত অবধ অঞ্চলে বিদ্রোহ শুরু করেছিলেন।
যে ৩৩ জন সুন্নী বীর ওলামা মাশায়েখ গণ উক্ত ফাতওয়াটি দিয়েছিলেন তাঁদের সুনাম গুলো হলো :
১ জনাব মুহাম্মাদ নাযীর হোসেন সাহেব
২ জনাব রহমাতুল্লাহ সাহেব
৩ জনাব মুফতী সদরুদ্দীন আযুর্দা সাহেব
৪ জনাব মুফতী এক্রামুদ্দীন সাহেব
৫ জনাব মুহাম্মাদ মীর খান সাহেব
৬ জনাব আব্দুল কাদির সাহেব
৭ জনাব আহমদ সাঈদ আহমাদী সাহেব
৮ জনাব মুহাম্মাদ জিয়াউদ্দীন সাহেব
৯ জনাব মুহাম্মাদ আব্দুল কারীম সাহেব
১০ জনাব মুহাম্মাদ কারীমুল্লাহ সাহেব
১১ জনাব সিকান্দার আলী সাহেব
১২ জনাব মুহাম্মাদ সরফরাজ সাহেব
১৩ জনাব সৈয়দ মাহবুব আলী জাফারী সাহেব
১৪ জনাব মুহাম্মাদ হামীমুদ্দীন সাহেব
১৫ জনাব সৈয়দ আহমদ আলী সাহেব
১৬ জনাব এলাহী বখশ সাহেব
১৭ জনাব মুহাম্মাদ আনসার আলী সাহেব
১৮ জনাব মৌলভী সাঈদুদ্দীন সাহেব
১৯ জনাব হাফীজুল্লাহ্ সাহেব
২০ জনাব মুহাম্মাদ নুরুল্লাহ সাহেব
২১ জনাব হায়দার আলী সাহেব
২২ জনাব ইউসুফুর রহমান সাহেব
২৩ জনাব মৌলভী ফরীদুদ্দীন সাহেব
২৪ জনাব সৈয়দ আব্দুল হামীদ সাহেব
২৫ জনাব মুহাম্মাদ হাশিম সাহেব
২৬ জনাব মুহাম্মাদ ইমদাদ আলী সাহেব
২৭ জনাব মুহাম্মাদ মুস্তফা খান সাহেব
২৮ জনাব মুহাম্মাদ ইমদাদ আলী সাহেব
২৯ মুফতী মুহাম্মদ রহমত আলী সাহেব
৩০ জনাব সৈয়দ মুহাম্মাদ সাহেব
৩১ জনাব মুহাম্মাদ আলী সাহেব
৩২ জনাব মৌলভী মুহাম্মাদ আলী সাহেব
৩৩ জনাব আব্দুল গণি সাহেব ( এই নামটিতে মতভেদ আছে)
বিঃ দ্রঃ= উল্লেখ থাকে যে এঁরা সকলেই ভারত বিখ্যাত শীর্ষ আলেম ছিলেন কিন্তু লেখনীটা যেন অতি দীর্ঘ না হয়ে যায় তাই খেতাব গুলো বাদ দিয়ে কেবল মূল নাম গুলো উল্লেখ করা হলো।
আর এও মনে রাখা দরকার যে এঁদের মধ্যে অনেকেই সরকারী বিভাগের পদাধিকারী ছিলেন। বড়ো বড়ো পদে পদাসীন ছিলেন
যেমন হজরত মুফতী সদরুদ্দীন আযুর্দা সাহেব।
ঐ ৩৩ জন ওলামা মাশায়েখের ফাতওয়া ছাড়াও আল্লামা ফজলে হক খয়রাবাদী স্বয়ং নিজেও জেহাদ অজিব হওয়ার একটি স্বাতন্ত্র ফাতওয়া উক্ত সংবাদপত্রে প্রকাশ করান।
এই সম্মিলিত ফাতওয়া মুসলিম সমাজের প্রতি বিশেষ প্রভাব ফেলে। সারা ভারত ব্যাপী ইংরেজদের বিরুদ্ধে আক্রোশ ফুটে ওঠে এবং সবাই জেহাদ করতে উদ্যত হয়। ফলতঃ ৯০ হাজার মুজাহিদ ( ইসলামী যোদ্ধা) তদানীন্তন ইসলামী শাসক (বাদশাহ )বাহাদুর শাহ জাফরের পতাকা তলে একত্রিত হয়। বলে রাখা ভালো যে এরা কেউই প্রশিক্ষিত সৈন্য, সিপাহী ছিলনা বরং সবাই জনসাধারণ ও গ্রামীণ, প্রান্তিক এলাকার মানুষ ছিল।
এদের সাথে সৈন্য, সিপাহীদের গণণা করলে সংখ্যাটা এক লাখ ছাপিয়ে যায়।
ই বিপুল জনসংখ্যা জমা হওয়ার মূলে কে ছিলেন?
এর মূলে ছিলেন হজরত আল্লামা ফজলে হক খয়রাবাদী রহমাতুল্লাহি আলায় যার উজ্জ্বল প্রমাণ আপনারা পূর্বের বয়ান থেকে পেয়েছেন। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আল্লামা ফজলে হক খয়রাবাদী-ই হচ্ছেন স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক।
আজ আমরা যেই মুসলিম সংগ্রামীদের নাম শুনতে পাই সেটা শুধু মাত্র গোষ্ঠীগত কারণের ফল। ১৮৫৭ সংগ্রামের পূর্বে ও পরবর্তীতে যে জব মুলিম বিদ্রোহের নাম শুনা যায় সব গুলো ওহাবী বিদ্রোহ , ফরাজী আন্দোলন ও খেলাফত আন্দোলনে আবদ্ধ আর এর কারণ বেশ কিছু ওহাবী মতলম্বীরা ও কোনঠাসা ব্রিটিশ।ফজলে হক ও উদ্ধৃত ইসলামের সৌনিক দের নাম আজও অজানা। এমনকি ঐতিহাসিক গোলাম আহমদ মুর্তুজার লেখা ‘ চেপে রাখা ইতিহাস’এ ও অনেক কিছু তথ্য চেপে রাখা হয়েছে নয়তো তিনি এই সব তথ্যকে পরিপক্ক ভাবে উল্লেখ করতে চাইনি।
ভারতে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মুসলমানদের এত অবদান, যা বলে শেষ করা যাবে না। ভারতের যা কিছু গৌরবের, অহংকারের, খ্যাতির, তাদের অধিকাংশের পেছনে মুসলমানদের সুনির্দিষ্ট, ব্যাপক ও উদ্দীপক ভূমিকা ও অবদান রয়েছে। চাইলেই বিজেপি, উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা তা মুছে ফেলতে পারবে না।
তথ্যসূত্র :
https://bradscholars.brad.ac.uk/handle/10454/6296
https://www.academia.edu/34992892
Malleson, George Bruce (1880). https://archive.org/stream/historyindianmu01mallgoog#page/n590/mode/1up/search/ulla. Vol. 3 (2st ed.). pp. 590–591.
Sircar, Jawhar (8 May 2017). “https://www.dnaindia.com/analysis/column-andaman-s-cellular-jail-holds-lessons-for-the-current-indian-polity-2430535”. DNA India.
https://books.google.com/books?id=kl08TgBBxHIC&pg=PA213
যে মুসলমানরা ভারতে আধুনিকতার সূচনা করেছে, এক উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতি উপহার দিয়েছে, শত শত বছরে ভারতকে মাতৃভূমি মেনে গড়ে তুলেছে, তাদের এভাবে উৎখাত ও নির্মূল করা কখনোই সম্ভব নয়। কী দেয়নি ভারতকে মুসলমানরা? মুসলিম আগমনের পূর্বে ভারতের সার্বিক অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক ও শোচনীয়। ভারত ছিল বহির্বিশ্ব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। জনসাধারণের একটি অংশের মধ্যে প্রাচীন বিদ্যা ও দর্শনের চর্চা থাকলেও বহির্বিশ্বের সঙ্গে পরিচয় বিশেষ করে বাইরের সভ্যতা, জ্ঞান-বিজ্ঞান, দর্শন, শিক্ষা-সংস্কৃতি ইত্যাদির সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা ছিল না। ঐতিহাসিকদের মতে, আলেকজান্ডারই ছিলেন সর্বশেষ স¤্রাট, যিনি বাইরের দেশ থেকে ভারতে অভিযান চালিয়েছিলেন। তারপর থেকে ভারত ছিল আবদ্ধ, মলিন জলাশয়ের শামিল। সেই সময় মুসলমানরা ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সভ্য, আলোকিত ও সংস্কৃতবান জাতি। ভারতে মোগল সা¤্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর ইসলাম ও মুসলিমপূর্ব ভারতের একটি খন্ডচিত্র তার আত্মজীবনী ‘তুযুক-ই বাবরী’তে তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন: ভারতে উন্নত ঘোড়া নেই, ভালো গোশত নেই, আঙ্গুর নেই, তরমুজ নেই, বরফ নেই, শীতল পানি নেই, শৌচাগার নেই, মোমবাতি নেই, বাতি রাখার পাত্র নেই, মশাল নেই। মোমবাতির পরিবর্তে সেবকেরা কাদামাটি, কাঠ বা লোহার তৈরি পিদিম ব্যবহার করতো। সরিষার তেল এর জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হতো। এই পিদিম তিন পা বিশিষ্ট। এক পা-তে বাতিদানের মুখের আকৃতিতে একটি লোহা বা কাঠ স্থাপন করা হতো। রাতের বেলা রাজা-মহারাজাদের যদি আলোর দরকার হতো তখন পরিচারিকাগণ এ স্থূল পিদিম নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো।
স্বাধীনতা সংগ্রামে মুসলিম নারীদের অবদান
ছবি পরিচিতি –
১. বেগম হজরত মহল
২. আজিজুন বাঈ
৩. আবাদি বানো বা বি. আম্মা
৪. আমাতুস সালাম
৫. হাজারা বেগম
৬. অরুণা আসাফ আলি

যেমন ধরুন, বেগম হজরত মহল৷ গল্পটা এক রানির প্রতিরোধের, সেদিক থেকে লক্ষ্মীবাইয়ের গল্পের ছায়া খুঁজে পাবেন অনেকে। যদিও হিন্দুপ্রধান রাষ্ট্রে হজরত মহল ইতিহাসে বন্দিত হলেন না লক্ষ্মীবাঈয়ের মতো। কিন্তু গল্পের আগে আরও গল্প ছিল যে!
