চিন্তা থেকে যেমন কাজের উৎপত্তি, আইনের প্রয়োগ-তেমনি দৃষ্টিভঙ্গি ভেদে আইন বিভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করে। আইন প্রণেতার মনোভাব, দূরদৃষ্টি, আচার-আচরণ, সংস্কৃতি, স্বভাব চরিত্র এবং আশা-প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটে আইনের ভাষায়। যারা আইন তৈরি করেন তাদের সঙ্গে, যাদের জন্য আইনটি তৈরি করা হয় অর্থাৎ যাদের ওপর এটির প্রয়োগ হবে তাদের মধ্যকার সম্পর্কেরও একটা বিশেষ ভূমিকা থাকে আইনের দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে। এখানে তৃতীয় আরেক শরিকের কথাও এসে যায়, যাদের মাধ্যমে আইনটির প্রয়োগ হবে। তাদের সক্ষমতা-অক্ষমতার ব্যাপারটিও বিশেষভাবে বিবেচ্য থেকে যায় আইনের প্রয়োগ তথা বাস্তবায়নযোগ্যতার ক্ষেত্রে। আইন পরিষদ যে আইন তৈরি করে তার প্রয়োগ হয় যারা আইন তৈরির ক্ষমতা দিয়েছে তাদের ওপর। আর এ আইন প্রয়োগের দায়িত্বও আইন প্রণেতার নয়, নির্বাহী বিভাগের। এখন পরিবেশ-পরিস্থিতি যদি এমন হয় বা আইন পরিষদ যদি মনে করে এ আইন অন্যের জন্য, পরিষদ সদস্যদের ওপর বর্তাবে না, এবং নির্বাহী বিভাগও যদি ভাবে এ আইন অন্যের ওপর প্রয়োগের জন্যই, তাহলে যাদের ওপর আইনের প্রয়োগ তারা হয়ে পড়ে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ, প্রয়োগের প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ক্ষেত্রেও তারা যেন হয়ে পড়ে আইন প্রণেতা ও প্রয়োগকারীর প্রতিপক্ষ। এ পরিবেশেই আইনের দৃষ্টিভঙ্গি হয়ে যায় নিবর্তনমূলক, প্রতিরোধাত্মক। এ প্রেক্ষাপটে আইন অমান্যের ও অগ্রাহ্যের পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
উপরের তাত্ত্বিক ধ্যান-ধারণার আলোকে বাংলাদেশের বিদ্যমান আয়কর আইনটি জন্মগতভাবে ব্রিটিশ, দৃষ্টিভঙ্গির বিচারে ঔপনিবেশিক এবং প্রয়োগিক দিক থেকে নিবর্তনমূলক ও প্রতিরোধাত্মক। এদেশে ভূমি কর বা রাজস্ব আদায়ের প্রথা চালু রয়েছে প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা প্রদান, বিভিন্ন সেবার বিনিময়, কিংবা উৎপাদন বা সম্পদ ব্যবহার বাবদ নানা নামে নানা উপায়ে রাজস্ব বা টোল আদায়ের প্রথা সেই আদি যুগ থেকে চলে এলেও আধুনিক আয়কর বলতে যে বিশেষ কর-রাজস্বের সঙ্গে আমরা পরিচিত, এদেশে তথা ভারতীয় উপমহাদেশে তার প্রবর্তন ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে; সাত সাগর তেরো নদীর পার থেকে আসা বিদেশি বেনিয়ার দ্বারা। তাদের তৎকালীন সমাজে শিল্পবিপ্লবের পর পুঁজির প্রসার ঘটে এবং সেখানে সম্পদের ওপর, সম্পদ সৃষ্টি ও বিনিময় প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত আয় অর্জনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। রাষ্ট্র ওই অতিরিক্ত আয়ের ওপর একটা হিস্যা দাবি করে বসে, যুক্তি এই-তুমি রাষ্ট্রের তৈরি অবকাঠামো ব্যবহার করে আয়-উপার্জন করছো, রাষ্ট্রের সেবা ও সুবিধা ভোগ করে লাভবান হচ্ছো; সুতরাং এসব অবকাঠামো নির্মাণ, এসব সুযোগ-সুবিধার সমাহার বাবদ রাষ্ট্রের বিনিয়োগে তোমার অংশগ্রহণ চাই। ‘নো লাঞ্চ ইজ ফ্রি’ অংশীদারত্বের দর্শন থেকে ইউরোপে আধুনিক আয়কর ধারণার উৎপত্তি। ‘নেবে আর দেবে, দেবে আর নেবে, এভাবে মিলাবে নিকাশ’, পরস্পরের প্রতি আস্থা ও দায়িত্ববোধের বিকাশ-ধ্রুপদ আয়কর ব্যবস্থাপনার প্রভাতসংগীত।
করযোগ্য আয় নির্ধারণ থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে পরিপালনীয় বিধি-বিধানের ভাষায় এক ধরনের কুটিল মনোভাবের প্রকাশ পেয়ে তা জটিল, দ্ব্যর্থ ও কূটার্থবোধক হয়ে ওঠে। এদেশে প্রবর্তিত আয়করসংক্রান্ত সার্কুলারগুলোয় জটিলতা যুগলবন্দি হয়ে ওঠে। ঔপনিবেশিক সরকারের তরফে করদাতাদের কল্যাণ নিশ্চিত করার বিষয়টি মুখ্য বিবেচনায় না এলেও কর আদায়ের ক্ষেত্রে জমিদারের পাইক-পেয়াদাসুলভ যুদ্ধংদেহী মনোভাব প্রকাশ পায়। উদ্দেশ্য থেকে যায়-‘তোমার আয় হোক আর না হোক অর্থাৎ বাঁচো মরো, রাজস্ব আমার চাই।’ এ ধরনের আইনগত দৃষ্টিভঙ্গির বদৌলতে কর আদায়কারী বিভাগের সঙ্গে করদাতাদের সম্পর্ক জবরদস্তিমূলক, পরস্পরকে এড়িয়ে চলার কৌশলাভিমুখী হয়ে পড়ে। অন্তরালে ব্রিটিশ প্রশাসনে বহুল কথিত একটা সাধারণ নির্দেশনা ছিল যেন এরকম-‘চোর তো চুরি করিবেই, কিন্তু গৃহস্থকে সজাগ থাকিতে হইবে।’ করদাতাদের এমন বিরূপ ধারণায় বিবেচনা করা এবং তাদের ধরার ইন্ধন কর আইনের ভাষ্যে যেন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এমন পরস্পর অবিশ্বাসের ও প্রতিদ্বন্দ্বী পরিবেশে কর নির্ধারণ ও পরিশোধের ক্ষেত্রে পরস্পরকে এড়িয়ে চলার এবং সে লক্ষ্যে অনৈতিক আঁতাতের মাধ্যম রাজস্ব ফাঁকির সংস্কৃতির সূত্রপাত ঘটে।
ঔপনিবেশিক শাসনব্যবস্থায় দুর্নীতিগ্রস্ততার এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টিতে সেই সময়কার আয়কর আইনের ভাষার যেন ছিল পরোক্ষ প্রেরণা বা সুযোগ। এমন অনেক আইন আছে, যা বেআইনি আচরণকে উসকে দেয়। এরকমই পরিবেশে করদাতাদের সঙ্গে আঁতাতের মাধ্যমে কর ফাঁকি কার্যক্রমে করদাতা আর আদায়কারীর মধ্যবর্তী সাহায্যকারীও যেন সহায়ক ভূমিকায় চলে আসে। এ জটিল, অনভিপ্রেত ব্যবস্থাদি আয়কর সার্কুলারের ভাষায় প্রতিফলিত হতে থাকে। তদানীন্তন ব্রিটেনে বিদ্যমান আয়কর আইন ও প্রয়োগ পদ্ধতি প্রক্রিয়া থেকে সে সময় এদেশে প্রণীত ও প্রবর্তিত আইন ও পদ্ধতি প্রক্রিয়ায় ব্যাপক বিচ্যুতি ও পরিবর্তন পরিলক্ষিত হওয়া সত্ত্বেও সেটাই ‘ভারতীয় আয়কর আইন’ আকারে ১৯২২ সালে সংকলিত ও প্রবর্তিত হয়।
১৯২২ সালের ভারতীয় আয়কর আইন ভারত বিভাগের পর যেখানে ‘ভারত’ লেখা সেখানে ‘পাকিস্তান’ প্রতিস্থাপন করে গোটা পাকিস্তানে প্রবর্তিত হয়। শাসক ও শাসিতের মধ্যকার হরাইজন্টাল ও ভার্টিক্যাল সম্পর্কের শাসনতান্ত্রিক পরিবর্তন সত্ত্বেও আয়করসংক্রান্ত ধ্যান-ধারণা, মতিগতি, স্বভাব-চরিত্র সবই সেই ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার আদলে থেকে যায়। আয়করব্যবস্থা যেখানে সামাজিক সুবিচার ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যে পারস্পরিক পরিপূরকের দায়িত্ব পালনের বিষয়, ঔপনিবেশিক শাসনকাঠামোয় সংগত কারণেই যার যথার্থতা অনুসরণ ছিল অনুপস্থিত, পাকিস্তান প্রজাতন্ত্রেও সেই একই ঔপনিবেশিক দৃষ্টিভঙ্গি অব্যাহত থাকা বা অনুসরণ ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক। স্মর্তব্য যে, আজকের বাংলাদেশ তখন পাকিস্তানের অধীনে উপনিবেশসম একটি প্রদেশ হিসাবে ব্যবসা-বাণিজ্য-বিনিয়োগ তথা আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক দিক দিয়ে বিপুল বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার ছিল। আর আয়কর-রাজস্ব আদায়ের পুরো প্রশাসনিক দায়িত্ব ছিল কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। প্রসঙ্গত, ভারতীয় প্রজাতন্ত্র ১৯৬১ সালে ১৯২২ সালের আয়কর আইনকে নিজস্ব সমাজ ও সময়ের দাবির সঙ্গে সাযুজ্য রেখে পুনর্গঠন করে নতুন আয়কর আইন প্রবর্তন করে।
১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পরও এক যুগেরও বেশি সময় সেই ১৯২২ সালের আয়কর আইন ভারতের স্থলে পাকিস্তান, পাকিস্তানের স্থলে বাংলাদেশ প্রতিস্থাপিত ও নামাঙ্কিত হওয়া ছাড়া একইভাবে বলবৎ ও প্রযোজ্য থাকে। আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪ (১৯৮৪ সালের ৩৬নং অধ্যাদেশ) জারির মাধ্যমে বাংলাদেশে নিজস্ব আয়কর আইন প্রবর্তিত হয় ১৯৮৪ সালে। তবে তখন দেশে আইন পরিষদ বিদ্যমান না থাকায় রাষ্ট্র ও নাগরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট ও জনগুরুত্বপূর্ণ আয়কর আইনটি অধ্যাদেশ হিসাবে জারি হওয়ায় এটির প্রণয়ন ও প্রয়োগযোগ্যতা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠেছে। বারবার দাবি উঠেছে আয়কর অধ্যাদেশের স্থলে আয়কর আইন প্রণয়নের।
জাতীয় সংসদে আইন প্রণেতারা আয়কর আইন ২০২৩ (২০২৩ সালের ১২নং আইন) অনুমোদন করেছেন। বাংলাদেশে বিদ্যমান আয়কর অধ্যাদেশের ভাষা ও গতিপ্রকৃতি বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয়, বছর বছর অর্থ আইনে যেসব ছিটেফোঁটা শব্দগত সংযোজন-বিয়োজন এবং মূল ধারণার আওতায় প্রয়োগযোগ্যতার মাপকাঠির পরিবর্তন বা পরিমার্জন অনুমোদিত হয়েছে, তা ধারণ করা ছাড়া ১৯২২-এর মূল আইনের ভাব-ভাষা দৃষ্টিভঙ্গিগত তেমন কোনো পরিবর্তন বা সংস্কার দৃশ্যগোচর হয় না। বরং প্রতিবছর কর নির্ধারণ, শুনানি, বিচার-আচারে কর কর্মকর্তাদের ক্ষমতা বা এখতিয়ার, কর অবকাশ নিষ্কৃতি কিংবা বিশেষ সুবিধাবলীর ধারা-উপধারা সংযোজন-বিয়োজন করতে করতে অনেক ক্ষেত্রেই করারোপ, আদায় ও করদাতার অধিকার, কর অবকাশ নিষ্কৃতির সুবিধাসংক্রান্ত মৌল দর্শন হয়েছে বিভ্রান্ত, বিকৃত ও বিস্মৃত। পক্ষান্তরে, যুগের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে কর নির্ধারণ ও আদায়সংক্রান্ত বিধানাবলি সহজীকরণ, সরলীকরণ তথা করদাতা বান্ধবকরণের পরিবর্তে ক্ষেত্রবিশেষে আরও জটিল হয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনীতির সমকালীন পরিবেশ-পরিস্থিতির আলোকে আয়করব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগসংবলিত সংশোধন সংযোজন-বিয়োজনের প্রয়াস বারবার যেন উপেক্ষিতই থেকে গিয়েছে।
একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের অর্থনীতি মুক্তবাজার অর্থনীতিতে অবগাহন করে অধুনামনস্ক হতে চাইলেও সেদেশের আয়কর আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি এখনো যেন ঔপনিবেশিক আমলের পারস্পরিক অবিশ্বাসের, সংশয়-সন্দেহের, জটিলতার আবর্তে বাঁধা পড়ে আছে। স্বেচ্ছায় করদানে সক্ষম করদাতাকে উদ্বুদ্ধকরণের ক্ষেত্রে স্বতঃস্ফূর্ততায় বাধা হয়ে দাঁড়ায়, নিরুৎসাহের কারণ হয়ে দাঁড়ায় বিদ্যমান আইনের ভাষা ও দৃষ্টিভঙ্গি। সেই আইন প্রয়োগে অভ্যস্ত আয়কর বিভাগ এবং সেই আইনের আওতায় করদাতাকে সহায়তাদানকারী সমাজও আইনটির সংস্কারে গলদঘর্ম হয়।
একথা অনস্বীকার্য যে, আয়কর আইনের ভাষা ও প্রয়োগ হতে হবে সহজবোধ্য, জটিলতামুক্ত এবং এর প্রয়োগ পদ্ধতি-প্রক্রিয়া হবে সর্বজনীন ব্যবহার উপযোগী। করদাতা যেন নিজেই নিজের আয়কর ফরম পূরণ, কর নির্ধারণ এবং সরাসরি তা দাখিলে সক্ষম হন। অর্থনীতির বিভিন্ন পর্যায়ে অবস্থানরত আয়কর দাতারা যেন অভিন্ন আচরণে আইনগতভাবে আয়কর প্রদানে দায়িত্বশীল হতে স্বতঃস্ফূর্ততা বোধ করেন। কর আদায় নয়, কর আহরণে করদাতা ও কর আহরণকারীর মধ্যকার দূরত্ব যত কমে আসবে, যত বেশি করদাতা কর নেটের আওতায় আসবেন, তত কর রাজস্ব আহরণে সুষম, সহনশীল ও দায়িত্ববোধের বিকাশ ঘটবে। এরূপ পরিস্থিতিতে করদাতাকে তাড়া করে ফেরার স্পর্শকাতরতার অবসান ঘটবে। তবে এ সবকিছুই নির্ভর করবে আয়কর আইনের ভাষা আর দৃষ্টিভঙ্গিতে কার্যকর ও কল্যাণমুখী পরিবর্তন আনার ওপর। আর এ প্রত্যাশা পূরণে আইন পরিষদ, নির্বাহী বিভাগ, করদাতা নির্বিশেষে সবার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
ড. মোহাম্মদ আবদুল মজিদ : সাবেক সচিব ও এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান