পলাশির আম্রকাননের যুদ্ধে বাংলা বিহার ওড়িশার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলা (১৭৩২-১৭৫৭) কতিপয় বিশ্বাসঘাতকের ষড়যন্ত্রের কারণে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পরাজিত হয়েছিলেন। ফলে প্রায় ২০০ বছরের জন্য স্বাধীনতা হারায় বাংলা।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, সকাল আটটা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত লড়াই-এ শুরুর দিকের কয়েক ঘণ্টা মাত্র কিছুটা যুদ্ধ হয়েছে এবং সেটাও নবাবের বাহিনীর একটি ক্ষুদ্র অংশের সঙ্গে। বাকী সময় নবাবের চক্রান্তকারী সেনাপতিরা সময় ক্ষেপন করে এবং ইংরেজ সৈন্যদের শক্তি সঞ্চয় করতে ও বিজয়ের ক্ষেত্র প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। বিকাল তিনটা থেকে চারটার মধ্যে সংগঠিত হয়ে ইংরেজ সৈন্য বিশৃঙ্খল নবাব বাহিনীকে তাড়িয়ে দিয়ে ময়দান দখল করে। প্রত্যক্ষ যুদ্ধ নয়, ইংরেজরা তাদের ষড়যন্ত্র কৌশলে এবং নবাব শিবিরের বিশ্বাসঘাতকতার কারণে পলাশীতে বিজয়ী হয়। নবাবের পরাজয় ছিল রাজনৈতিক, সামরিক নয়।
১৭৫৭ সালের এইদিনে পলাশী প্রান্তরে রবার্ট ক্লাইভ, মীরজাফর, রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ চক্র এই কালো দিবসের জন্ম দেয়। ঘৃণিত কলঙ্কজনক এই প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের অধ্যায় সৃষ্টির পেছনে জড়িত ছিল বিশ্বাসঘাতক জগৎশেঠ, মাহতাব চাঁদ, উমিচাঁদ, মহারাজা স্বরূপচাঁদ, মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র, রায়দুর্লভ, মীর জাফর, ঘষেটি বেগম, রাজা রাজবল্লভ, নন্দকুমার প্রমুখ কৌশলী চক্র।
ভারতীয় উপমহাদেশের পরাধীনতা ও পলাশীর ট্র্যাজেডি পরস্পর অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এই ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে সমগ্র ভারতবর্ষে ব্রিটিশের শাসনের পথ উন্মুক্ত হয়।১৬৫৮ সালের দিকে ইংরেজ বণিকরা প্রথম বাংলায় আগমন করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নামে প্রাথমিকভাবে শুধু ব্যবসার জন্য তারা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মত বাংলায় প্রবেশ করে। কিন্তু কালক্রমে তাদের তাদের বাণিজ্যিক আকাঙ্ক্ষার সাথে সাথে ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক ও সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাও বৃদ্ধি পেতে থাকে।
পলাশীর যুদ্ধের অর্ধশতকেরও বেশি সময় পরে, ১৮০৫ সালে রাজীব লোচন বন্দ্যোপাধ্যায় কৃষ্ণচন্দ্রের একটি জীবনী লেখেন। বইটির নাম মহারাজা কৃষ্ণচন্দ্র রায়স্য চরিত্রং।
পলাশীর ষড়যন্ত্র নিয়ে লিখতে গিয়ে রাজীব লোচন বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছিলেন, “নবাবের সভাসদদের মধ্যে সম-মনোভাবাপন্নদের সঙ্গে একটি গোপন মন্ত্রণা সভায় কৃষ্ণচন্দ্র বলে যে, তার সঙ্গে কলকাতার ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের পরিচয় আছে আর তিনি মনে করেন যে সরকার পরিচালনার ভার তুলে নিতে ব্রিটিশদের আমন্ত্রণ করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।“
অন্য সবাই সম্মত হলে তিনি কলকাতার হিন্দু তীর্থ ক্ষেত্র কালীঘাটে পুজো দিতে যাওয়ার অছিলায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্তাদের সঙ্গে দেখা করে পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি এবং তার বন্ধুরা যে সিরাজের অন্যতম সেনাপতি জাফর আলি খানকেও তাদের দলে টানতে সমর্থ হয়েছেন, সেটাও জানানো হয় কোম্পানির কর্তাদের। জাফর আলি খানই মীর জাফর।
ইংরেজরা নবাবকে উৎখাতের সিদ্ধান্ত নেয় এবং সৈন্যবাহিনী নিয়ে মুর্শিদাবাদের পথে অগ্রসর হয়। সিরাজও তার বাহিনী নিয়ে পলাশীর পথে অগ্রসর হন। ২৩ জুন সকাল ৮টার দিকে যুদ্ধ শুরু হয়। ইংরেজদের বাহিনীর তুলনায় নবাবের বাহিনীর আকার অনেক বড় হলেও মীরজাফর, ইয়ার লতিফ এবং রায় দুর্লভের অধীনস্থ প্রায় দুই তৃতীয়াংশ সৈন্য নিষ্ক্রিয় দাঁড়িয়ে থাকে।
ইংরেজি লেখক Luke scraftion পলাশীতে উপস্থিত ছিলেন। তিনি ও তার বিবরণীতে লিখেছেন, “One great cause of our success was that…we had the good fortune to kill Mir Madan” অর্থাৎ আমাদের সাফল্যের অন্যতম বড় কারণ ছিল যে আমাদের মীর মদনকে হত্যা করার সৌভাগ্য হয়েছিল। তা সত্ত্বেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে মীরজাফর ও রায় দুর্লভ এর নেতৃত্বাধীন এক বিরাট সংখ্যক নবাবি সৈন্য ইচ্ছাকৃতভাবেই নিজেদের যুদ্ধের প্রক্রিয়া থেকে বিরত রেখেছিল। ফলে পলাশীর যুদ্ধে ইংরেজদের জয় লাভ অনেকটাই সহজ হয়েছিল।
১৭৫৬ সালে এপ্রিল মাসে আলীবর্দী খান মারা গেলে বাংলার নবাব পদে অভিষিক্ত হন তার দৌহিত্র সিরাজউদ্দৌলা। কিন্তু সিরাজ ছিলেন বয়সে নবীন ও শাসন কার্যের প্রায় অনভিজ্ঞ। স্বভাবতই ভারতের কেন্দ্রীয় শক্তির পতনের ফলে রাজনীতির ক্ষেত্রে যে শূন্যতার সৃষ্টি হয় তা পূরণ করার দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা সিরাজের ছিল না। সিরাজের সিংহাসনে বসা অনেককে ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট করে তুলেছিল। আলীবর্দির খানের আরেক দৌহিত্র পূর্ণিয়ার ফৌজদার সৈকত জং ও সিরাজের খালা ঘষেটি বেগমের চোখও ছিল মনসদ এর উপর। এর পাশাপাশি আলীবর্দী খানের প্রধান সেনাপতি মীর জাফর ও এই দলের সদস্য ছিল। সিংহাসনে বসে সিরাজ বুঝতে পারেন তার বিরুদ্ধে হওয়া বিভিন্ন ষড়যন্ত্র গুলো।
পলাশীর বিশ্বাসঘাতকদের পরিণতি
বিশ্বাসঘাতকদের সর্দার মীরজাফর পবিত্র কুরআন শরিফ মাথায় রেখে নবাবের সামনে তার পাশে থাকবেন বলে অঙ্গীকার করবার পর পরই বেঈমানি করেছিল। তার জামাতা মির কাসেম তাকে ক্ষমতাচ্যুত করেন।
পরবর্তীতে তিনি দুরারোগ্য কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে শাস্তিভোগ করতে করতে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন। মীরজাফরের পুত্র মির মিরন ছিল সিরাজ হত্যার মূল নায়ক। সিরাজের মা আমেনার ঘোষিত অভিশাপ অনুযায়ী তাঁবুতে বজ্রপাতে আগুন ধরে গেলে মিরনের করুণ মৃত্যু ঘটে। মুহাম্মদি বেগের মৃত্যু হয়েছিল বিকৃত মস্তিষ্ক নিয়ে অন্ধকার কূপে বিনা কারণে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যার মাধ্যমে। মিরকাসেম ইংরেজদের ভয়ে পালিয়ে বেড়ান এবং অজ্ঞাতনামা অবস্থায় দিল্লির রাস্তায় করুণ মৃত্যু ঘটে। মিরনের নির্দেশে নৌকা ডুবিয়ে তাকে হত্যা করা হয় ঘষেটি বেগমকে। জগত শেঠ এবং উমিচাঁদর মৃত্যু হয়েছিল গঙ্গায় ডুবে। ইয়ার লতিফ নিরুদ্দেশ হয়ে যান। ইতিহাস আজও জানতে পারেনি এই বিশ্বাসঘাতকের ভাগ্যে কী ঘটেছিল। ধারণা করা হয়, তাকে গোপনে হত্যা করা হয়েছিল। তহবিল তছরুপ ও অন্যান্য অভিযোগের বিচারে মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসিকাষ্ঠে মৃত্যু হয়েছিল। ব্রিটিশ আমলে তিনিই ছিলেন প্রথম ভারতীয় যিনি দুর্নীতির কারণে ফাঁসির সাজা পান। বিষাক্ত সাপের কামড়ে দানিশ শাহ বা দানা শাহর মৃত্যু ঘটেছিল। রায়দুর্লভ কারাগারে ভগ্নস্বাস্থ্য নিয়েই মৃত্যুর মুখে পতিত হয়েছিলেন। উমিচাঁদ পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতো এবং রাস্তায় তার মৃত্যু হয়। রাজ বল্লভ প্রমত্তা পদ্মায় ডুবে মরেছিল। ওয়াটসন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে অল্পবয়সে মারা যান। স্ক্রাফটনের মৃত্যু হয় কলকাতা থেকে বিলাত ফেরার সময় জাহাজডুবিতে। পলাশির যুদ্ধের অন্যতম খলনায়ক ক্লাইভ ভারতবর্ষ থেকে বিলাতে ফিরে যাওয়ার পর সে দেশের সংসদে তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। এই অভিযোগের অপমান সইতে না পেরে বাথরুমে ঢুকে ক্ষুর দিয়ে নিজের গলা নিজে কেটে আত্মহত্যা করেছিলেন। এভাবে প্রায় সব বিশ্বাসঘাতকের মৃত্যু স্বাভাবিক নয়। এটাই ইতিহাসের অনিবার্য পরিণতি। এ পরিণতি থেকে কেউ রক্ষা পায়নি।
মৃত নবাব সিরাজের চরিত্রেও অব্যাহতভাবে লেপন করা হতে থাকে কালিমা।
পলাশী যুদ্ধ জয়ী ইংরেজ বেনিয়ারা তাঁবেদার লেখকদের দিয়ে ইতিহাস রচনায় অধিক আগ্রহী হয়ে ওঠে। নিজেদের গুণকীর্তন এবং সিরাজউদ্দৌলার প্রতি চরম বিদ্বেষপূর্ণ নানা অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করা হয়। সেসব ইতিহাসে লম্পট, মাতাল, চরিত্রহীন, নিষ্ঠুর, অপদার্থ, অর্বাচীন ইত্যকার নেতিবাচক অভিধায় সিরাজউদ্দৌলাকে অভিহিত করা হয়েছিল।
ইতিহাসের সাম্প্রতিক গবেষণা একের পর এক প্রমাণ হাজির করেছে যে, নবাব সিরাজের ব্যক্তিত্ব ও চরিত্রের ওপর যেসব কলঙ্ক আরোপ করা হয়েছিল, তার বেশির ভাগই ছিল নিকৃষ্ট মিথ্যাচারে ভরপুর। সিরাজ ‘অন্ধকূপ’-এ ইংরেজদের হত্যা করেছিলেন বলে যে প্রচার চালানো হয়, পরে প্রমাণিত হয় যে, তা ছিল ডাহা মিথ্যা।
এই তথ্যটিও মিথ্যা যে সিরাজ রানী ভবানির সুন্দরী-বিধবা কন্যা তারা সুন্দরীর প্রতি লোলুপ নজর দিয়েছিলেন। সিরাজের প্রতি রানী ভবানির বিরূপ মনোভাব সৃষ্টির জন্য উদ্দেশ্যমূলকভাবে এই অপবাদ রটানো হয়েছিল। এমন মিথ্যাচারও করা হয়েছিল যে, সিরাজ অন্তঃসত্ত্বা নারীর পেট চিরে দেখতেন। পরবর্তীতে ইতিহাসবিদরা প্রমাণ করেন যে, সিরাজকে ক্ষমতাচ্যুত করার পূর্বে অজনপ্রিয় এবং নিন্দিত করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নিয়ে ষড়যন্ত্রকারীরা এসব মিথ্যা প্রচার করেছিল।
১৬৫৮ সালের দিকে ইংরেজ বণিকরা প্রথম বাংলায় আগমন করে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নামে প্রাথমিকভাবে শুধু ব্যবসার জন্য তারা ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মত বাংলায় প্রবেশ করে। কিন্তু কালক্রমে তাদের তাদের বাণিজ্যিক আকাঙ্ক্ষার সাথে সাথে ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনৈতিক ও সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাও বৃদ্ধি পেতে থাকে।
পলাশীর পাঠে প্রকাশ্যে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং নবাব সিরাজউদ্দৌলা মুখোমুখি হলেও গোপনে অনেক কিছু হয়েছে। নবাবকে সমর্থন করেছে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আর ইংরেজ কোম্পানিকে সাহায্য করেছে নবাবের কয়েকজন সেনাপতি। ইংরেজ পক্ষে যুদ্ধে অংশ নেয় রবার্ট ক্লাইভ, মেজর কিলপ্যাট্রিক, মেজর গ্র্যান্ট, মেজর আইরি কুট, ক্যাপ্টেন গপ ও ক্যাপ্টেন রিচার্ড নক্স। নবাবের পক্ষে ময়দানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং সিরাজউদ্দৌলা এবং মোহনলাল (প্রধান সেনাপতি), মীর মদন (ভ্যানগার্ড), মীরজাফর (অশ্বারোহী বাহিনীর প্রধান ও বিশ্বাসঘাতক), খুদা-ইয়ার লুৎফে খান/ইয়ার লতিফ (বিশ্বাসঘাতক), রায় দুর্লভ (বিশ্বাসঘাতক) ও ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রে (অস্ত্রাগার)।
শক্তিমত্তার বিবেচনায় ইংরেজের পক্ষে ছিল ১,০০০ ইউরোপীয় সৈন্য, ২,১০০ ভারতীয় সৈন্য, ১০০ বন্ধুকবাজ ও ৯টি কামান। পক্ষান্তরে নবাবের পক্ষে ছিল ৫০,০০০ সৈন্য এবং ৫৩টি কামান। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, নবাবের পক্ষে মাত্র ৫,০০০ সৈন্য যুদ্ধে অংশ নেয় এবং সিংহভাগই নীরব ও নিষ্ক্রিয় থাকে। ফলে ৫/৬ হাজার লোকের মারামারিকে যুদ্ধ বলা যায় না; বরং যুদ্ধের নামে তামাশা বলাই সঙ্গত। ষড়যন্ত্র এতোটাই নিখুঁত ও গভীর ছিল যে, বিরাট বাহিনী ও অস্ত্রশস্ত্র নিয়েও চক্রান্তকারীদের কাছে নবাবকে পরাজিত হতে হয়।
ইতিহাসের পাতায় অনেকেরই অস্বাভাবিক ও নিষ্ঠুরতম মৃত্যু হয়েছে। ইতিহাস কি নির্মম ও সত্য। পলাশী পরবর্তী ঘটনা এসবই প্রমাণ করে। পলাশীর এসব ষড়যন্ত্রকারীরা কে কিভাবে মৃত্যুবরণ করেছে তা’ নিম্নে তুলে ধরা হলো-
(১) মীর জাফর : ইতিহাসের সবচেয়ে ঘৃণ্যতম ব্যক্তি। মীর জাফরকে লোকে ক্লাইভের গর্দভ বলে জানতো। মীর জাফর নবাব আলীবর্দী খাঁর বৈমাত্রেয় বোন শাহখানমকে বিয়ে করেছিলেন। সেই সম্পর্কে তিনি ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলার নিকটতম আত্মীয়। তিনি ছিলেন একজন বোকা, রাজনীতি জ্ঞানবিহীন একজন সেনাপতি মাত্র। মীর জাফর কোরান শরীফ ছুঁয়ে শপথ করেছিলেন তার বাঙলার সিংহাসনের উপর কোন মোহ নাই। পরবর্তীতে এই বিশ্বাসঘাতক মীর জাফরের হস্তেই কুষ্ঠ ব্যাধি দেখা দেয়। মীর জাফরের মৃত্যু হয় অত্যন্ত মর্মান্তিক ভাবে। তিনি এই দূরারোগ্য কুষ্ঠ ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েই ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে ৭৪ বছর বয়সে মারা যান। তার মৃত্যুর পূর্বে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু মহারাজ নন্দকুমার কিরীটেশ্বরীর চরণামৃত এনে তাকে পান করতে দিয়েছিলেন। বলাবাহুল্য এই চরণামৃত মুখে করেই তার মৃত্যু হয়।
(২) ইয়ার লতিফ : ইয়ার লতিফ খান ছিলেন নবাব সিরাজের একজন সেনাপতি। তিনি পলাশী ষড়যন্ত্রের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। পলাশীর যুদ্ধের মাঠে তার বাহিনী মীর জাফর, রায় দুর্লভের বাহিনীর ন্যায় পুত্তলির মতো দাঁড়িয়ে ছিল। যুদ্ধ পরবর্তী ইয়ার লতিফ নিখোঁজ হয়ে যান। অনেক ঐতিহাসিকের ধারণা ইংরেজরা তাকে গোপনে হত্যা করেছিল।
(৩) রায় দুর্লভ : রায় দুর্লভ ছিলেন নবাবের একজন সেনাপতি। তিনিও মীর জাফরের সাথে সক্রিয়ভাবে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। পলাশীর যুদ্ধে তার বাহিনী মীর জাফরের সাথে যুক্ত হয়ে নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। ১৭৬৫ খ্রিষ্টাব্দে মীর কাশিম ইংরেজদের সাথে বক্সারের যুদ্ধে যাবার প্রাক্কালে ষড়যন্ত্রকারী রায় দুর্লভের গলায় বালির বস্তা বেঁধে মুঙ্গেরের দূর্গশীর্ষ থেকে জীবন্ত দেহ নিক্ষেপ করেন গঙ্গার বুকে। এভাবেই গঙ্গার বক্ষে সলিল সমাধি হয় তার।
(৪) জগৎ শেঠ : ইতিহাসের জঘন্যতম ষড়যন্ত্রকারী রাজস্থানের কুসীদজীবি ব্যবসায়ী ফতেহ চাঁদের বংশধর ছিলেন জগৎশেঠ হিসাবে পরিচিত মহাতাব চাঁদ। প্রথমত তারা নবাবের বিরুদ্ধে ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং পরে মীর জাফর ও অন্যান্যদের এতে যুক্ত করে। নবাব সিরাজউদ্দৌলার ষড়যন্ত্রের মূল হোতা ছিলেন এই জগৎ বিখ্যাত মাড়োয়ারী জগৎ শেঠ। জগৎ শেঠের পরিবারের বার্ষিক আয় ছিল ৪০ লক্ষ টাকা। অর্থাৎ বর্তমানের মূদ্রা মানে ৯০০ কোটি টাকা। মুর্শিদাবাদের টাকশাল ছিল জগৎ শেঠের একক এখতিয়ার। তার আসল নাম ছিল স্বরূপ চাঁদ জগৎ শেঠ। জগৎ শেঠের পিতামহের নাম ছিল ফতেহ চাঁদ জগৎ শেঠ। জগৎ শেঠের মৃত্যু হয় রায় দূর্লভের মতই। বক্সারের যুদ্ধে যাবার প্রাক্কালে ষড়যন্ত্রকারী জগৎ শেঠকে গলায় বালির বস্তা বেঁধে মুঙ্গেরের দূর্গ প্রাকার থেকে নবাব মীর কাশিমের আদেশে গঙ্গায় নিক্ষেপ করে ডুবিয়ে মারা হয়। বাঙলার ইতিহাসে পলাশী পরবর্তী অধ্যায় যেমন ন্যক্কারজনক তেমনি এ থেকে অনেক শিক্ষণীয় বিষয়ও আমাদের রয়েছে।
(৫) উমিচাঁদ : পলাশীর যুদ্ধের অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী পাঞ্জাবী ব্যবসায়ী ছিলেন এই উমিচাঁদ। ক্লাইভ উমিচাঁদকে নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র গড়ে তোলার প্রধান হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করেন। পলাশী যুদ্ধ পরবর্তী সিরাজের পতন হলে তাকে নবাব সম্পত্তির চার আনা অংশ দিতে হবে বলে ইংরেজদের সঙ্গে এক জাল চুক্তি পত্র সই করে এই উমিচাঁদ। ইংরেজ নৌ-সেনাপতি ওয়াটস ছিলেন এই চুক্তিপত্রের প্রধান ব্যক্তি। লাল কাগজ ও সাদা কাগজে এই দুটি চুক্তিপত্রের সই হয়। পরবর্তীতে সিরাজের পতনের পরে ওয়াটস প্রদত্ত এই চুক্তি জাল বলে প্রমাণিত হয়। উমিচাঁদ নবাবের ধনরত্ন ও সম্পদ থেকে মোট ৪০ লক্ষ টাকা টাকার দাবীদার ছিলেন, যা’ বর্তমান মুদ্রামানে ৯০০ কোটি টাকার সমান। উমি চাঁদ এই জাল দলিলের জন্য সিরাজের সম্পত্তির কোন অর্থ পান নাই। মূলত ওয়াটস্ই ছিলেন এই জাল দলিলের উদ্ভাবক। এই অর্থের শোকে উমিচাঁদ বদ্ধ পাগল হয়ে রাস্তায় নেমে যান। খাওয়া দাওয়া ছেড়ে মুর্শিদাবাদের পথে প্রান্তরে আকাশের দিকে মুখ করে লম্ফ দিতে দিতে সর্বদাই লাল কাগজ ও সাদা কাগজ বলে চিৎকার করে বেড়াতেন। এভাবে উমিচাঁদ চিৎকার করতে করতে তার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে অকস্মাৎ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। কি নিদারুণ ও দুর্বিষহ তার এই মৃত্যু।
(৬) রাজা রাজ বল্লভ : আমাদের ঢাকার রাজা ছিলেন রাজা রাজবল্লভ। পলাশির যুদ্ধে ইংরেজদের সঙ্গে সর্বদা সহযোগীতা করেছেন। রায়দূর্লভ ও জগৎশেঠের একত্রে সহযোগী ছিলেন এই ঢাকার কুখ্যাত ষড়যন্ত্রকারী রাজা রাজবল্লভ। তারও শেষ পর্যন্ত হয় অস্বাভাবিক মৃত্যু। এক অপঘাতে তিনি নিদারুণ ভাবে নিহত হন। পরবর্তীকালে তার সমূদয় কীর্তি পদ্মা নদী গ্রাস করে কীর্তিনাশা নাম ধারণ করেন।
(৭) মহারাজা নন্দকুমার : পলাশীর ষড়যন্ত্রের পর নন্দকুমারকে মীর জাফর দেওয়ান নিযুক্ত করে সব সময় তাকে নিজের কাছে রাখতেন। নন্দকুমার ভূষিত ছিল মহারাজা উপাধীতে। কিন্তু ওয়ারেন হেস্টিংস এর সাজানো মিথ্যা মামলায় আসামীর কাঠগড়ায় তার বিচার হয়। অদৃষ্টের কি নির্মম পরিহাস তাকে শেষ পর্যন্ত এই বিচারের রায়ে শেওড়াগাছে ঝুলতে হয় ফাঁসী কাষ্ঠে। মহারাজ নন্দকুমারের সাথে মীর জাফরের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। মীর জাফর তার শেষ জীবনে যাবতীয় কাজ কর্ম নন্দকুমারের পরামর্শনুসারে করতেন। তার অন্তিম শয্যায় নন্দকুমারই তার মুখে কিরীটেশ্বরা দেবীর চরণামৃত তুলে দিয়েছিলেন।
(৮) ঘষেটী বেগম : ঘষেটী বেগম ছিলেন আলীবর্দী খানের কন্যা। সিরাজের খালা ঘষেটী বেগম তার পোষ্য ছেলেকে সব সময় বাংলার সিংহাসনে বসানোর জন্য ষড়যন্ত্র করতে থাকেন। সেই জন্য সিরাজউদ্দৌলা নবাব হবাার পরই ঘষেটী বেগমকে হিরাঝিল প্রাসাদে বন্দী করে রাখেন। এছাড়া ঘষেটী বেগম প্রচুর অবৈধ ধন সম্পদেরও মালিক ছিলেন। পরবর্তীতে পলাশীর যুদ্ধে সিরাজের পতন ও মৃত্যুর পরে মীর জাফরের পুত্র মীরণ ঘষেটী বেগমকে ঢাকার জিঞ্জিরায় বন্দী করে রাখেন। জিঞ্জিরার সন্নিকটে খরস্রোতা বুড়ীগঙ্গা নদীতে পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক ঘষেটী বেগমকে নৌকায় তুলে বুড়ীগঙ্গা নদীতে নৌকা ডুবিয়ে মেরে ফেলে। ঘষেটী বেগমের আর্তনাদ আহাজারী নদীর কিনার থেকে নিশুতি রাতে পথচারীরা শুনতে পেয়েছিল।
(৯) মীরণ : মীরণ পলাশী ষড়যন্ত্রের পরবর্তী প্রধানতম নায়ক ছিলেন। তার পুরো নাম ছিল মীর মোহাম্মদ আলী খান। সিরাজের মূল হত্যাকারী, সিরাজের মাতা আমেনা বেগম, সিরাজের ভাই মির্জা মেহেদীকেও নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করেছিল মীরণ। তারই নির্দেশে মোহাম্মদী বেগ সিরাজকে হত্যা করে। শুধু হত্যা নয় সিরাজউদ্দৌলার লাশকে মীরণ ক্ষত বিক্ষত করে তারই প্রিয় হাতির পৃষ্ঠে বেঁধে গোটা মুর্শিদাবাদ শহর প্রদক্ষিণ করেছিলেন। যাতে সবাই এই বীভৎস দৃশ্য দেখে যেনো পরবর্তীতে বাংলার বুকে বিদ্রোহ করতে না পারে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় সিরাজের মাতা আমেনা বেগম তার ছেলের লাশ দেখার জন্য দৌড়ে হাতির কাছে যেয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান এবং সে’সময় মীরণের দুর্বৃত্তরা সিরাজের মাতাকে কিল, চড় ও ঘুষি মেরে আবার জেলখানায় বন্দী করে রাখেন। হাতিটা কিন্তু সে সময় সিরাজের লাশ তার পৃষ্ঠে নিয়ে আমেনা বেগমের সামনে বসে পড়েন।
মীরণের মৃত্যু ঘটে বজ্রপাতে। মীর জাফর তখনও বাংলার নবাব। বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতই পিতার কানে সে সংবাদ পৌঁছে ছিল। তিনি মীরণের মৃত্যু শুনে বেঁহুশ হয়ে পড়েন। মুর্শিদাবাদে মীরণের লাশ, নিয়ে আসা হলো। কি বীভৎস বিকৃত পোড়ালাশ। পিতাকে না দেখতে দিয়ে লাশ দাফন করা হলো। এভাবেই মীরণের মৃত্যু।
ইতিহাস বলে মীরণকে আততায়ীর দ্বারা হত্যা করা হয়েছিল। প্রচন্ড ঝড় আর ঘন ঘন বজ্রপাতের সময় মদ্যপ মীরণের তাঁবুতে আগুন লাগিয়ে দেয়া হয় এবং হত্যা করা হয়। এটা আর কিছুই নয় আসল ঘটনাকে চাপা দেওয়ার একটা কৌশল মাত্র। মীরণকে হত্যা করে ইংরেজদের নির্দেশে মেজর ওয়ালস্। তবে তার এই ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার জন্য ইংরেজরা বজ্রপাতে মীরণের মৃত্যু মিথ্যা গল্প বানিয়েছিল।
(১০) মোহাম্মদী বেগ : মোহাম্মদী বেগ ছিল নবাব আলীবর্দী খাঁর পৌষ্য। আলীবর্দী খাঁর আমল থেকেই তাঁর পরিবারের একজন সদস্যরূপে তাঁরই স্নেহছায়ায় সে বেড়ে উঠে। সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গেও তার বিশেষ সখ্যতা ছিল। সিরাজউদ্দৌলাকে মীরণের নির্দেশে হত্যা করেছিল এই মোহাম্মদী বেগ, যাকে আলীবর্দী খাঁ কোলে পিঠে করে মানুষ করেছিলেন। মোহাম্মদী বেগ একটা খঞ্জর দিয়ে আঘাত করে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে নির্মমভাবে হত্যা করেছিল। দিনটি ছিল ১৭৫৭ খৃষ্টাব্দের ৩’রা জুলাই। নবাব সিরাজ এ সময় তার কাছে প্রাণ ভিক্ষা চান নাই। তিনি কেবল তার কাছ থেকে দু’রাকাত নামাজ পড়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। বলাবাহুল্য কুখ্যাত মোহাম্মদী বেগ সিরাজের সেই অন্তিম ইচ্ছাও প্রত্যাখ্যান করেছিল। মোহাম্মদী বেগ তার সংসারের দাম্পত্য কলহে বদ্ধ উম্মাদ অবস্থায় এক কূপে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে। এভাবেই তার ভবলীলা সাঙ্গ হয়।
(১১) ওয়াটসন : ওয়াটস্ন ছিলেন ইংরেজ নৌ সেনাপতি। পলাশীর ষড়যন্ত্রকারী ওয়াটস্ন ক্রমাগত ভগ্নস্বাস্থ্য হয়ে কোন ঔষধে ফল না পেয়ে কলকাতাতেই করুণভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হন।
(১২) ওয়াটস : পলাশীর যুদ্ধে ওয়াটস ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলেন। তিনি পাল্কীতে করে রমণী সেজে মীর জাফরের বাড়ীতে গিয়ে চুক্তিতে মীর জাফরের স্বাক্ষর এনেছিলেন। পলাশীর যুদ্ধের পর কোম্পানীর কাছ থেকে বরখাস্ত হয়ে মনের দুঃখে ও অনুশোচনায় ইংল্যান্ডে হঠাৎ হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান।
(১৩) স্ক্রাফটন : পলাশী যুদ্ধের পরবর্তী সিরাজের সম্পদের লুটপাটের পিছনে স্ক্রাফটন বিশেষভাবে কাজ করেছিলেন। ইতিহাস থেকে জানা যায় বাঙলার বিপুল ধন-সম্পদ লুন্ঠন করে বিলেতে যাওয়ার পথে জাহাজ ডুবি হয়ে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
(১৪) রবার্ট ক্লাইভ : পলাশী যুদ্ধের পর হিরাঝিল প্রাসাদের ধনাগারটি লুটের বখরা বাবদ ক্লাইভ পান ২ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা। এছাড়া কৃতজ্ঞতার চিহ্ন স্বরূপ তাকে আরও ১ লক্ষ ৬০ হাজার টাকা দেন মীর জাফর। স্ক্রাফটন সাহেবের বিবৃতি থেকে জানা যায় রবার্ট ক্লাইভ ৩০ খানা নৌকা বোঝাই করে ধনরত্ন নিয়ে যান ইংল্যান্ডে।
বাংলার ছিয়াত্তরের মন্বন্তর, হত্যা, রাহাজানি, ঘুষ, জালিয়াতি, নারী ধর্ষণ, বাংলার নবাব পরিবারবর্গের হত্যার জন্য লন্ডনের হাউজ অব কমন্স সভায় ক্লাইভের বিচার হয়। বিচারের রায়ে ক্লাইভের ফাঁসির হুকুম হয়। এই ফাঁসির দন্ড থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার জন্য তিনি আদালতে আত্মপক্ষ সমর্থন করেন। বহু কষ্টে তিনি মৃত্যুদন্ড থেকে মুক্তি পান। রবার্ট ক্লাইভের মৃত্যু ও মর্মান্তিক ভাবে হয়েছিল। পলাশী ষড়যন্ত্রের ঘটনা তাকে পরবর্তীতে কোনদিন মানসিকভাবে সুস্থ থাকতে দেয় নাই। স্বজনদের উপর ক্ষোভে, অভিমানে ইংরেজ পক্ষের মূলনায়ক বরার্ট ক্লাইভ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে নিজের গলাায় নিজে ক্ষুর চালিয়ে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।
(১৫) মীর কাশিম : নবাব মীর কাশিম ছিলেন মীর জাফরের জামাতা ও মীরণের ভগ্নিপতি। ভগবান গোলায় পলাতক ছদ্মবেশী নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে মীর কাশিমই সর্বপ্রথম ধরিয়ে দিয়েছিলেন। পরে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে তিনি বাঙলার নবাব হন এবং এসময় ইংরেজদের সাথে তার বিরোধ বাঁধে। কয়েকটি খন্ডযুদ্ধে তিনি পরাজিত হন।
বহু প্রস্তুতি বহু প্রচেষ্টা, যুদ্ধ সংগ্রাম করে বৃটিশ শক্তির কাছে পরাজিত হওয়ার পরে তিনি বনে জঙ্গলে পথে প্রান্তরে ছুটে বেড়াতে থাকেন। জঙ্গলেই তার দুই পুত্র ইংরেজদের হাতে নিহত হন।
অতঃপর পরাধীন দেশ ও জাতির সকল প্রচেষ্টা, স্বাধীনতার সকল আশা, আকাক্সক্ষার নিষ্ফল প্রমাণিত করে দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে ১৭৭৭ সালের ৬ জুন মীর কাশিম দিল্লীর রাজপথে এক বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে থাকেন। এক কালের লক্ষ লক্ষ নর-নারীর দন্ড মুন্ডের কর্তা, বঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যার মহা সম্মানিত নবাব মীর কাশিম আলী খানের দেশ উদ্ধারের সকল প্রচেষ্টা আশা-আকাঙ্খার অবসান হয় এবং অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস তাঁর গাত্রের শেষ অঙ্গাভরণ দিয়েই তার অন্তিম শয্যা রচিত হয়। কি নির্মম নিয়তি ও অদৃষ্টের পরিহাস। কারণ ইতিহাস কোনো ষড়যন্ত্রকারীকেই ক্ষমা করে না।
এভাবেই বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রকারীরা পলাশী যুদ্ধের কিছুকালের মধ্যেই বিভিন্ন পন্থায় মর্মান্তিকভাবে মৃত্যুমুখে পতিত হন। পলাশীর ইতিহাস বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস। এই শিক্ষাই আমাদের সকলের মনে রাখবার অঙ্গীকার করা উচিত।
তথ্যসুত্র :
(১) বাঙলার মুসলমানদের ইতিহাস : আব্দুর রহীম
(২) এ্যান এডভান্সড হিস্টরী অফ ইন্ডিয়া : আর, সি মজুমদার ও কালিশঙ্কর দত্ত
(৩) ইতিহাসের অন্তরালে : ফারুক মাহমুদ
(৪) আলীবর্দী এন্ড হিজ টাইম : কে, কে, দত্ত
(৫) সিরাজউদ্দৌলা : অক্ষয় কুমার মৈত্র
(৬) নবাব সিরাজউদ্দৌলা ও বাংলার মসনদ : ড: মুহাম্মদ ফজলুল হক
(৭) মুর্শিদাবাদ কাহিনী : নিখিল নাথ রায়, ১৩১৬ বঙ্গাব্দ
মুর্শিদাবাদে সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ঘনীভূত হয়ে ওঠে। সিরাজের প্রতি নাখোশ জগৎশেঠ, রাজবল্লভ, রায়দুর্লভ, ঊমিচাঁদ প্রমুখ হিন্দু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সিরাজকে সিংহাসনচ্যুত করে তদস্থলে ইয়ার লতীফকে সিংহাসনে বসানোর ষড়যন্ত্র করে। সময় যারা প্রধান ভূমিকা পালন করেন তাদের মধ্যে জানকী রাম, দুর্লভ রাম, রাম নারায়ণ, কিরাত চাঁদ, বিরু দত্ত, গোকুল চাঁদ, উমিচাঁদ রায় এবং রাম রাম সিংহের নাম উল্লেখযোগ্য।
সামরিক ও বেসামরিক উভয় ক্ষেত্রে হিন্দু কর্মকর্তা অধিক সংখ্যায় নিয়োগ পান। এভাবে আলীবর্দী খানের শাসনামলে হিন্দুরা সকল ক্ষেত্রে প্রতিপত্তিশালী হয়ে ওঠে। এর পরিণতি হয়েছিল অত্যন্ত অশুভ। নবাব সিরাজউদ্দৌলার শাসনামলে তারা ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়ে বাংলার মুসলিম রাজত্বের অবসানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সিরাজউদ্দৌলাও তাঁর নানার মতই হিন্দুদেরকে উচ্চপদে নিয়োগ দেন। তিনি মোহনলাল নামক এক কাশ্মিরী হিন্দুকে উচ্চপদে নিয়োগ দেন। মোহনলাল সিরাজের উপরে প্রভাব বিস্তার করে নবাবের প্রধান উজিরে পরিণত হন। আর এসব হিন্দুরাই নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন ত্বরান্বিত করে। নবাব সিরাজের হাতে কলকাতা পতনের পর যদি উমিচাঁদ নবকিষেণ, জগৎশেঠ, রায় দুর্লভ মানিক চাঁদ প্রমুখ হিন্দুগণ গভর্নর ড্রেক ও তার লোকজনকে সাহায্য না করতো তা হলে ইংরেজদের জন্য আত্মসমর্পণ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না।
নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করার উদ্দেশ্যে পাকাপোক্ত ষড়যন্ত্র করে, সিরাজেরই তথাকথিত আপন লোক রায়দুর্লভ রাম, উমিচাদ ও জগৎশেঠ ভ্রাতৃবৃন্দের সাথে। তাদেরই পরামর্শে মীর জাফরকে নবাবের স্থলাভিষিক্ত মনোনীত করা হয়। ইংরেজ ও মীর জাফরের মধ্যেও সকল বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে যায়। শুধু উমিচাঁদ একটু অসুবিধার সৃষ্টি করে। সে নবাবের যাবতীয় ধন-সম্পদের শতকরা পাঁচ ভাগ দাবি করে বসে। অন্যথায় সকল ষড়যন্ত্র ফাঁস করে দেয়ার হুমকি দেয়। ক্লাইভ উমিচাঁদকে খুশি করার জন্য ওয়াটসনের জাল স্বাক্ষরসহ এক দলিল তৈরি করে। মীর জাফরের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিতে সে আলীনগরের চুক্তির সকল শর্ত পুরাপুরি পালন করতে বাধ্য থাকবে বলে স্বীকৃত হয়। উপরন্তু সে স্বীকৃত হয় ক্ষতিপূরণ বাবদ কোম্পানিকে দিতে হবে এক কোটি টাকা, ইউরোপিয়ানদেরকে পঞ্চাশ লক্ষ, হিন্দু প্রধানদেরকে বিশ লক্ষ এবং আরমেনিয়ানদেরকে সাত লক্ষ টাকা। কলকাতা এবং তার দক্ষিণে সমুদয় এলাকা চিরদিনের জন্য কোম্পানিকে ছেড়ে দিতে হবে।
ইংরেজগণ হিন্দু প্রধানদের মনোভাব বুঝতে পেরে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য হিন্দুদের পুরোপুরি ব্যবহার করে।
ব্রিটিশরা কর আদায়ের নামে বাংলার অধিবাসীদের ওপর কঠোর নিয়ম-কানুন চাপিয়ে দিতে থাকে। যুদ্ধের ফলে মীরজাফরকে বাংলার সিংহাসনে বসালেও তিনি ছিলেন নামে মাত্র নবাব, প্রকৃত ক্ষমতা ছিল রবার্ট ক্লাইভের হাতে। ফলে ইংরেজরা বাংলায় একচেটিয়া ব্যবসা-বাণিজ্যের অধিকার লাভ করে। এই যুদ্ধের পর ইংরেজ শক্তির স্বার্থে এ দেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক পরিবর্তন সংঘটিত হতে থাকে।