১৮২০ সালে আওয়াধের ফৈজাবাদের গরীব পরিবারে যে মেয়ে জন্মেছিল, তার নাম ছিল মুহাম্মদী খানম। সে নাবালিকা অবস্থাতেই হারেমে বিক্রি হয়ে গেছিল। বাপ তার দাস, মা নিজেও গণিকা। খাজসিন (পরিচারিকা) হিসেবে হারেমে বিক্রিত হওয়ার পর, সেই বালিকা শীঘ্রই শেষ ‘তাজদার-ই-আওয়াধ’ ওয়াজিদ আলি শাহের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
পরিচারিকা হলেন ‘পরী’ পদে উন্নীত। ‘পরী’ বলতে বোঝাত সুন্দরী নারীদের একটি দল, যারা নাচে গানে, শিল্পদক্ষতায় নবাবের দিল খুশ রাখবে।
‘পরী’ থেকে মুহাম্মদী হলেন ‘মহেক পরী’। মানে আরেক ধাপ প্রোমোশন, কিন্তু সে তথাকথিত পতিতার প্রোমোশন। হয়ে উঠলেন নবাবের প্রিয় উপপত্নীদের একজন। নবাবই তাঁর নাম রাখেন ইফতারকার-উন-নিসা। এরপর বড়সড় শিকে ছিঁড়ল। উপপত্নী হলেন ওয়াজিদ আলি শাহের দ্বিতীয় স্ত্রী। তাঁরই পুত্র পরে অওয়াধের যুবরাজ ঘোষিত হবেন, নাম যার বিরজিস কদর। পুত্রগর্ভা হয়ে নাম হল তাঁর বেগম হজরত মহল (রাজকীয় যে রানি)। কিন্তু তাঁকেও নবাব তার অন্যান্য উপপত্নীর মতো তালাক দিয়েছিলেন পরে।
ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৫৬ সালে লর্ড ডালহৌসির প্রবর্তিত স্বত্ত্ববিলোপ নীতির মাধ্যমে অওয়াধ দখল করল, কারণ আওয়াধ তুলা আর নীলের চাষে অগ্রণী। নবাব ওয়াজিদ আলি শাহকে নির্বাসিত করা হল। ১৮৫৬ সালে পরিবারের একটি অংশের সাথে কলকাতায় (মেটিয়াব্রুজ) এসে ভিড়লেন তিনি। এক ক্ষয়িষ্ণু রাজার শেষ জীবনের দিনলিপি লেখা হতে লাগল কলকাতারই উপকণ্ঠে। কিন্তু আওয়াধে তখন কী ঘটছিল? বেগম হজরত মহল তখন আওয়াধ তথা তাঁর বারো বছরের ছেলের দায়িত্ব নিয়েছেন একা। বিরজিস কদরকে আনুষ্ঠানিকভাবে মুকুট পরিয়ে দশ মাস শাসন চালাতে পেরেছিলেন হজরত মহল রাজমাতা ও রাজ-অভিভাবক হিসেবে। অংশ নিয়েছিলেন ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহে। এমনকি রানি ভিক্টোরিয়া যখন আনুষ্ঠানিকভাবে বণিকসংস্থা শাসিত অঞ্চলকে রাজাধিকারের আওতায় আনলেন, তখনও হজরত মহল এক পাল্টা ঘোষণা করেছিলেন। ব্রিটেনে রানির শর্ত মেনে চলতে অস্বীকার করেছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে ইংরেজদের রাজস্বদানে অনাগ্রহী জমিদার ও কৃষকরা সামরিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। সব জাতি ও ধর্মের মানুষ এই তওয়ায়েফ রানির উপর আস্থা ন্যস্ত করেছিল। নানাসাহেব স্বয়ং ছিলেন তাঁর গুণমুগ্ধ। হাতির পিঠে সওয়ার বেগমের যুদ্ধের গল্প আজও ফেরে মানুষের মুখে মুখে। তাঁর বিশ্বস্ত অনুগামীদের দলে আরও ছিলেন সরফাদ-দৌলা, মহারাজ বাল কৃষ্ণ, রাজা জয় লাল, মাম্মু খান, বাইশওয়ারার রানা বেণী মাধো বকশ, মহোনার রাজা দ্রিগ বিজয় সিং, ফৈজাবাদের মৌলভী আহমদ উল্লাহ শাহ, রাজা মান সিং এবং রাজা জাইলাল সিং।
ব্রিটিশরা উন্নত যুদ্ধাস্ত্র দিয়ে লখনৌ-এর যোদ্ধাদের পরাস্ত করে। বেগম হজরত মহল ইংরেজ রাজপরিবারের দেওয়া পেনশন প্রত্যাখ্যান করে লখনৌ থেকে পালিয়ে আবারও ফৈজাবাদ থেকে মুহুর্মুহু গেরিলা হামলার চেষ্টা করেন। সাহজাহানপুরে হামলা তার মধ্যে একটি। স্যার হেনরি লরেন্স (অওয়াধের প্রধান কমিশনার) চিনওয়াট/ চিনহাটের লড়াইয়ে তাঁর কাছে পরাজিত হন। ১৮৫৭ সালে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী তাঁরই ছিল। ১৮৫৭ সালেরই ৫ জুন মুঘল শাসনের অধীনে তার এগারো বছরের পুত্র বিরজিস কাদেরকে মুকুট পরান। শুরু হয় দশমাসের রানি-শাসন।
উইলিয়াম হাওয়ার্ড রাসেল ”মাই ইন্ডিয়ান মিউটিনি ডায়েরি”-তে লিখেছেন:
‘এই বেগম মহান শক্তি এবং ক্ষমতা প্রদর্শন করেন। তিনি তাঁর ছেলের স্বার্থ গ্রহণের জন্য সমস্ত আওয়াধকে উত্তেজিত করে তোলেন। প্রধানরা তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকার শপথ নিয়েছে। বেগম আমাদের বিরুদ্ধে অবিরাম যুদ্ধ ঘোষণা করে চলেছেন।’
ব্রিটিশরা যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দিয়েছিল, এমনকি ব্রিটিশ শাসনের অধীনে তার স্বামীর কর্তৃত্ব ফিরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাবও এসেছিল। কিন্তু বেগম রাজি ছিলেন না। যখন বিদ্রোহের প্রধান-কেন্দ্র দিল্লি দখল করা হল, তখন আওয়াধের বেগমের পরাজয়ও ঘনিয়ে আসে। বেগম ছোট সাহেব পেশোয়া এবং অন্যান্যদের সঙ্গে নেপালে চলে যান। ব্রিটিশ শাসকরা তাঁকে লখনৌতে বিলাসবহুল জীবন দিতে রাজি ছিল। তিনি স্পষ্ট বলেন, স্বাধীন আওয়াধ রাজ্য ছাড়া আর কিছুই তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ১৮৭৯ সালের ৭ এপ্রিল নেপালের কাঠমান্ডুতে তিনি মারা যান। কাঠমান্ডুর জামে মসজিদের কাছে আজও তাঁর সমাধিতে লেখা –
‘লিখা হোগা হজরত মহল কি লাহাদ পার
নসিবো’ন কি জালি থি, ফালক কি সাতায়ি’
( হজরত মহলের কবরে লেখা থাকবে
নক্ষত্রের দ্বারা অভিসম্পাতিত ছিলেন,আকাশের দ্বারা নিপীড়িত)
ওয়াজিদ আলি শাহ যখন ১৮৫৬ সালে কলকাতার উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখনও বেগমের বীরত্বের পূর্বাভাস দিয়েছিলেন শায়রি-তে-
‘ঘরোঁ পর তবাহি পড়ি শহের মে, খুদে
মেরে বাজার, হজরত মহল
তু হি বাইস এ আইশো-আরাম হেয় গরীবোঁ কি
গমখওয়ার, হজরত মহল’
অর্থাৎ যুদ্ধপীড়িত শহরে গরীবের শেষ আশা হজরত মহল।
প্রসঙ্গত, রানি হজরত মহল নিজেও ছিলেন কবি। স্বাধীন ভারতে হজরত মহলের নামে প্রকাশ হয়েছে ডাকটিকিট একটি। লখনৌ-এর ভিক্টোরিয়া পার্কের নাম বদলে হয়েছে বেগম হজরত পার্ক। ফিল্মস ডিভিশন ইন্ডিয়ার তত্ত্বাবধানে মহিউদ্দিন মির্জা তাঁকে নিয়ে অতি ক্ষুদ্র ডকুমেন্টারিও বানিয়েছেন।
এই বিস্মৃতপ্রায় ‘গণিকা-রানি’ যে নবাবের চেয়ে অনেক ভাল শাসক এবং নেতা ছিলেন, তা বস্তুনিষ্ঠভাবেই প্রমাণিত। কিন্তু আরও যে ইতিহাস অজানা রয়ে গেছে, তা হল, তিনি যুদ্ধের ময়দানে অন্য গণিকাদেরও আহ্বান জানিয়েছিলেন, একত্রিত করেছিলেন। শোনা যায়, তেমন নারীর সংখ্যা নাকি ছিল প্রায় দুইশো পঁচিশ। তাঁরাও সমানভাবে অংশ নিয়েছিলেন ভারতের প্রথম সেই স্বাধীনতার লড়াইয়ে। আবার অনেক আফ্রিকান নারী আওয়াধ নবাবদের হারেম রক্ষার জন্য নিযুক্ত ছিলেন। তাঁরাও ১৮৫৭ সালে লখনউয়ের যুদ্ধে অংশ নিয়ে মারা গিয়েছিলেন। তাঁদের উদ্দেশেও লেখা হয়েছিল শায়রি দু ছত্র-
‘কোই আনকো হাবসিন কেহতা, কোই কেহতা নীচ আছুত।
আবলা কই আনহিন বাটলে, কই কহে আনহে মজবুত।’
(কেউ কেউ তাদের আফ্রিকান বলে, কেউ কেউ অস্পৃশ্য।
কেউ তাদের দুর্বল বলে, অন্যরা বলে, তারা শক্তিশালী।)
মূলধারার ইতিহাস হয়ত তাঁদের কাউকে ভুলেছে মুসলিম পরিচয়ের জন্য, বা নারী পরিচয়ের জন্য, কাউকে আবার গণিকা পরিচয়ের জন্য।

এরপর, আসুন পাঠক, শুনি কানপুরের গণিকা আজিজুন বাঈ-এর কথা। সেই কানপুর, যা নানাসাহেব বা তাঁতিয়া টোপির লড়াই মনে রেখেছে, কিন্তু ভুলেছে আজিজুনকে। কবি মাখমুর জালুন্ধর তাঁরই উদ্দেশে লিখেছেন –
‘তেরে ইয়ালগর মে তামির থি তখরিব না থি
তেরে ইসার মে তরগিব থি তাদিব না থি’
(আপনার যুদ্ধের কান্না ছিল, ধ্বংস নয়/
আপনার আত্মত্যাগ এক অনুপ্রেরণা ছিল, কোনো উপদেশ নয়)
ভেবে দেখুন, রানি-যোদ্ধাদের মতো, বিদ্রোহে তাঁর কোনো ব্যক্তিগত লাভ ছিল না। তিনি কেবল আদর্শগতভাবেই ইংরেজদের মেনে নিতে পারেননি। কানপুরের কথিত, তিনি পুরুষের পোশাক পরে, পুরুষ সৈন্যদের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে, পিস্তলে-গোলাবারুদে সজ্জিত হয়ে যুদ্ধে যেতেন। ৪ঠা জুন ১৯৫৭ খৃষ্টাব্দ। নানা সাহেব সশস্ত্র যুদ্ধে যোগদানের আহ্বান জানালেন। সাড়া দিলেন আজিজুন। যেদিন কানপুরে প্রাথমিক বিজয় উদযাপনের পতাকা উত্তোলন হয়েছিল, সেদিন তিনি মিছিলে হেঁটেছিলেন।
লতা সিং তাঁর প্রবন্ধ ”মেকিং দ্য মার্জিন ‘ভিজিবল’ “-এ লিখেছেন, কানপুরের দ্বিতীয় অশ্বারোহী সিপাহীদের মধ্যে আজিজুন ছিলেন এক প্রিয় মুখ। সৈনিক শামসুদ্দিনের ছিলেন তাঁর প্রেমিক। তাঁর কোঠা ছিল সিপাহীদের মিলনস্থল। তিনি মহিলাদের, বিশেষত বারাঙ্গনাদের একটি দলও গঠন করেছিলেন, যারা সৈন্যদের শুশ্রূষা, অস্ত্রবিতরণের পাশাপাশি প্রয়োজনে যুদ্ধও করত। শোনা যায়, তিনি উমরাও জানের সমসাময়িক ছিলেন। ব্রিটিশদের গোপন তথ্য স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সরবরাহ করতে গিয়ে ইংরেজদের হাতে গ্রেফতার হন তিনি। জেনারেল হ্যাভলকের জিজ্ঞাসা করেন, ক্ষমা প্রার্থনার মাধ্যমে মুক্তিলাভ না শাহদত, কী চান তিনি? দ্বিতীয়টি বেছে নেন আজিজুন।
রুডিয়ার্ড কিপলিংয়ের ”অন দ্য সিটি ওয়াল”-এও তো পাই ১৮৫৭ সাল ও তার নিকটবর্তী সময়ে গণিকাদের ব্রিটিশ বিরোধী কার্যকলাপের উল্লেখ। প্রকৃতপক্ষে, আরও অনেক গণিকার কোঠাই বিদ্রোহীদের আশ্রয়স্থল ছিল। ১৮৫৭ সালের পরে তাই ব্রিটিশ সাম্রাজ্য পূর্ণশক্তি নিয়ে এই কোঠাগুলিকে ধ্বংস করে। প্রাচীন সংস্কৃতি এবং চারুকলায় প্রজ্ঞা ছিল যাঁদের, সেই নগরনটীরা সাধারণ দেহোপজীবিনীতে পরিণত হন। তাঁদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত হয়।
মুজাফফরনগর এলাকাতেও সক্রিয় অংশগ্রহণ দেখা গিয়েছিল হিন্দু-মুসলিম নারীদের। আশা দেবী, বখতাভারি, হাবিবা, ভগবতী দেবী ত্যাগী, ইন্দ্র কৌর, জামিলা খান, মন কৌর, রহিমী, রাজ কৌর, শোভা দেবী, উমদা- ধর্ম ও জাতি নির্বিশেষে তাঁরা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। পঁয়তাল্লিশ বছরের আসগরি বেগমকে বাদ দিলে, এই সমস্ত মহিলারই বয়স ছিল বিশের কোঠায়। তাঁদের ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল। জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল কাউকে কাউকে। এই যে মধ্যবয়সিনী আসগরি বেগমের কথা বললাম, তিনিই বা কে? ১৮১১ সালে জন্মগ্রহণকারী আসগরি বেগম পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহে অংশ নিয়েছিলেন। ১৮৫৮ সালে আসগরিকে ব্রিটিশরা জীবন্ত পুড়িয়ে দেয়।
আবার, হাবিবা ছিলেন মুজফফরনগরের এক মুসলিম গুজজর পরিবারের মেয়ে। সার বেঁধে বারো জন মহিলা যোদ্ধাকে মুজফফরনগরে ফাঁসি দেওয়া হয়েছিল ১৮৫৮ সালে, হাবিবা তাঁদের অন্যতম। মৃত্যুকালে নাকি বয়স ছিল তাঁর পঁচিশ।
এই মেয়েরা পর্দানসিন অবলার স্টিরিওটাইপ ভেঙে দিয়েছিলেন। আর এই প্রেক্ষাপটেই উত্তরপ্রদেশের মোরাদাবাদের আমরোহা গাঁয়ে বেড়ে উঠেছিলেন আবাদি বানো নামের বালিকা (১৮৫২-১৯২৪), যিনি পরে রামপুরের আবদুল আলি খানের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর দুই ছেলে মৌলানা মোহাম্মদ আলি আর মৌলান শওকাত আলি, যাঁরা ‘আলি ব্রাদার্স’ নামে বিখ্যাত হয়েছিলেন। স্বাধীনতা আন্দোলনে এই নারী কিন্তু শুধু ‘আলি ভায়েদের মা’ হয়েই থাকেননি। তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ শুরু হয় হোমরুল আন্দোলনের মাধ্যমে, যে আন্দোলনে তিনি নৈতিক সমর্থন দিয়েছিলেন ও আর্থিক ভাবে সাহায্য করেছিলেন। যখন ব্রিটিশ সরকার ইন্ডিয়ান ডিফেন্স রেগুলেশন বলে চন্দনওয়াড় গ্রামে আলি ব্রাদার্সকে আটক করে, মাকে বোঝায় ছেলেদের আত্মসমর্পণের জন্য রাজি করাতে, তখন তিনি নির্দ্বিধায় বলেন, ‘যদি আমার ছেলেরা সরকারের প্রস্তাবে রাজি হয়, তাহলে আমি তাদের শ্বাসরোধ করে হত্যা করব। আমি আশা করি ঈশ্বর এই বৃদ্ধ মহিলার দুহাতে তা করার পর্যাপ্ত শক্তি দেবেন।’ ১৯১৭ সালে আবাদি বানোর গান্ধির সঙ্গে দেখা হল। গান্ধি ও গান্ধি-অনুগামীদের ‘আম্মিজান’ হয়ে উঠলেন তিনি। বি.আম্মা নামেও তিনি পরিচিত ছিলেন। তিনি গান্ধির অসহযোগ আন্দোলন হেতু এবং খিলাফত নেতাদের খিলাফত আন্দোলনের জন্য সার্বিক ভারত সফর বাস্তবায়িত করতে খোলা হাতে অর্থ ঢেলেছিলেন।

১৯১৭ সালে ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস এবং অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের যুগ্ম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হল কলকাতায়। আম্মিজান সেই সভায় বক্তৃতা দিলেন। সে এক যুগান্তকারী মুহূর্ত। বোরখা তাড়াল থেকে তেজস্বী ভাষণ রাখছেন বৃদ্ধা এক পুরুষ-অধ্যুষিত উপত্যকায়। বলছেন হিন্দু-ম্যসলিম ঐক্যের কথা, বলছেন খিলাফত আর অসহযোগ আন্দোলনের কথা, ঘোষণা করছেন, ‘দেশের কুকুর -বিড়ালও ব্রিটিশদের দাসত্বের অধীনে থাকা উচিত নয়।’ ব্রিটিশ সরকারি রেকর্ড তাঁকে ‘বিপজ্জনক ব্যক্তি’ হিসেবে গণ্য করেছিল৷ বেশ কয়েকটি মহিলা সংগঠনেরও নির্দেশনা দিয়েছিলেন তিনি। তীব্র দেশপ্রেমিক এই বৃদ্ধা, অসুস্থতা ও পুলিশি অত্যাচারে ১৯২৪ সালের নভেম্বরে মারা গেলেন। গান্ধিজি বলেছিলেন, ‘তিনি বৃদ্ধা হলেও তাঁর মধ্যে ছিল যুবদের ন্যায় অদম্য প্রাণ শক্তি।’ তহবিল সংগ্রহ করতেন, মহিলাদের ব্রিটিশ পণ্য বর্জন এবং স্বদেশী পণ্য ব্যবহারের গুরুত্ব বোঝাতেন মৌ আম্মা মাওলানা হাসরাত মোহানী, সরলা দেবী চৌধুরানী, বাসন্তী দেবী, সরোজিনী নাইডু, বেগম হাসরাত মোহানিদের সঙ্গে।
রাখহরি চ্যাটার্জির লেখা ”গান্ধি এবং দ্য আলি ব্রাদার্স: বায়োগ্রাফি অব ফ্রেন্ডশিপ” বইতে দেখি, মাওলানা মোহাম্মদ জোহর আম্মিজান সম্পর্কে বলেছেন,
‘যদিও তিনি কার্যত নিরক্ষর ছিলেন, আমার অভিজ্ঞতায় আমি তাঁর চেয়ে জ্ঞানী, ঐশ্বরিক এবং আধ্যাত্মিক কাউকে দেখিনি।’
বি.আম্মার পুত্রবধূও কম যেতেন না। আমজাদি বেগম ছিলেন মুহাম্মদ আলি জওহরের স্ত্রী। শাশুড়ির উৎসাহে আমজাদি বেগমও রাজনীতিতে যোগ দেন। কথিত আছে, তিনি লন্ডনে প্রথম গোলটেবিল সম্মেলনে আলি জওহরের পাশে ছিলেন। শাশুড়িকে অসহযোগ আন্দোলন এবং খিলাফত আন্দোলনে সাহায্য করার পাশাপাশি তিনি জিন্নাহর পরামর্শে মুসলিম লীগের প্রথম কার্যনির্বাহী কমিটিতে পঁচিশ জন সদস্যের মধ্যে একমাত্র মহিলা হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৩৭ সালে লখনৌতে অনুষ্ঠিত সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে বেগম নারীদের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণে উৎসাহ দেন। মহাত্মা গান্ধি তাঁর উদ্দেশে ”আ ব্রেভ উওম্যান” শিরোনামের একটি নিবন্ধ উৎসর্গ করেছিলেন।

বিবি আমাতুস সালাম ছিলেন আরেক নিবেদিতপ্রাণ গান্ধিবাদী। তিনি ১৯০৭ সালে পাঞ্জাবের পাতিয়ালায় রাজপুতানা পরিবারে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। অভিজাত পরিবারে আরামে-আয়াসে না ভেসে আমাতুস সালাম খাদি আন্দোলনে যোগ দেন। তাঁর বড় ভাইরা অনেকেই ছিল তাঁর সহবিপ্লবী। গান্ধির আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সেবাগ্রামে আশ্রমিক হয়ে ওঠেন। তিনি ছিলেন গান্ধি দম্পতির ঘনিষ্ঠ, কন্যাসমা। অসুস্থ শরীরে ১৯৩২ সালে অন্যান্য মহিলাদের সঙ্গে তিনি কারাগারে যান। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি গান্ধির ব্যক্তিগত সহকারী হলেন। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সম্প্রীতি, হরিজন ও নারীর কল্যাণও ছিল তাঁর লক্ষ্য। যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়, তখন তিনি গান্ধির দূত হিসেবে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত, সিন্ধুপ্রদেশ এবং নোওয়াখালি পরিদর্শন করেন। দাঙ্গা বন্ধ করার ডাক দিয়ে তিনি কুড়ি দিন ধরে সত্যাগ্রহ অনশন করেছিলেন। আবার ১৯৬১ যখন খান আবদুল গাফফার খান যখন ভারত সফর করেন, তখন তিনি তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী ছিলেন। যখন ১৯৬২ সালে চীন, ১৯৬৫ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের যুদ্ধ বাধে, তখনও তিনি সৈন্যদের সেবা করতে দুর্গম অঞ্চলে পাড়ি দিতেন। ১৯৮৫ সালের ২৯ অক্টোবর অফুরান তাঁর প্রাণশক্তি শেষ হয় শেষমেশ।
অন্যদিকে হাজারা বেগম ছিলেন খানিক সোশালিস্ট আদর্শে দীক্ষিত। ১৯১০ সালে উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে জন্ম তাঁর। বাবা পুলিস অফিসার, অথচ মেয়েকে শুনিয়ে গিয়েছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা। প্রথম বিবাহের ব্যর্থতার পর, হাজারা উচ্চশিক্ষার জন্য লন্ডনে যান। রাজনীতির বোধ পরিপক্ক হতে শুরু করে। ভারতে ফিরে আসেন ১৯৩৫ সালে, লখনৌয়ের কারামত হুসেন মহিলা কলেজে অধ্যাপক হিসেবে যোগদান করেন। তিনি অল ইন্ডিয়া প্রগ্রেসিভ রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন গঠনে বিখ্যাত কবি সাজ্জাদ জহিরকে সাহায্য করেন তিনি। এই ১৯৩৫ সালেই আরেক দেশপ্রেমী নেতা জয়নুল আবেদিন আহমেদের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। একই বছরে তাঁরা দুজনই ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সদস্যপদ গ্রহণ করেন। যেহেতু পুলিশ তাঁদের ব্রিটিশবিরোধী কার্যকলাপের জন্য চোখে চোখে রাখত, তাই তাঁরা চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে আন্দোলনেই পূর্ণসময়ের জন্য যোগদান করলেন।

জাতীয় কংগ্রেসের কর্মকাণ্ডে অংশ নেওয়ার সময় হাজারা বেগম কমিউনিস্ট পার্টিরও সংস্পর্শে আসেন। ১৯৩৭ সালে অন্ধ্রপ্রদেশের কোঠাপত্তনমে একটি গোপন রাজনৈতিক কর্মশালায় যোগ দেন তিনি। এই দম্পতি ১৯৪০ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ত্যাগ করে অসংগঠিত শ্রমিকদের সংগঠিত করার কাজেই নিয়োগ করেন নিজেদের। মেহনতি মানুষ এবং আপামর নারীর ‘হাজারা আপা’ হয়ে ওঠেন হাজারা বেগম। লেনিনের জন্মশতবার্ষিকীর প্রাক্কালে, ১৯৬০ সালে, সোভিয়েত ইউনিয়ন তাকে ‘সুপ্রিম সোভিয়েত জুবিলি পুরস্কার’-এ সম্মানিত করে। ২০০৩ সালের ২০ জানুয়ারি মারা গেলেন তিনিও।
অরুণা আসাফ আলি বোম্বেতে পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে ইঙ্গিত দিতেই যে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলন শুরু হয়, তা কে না জানে? অরুণা অবশ্য জন্মসূত্রে মুসলমান ছিলেন না। ১৯২৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে কলকাতায় এক শিক্ষিত বনেদি বাড়ির উনিশ বছরের মেয়েকে জীবিত অবস্থাতেই মৃত ঘোষণা করা হয়। অরুণা গাঙ্গুলির অপরাধ ছিল, তাঁর থেকে তেইশ বছরের বড় এক মুসলিম আইনজীবী, আসফ আলিকে ভালোবেসে বিয়ে করা। ব্রিটিশ সরকার ‘লাহোর ষড়যন্ত্র মামলা’র বিচার শুরু করলে, ভগৎ সিং ও বটুকেশ্বর দত্তের হয়ে সওয়াল করেন এই আসফ আলি। বিয়ের পর থেকেই অরুণা ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৩০ সালে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে অংশ নিয়ে গ্রেপ্তার হন তিনি। ১৯৩১ সালে প্রায় সব রাজনৈতিক নেতা মুক্তি পেলেও, ব্রিটিশরা অরুণাকে জামিন দিচ্ছিল জেলবন্দী সব নারী আন্দোলন শুরু করলে তিনি শেষে মুক্ত হন। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই আবার তাঁকে গ্রেপ্তার করে তিহার জেলে পাঠানো হয়। এখানেও তিনি বন্দিদের চিকিৎসার দাবিতে অনশন শুরু করেন। গণ-আন্দোলনের চাপে ব্রিটিশ সরকার আবার অরুণাকে মুক্তি দেয়। বিয়াল্লিশে ভারত ছাড়ো আন্দোলন পরবতী সময়ে অরুণা কখনো জেলে কখনো আত্মগোপনে ছিলেন। উর্দু ‘ইনকিলাব’ পত্রিকায় ১৯৪৪ সালে অরুণা লেখেন
‘স্বাধীনতার সংগ্রাম সহিংস হবে, নাকি অহিংস—এ নিয়ে বিতর্কের সময় এটা না। আমি চাই, ক্রান্তিকালের এই সন্ধিক্ষণে দেশের সব মানুষ স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ুক।’

ব্রিটিশ সরকার অরুণার সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। তাঁকে ধরিয়ে দিলে ছিল পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার। অবশেষে ১৯৪৬ সালের ২৬ জানুয়ারি ব্রিটিশ সরকার তাঁর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা রদ করলে, অরুণা আত্মসমর্পণ করেন। পরে অরুণা আসফ আলি কংগ্রেসের প্রতি আস্থা হারিয়ে সমাজবাদী দলে যোগদান করেন। স্বাধীনতার পর তিনি কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়ার কেন্দ্রীয় কমিটিরও সদস্য নির্বাচিত হন। নেহেরু পুরস্কার থেকে পদ্মবিভূষণ, লেনিন শান্তি পুরস্কার থেকে ভারতরত্ন- নানা সম্মানে ভূষিত তিনি। ডাকটিকিটও প্রকাশিত হয়েছে তাঁর নামে। অবশ্য এই ডাকটিকিট, এই ভারতরত্ন সম্মাননা প্রদানের(১৯৯৭) কিছু আগেই, ১৯৯৬ সালের ২৯ জুলাই মৃত্যু হয় তাঁর।
এছাড়াও তো ছিলেন কত শত! ছিলেন, রিজিয়া খাতুন, বাংলার প্রথম মুসলিম নারী, যিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছিলেন, শাস্তিস্বরূপ কালাপানি হয়েছিল যাঁর। ছিলেন মৌলনা সাফি দাউদির স্ত্রী জুবায়দা দাউদি। ছিলেন সাদাত বানু কিছলু, যিনি নিজে উর্দু ও পার্সি ভাষার সুবিখ্যাত কবি-প্রাবন্ধিকও বটে। স্বামী ডঃ সাইফুদ্দিন কিছলু গ্রেপ্তার হলে যিনি শান্ত কণ্ঠে জানান, তিনি তাঁর জীবনসঙ্গীর জন্য গর্বিত। ডঃ কিছলুর তৈরি ‘স্বরাজ আশ্রমে’র একনিষ্ঠ সেবক ছিলেন তিনিও।
ছিলেন জুলেখা বেগম, স্বাধীনতা আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোত জড়িত প্রবীণ শিক্ষাবিদ এবং স্বাধীন ভারতের প্রথম শিক্ষামন্ত্রী আবুল কালাম আজাদের স্ত্রী।
ছিলেন বেগম হাজরত মোহানি, বেগম খুরশিদ খাজা, মুনিরা বেগম (মওলানা মাজহারুল হকের স্ত্রী), আমিনা কোরেশি, ফাতেমা কোরেশি, আবুল খাত্তাবের স্ত্রী আমিনা তায়াবিজি, আব্বাস তায়াবজির কন্যা রেহানা তায়াবিজি, শামসুদ্দিন তৈয়বির নাতনি হামিদা তায়াবিজি, বেগম সখিনা লুকমান (বদরুদ্দিনের মেয়ে), ফাতেমা তৈয়ব আলি, শফাত তৌহিদ আলি, শহীদ অনাশা বিবি (লুত্ফর মওলানা হাবিবুর রেহমানের স্ত্রী), সাফিয়া সাদ, বেগম কুলসুম শায়ানি, আসমত আরা খাতুন, সুঘ্রা খাতুন, ফাতেমা ইসমাইল, সুলতানা হায়াত আনসারি, জুয়ার আনসারি…তালিকা যে শেষ হয় না! এঁরা শুধু পুত্র-স্বামীদের উদ্বুদ্ধ করেননি, নীরবতার অবগুণ্ঠন ঝেড়ে ফেলে নিজেদেরও জড়িয়েছেন আন্দোলনে।
আজ শাহিনবাগ দেখে, পার্ক সার্কাস থেকে আমরা শ্রদ্ধাবনত হব নিশ্চয়, কিন্তু ভুলে যাব না প্রতিরোধের দীক্ষা জিনে তথা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে বহন করে থাকতে পারেন এই পর্দানশিনরাও।
আপনি যদি ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস দেখেন সেখানে দেখে মনে হবে শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরাই স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছে। আপনি দেখবেন যারা জেল খেটেছেন তাদের মধ্যে নাম আছে গান্ধীর, নেহরুর, মতিলালের, সুভাষ বোসের, কৃষ্ণ মেনন, সরোজিনী নাইড়ু, অরবিন্দ, চিত্তরঞ্জন তাদের নাম। যারা প্রাণ দিয়েছেন তাদের মধ্যে ক্ষুদিরাম, বাঘাযতীন, প্রফুল্ল চাকী, বিনয়, বাদল, দীনেশ, ভগত সিং, প্রীতিলতা, সুর্যসেন। সন্ত্রাসবাদী দলের মধ্যে নাম আছে অনুশীলন আর যুগান্তরের। ইতিহাসে যাদের নাম উল্লেখ আছে অবশ্যই তারা আমাদের সম্মানীয়, কিন্তু এই তালিকায় কোথাও কোনো মুসলমানের নাম নেই কেন? মুসলমানেরা ছিলো না সেই লড়াইয়ে? খুব ছিলো। তবে তাদের নাম নেই কেন? কারণ সেগুলো সযতনে মুছে ফেলা হয়েছে। ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ এই একশ নব্বই বছরে হাজার হাজার মুসলমান স্বাধীনতা সংগ্রামী জীবন দিয়েছেন, জেল খেটেছেন।
- লেখক : এমজেড ফয়সাল
সমপাদক , ইউএসবি নিউজ , যুক্তরাষ্ট্র।
কৃতজ্ঞতাঃ সকল তথ্য লেখকদের। সবার সত্য লেখনীতেই মিলেই হয় একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস।