জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদে গাজা প্রস্তাবের ওপর ভোটাভুটিতে বিলম্বের মধ্যে ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও অমানবিক বক্তব্যের বিষয়ে সতর্ক করে দিয়েছে জাতিগত বৈষম্য দূরীকরণবিষয়ক জাতিসঙ্ঘ কমিটি।
বৃহস্পতিবার (২১ ডিসেম্বর) ‘আর্লি ওয়ার্নিং অ্যান্ড ইমার্জেন্সি অ্যাকশন প্রসিডিউর’-এর আওতায় গৃহীত এক সিদ্ধান্তে কমিটি বলেছে, সাত দিনের বিরতির পর চলতি বছরের ১ ডিসেম্বর অধিকৃত গাজা উপত্যকায় নৃশংস শত্রুতা পুনরায় শুরু হওয়ায় তারা গভীরভাবে উদ্বিগ্ন।
ইসরাইলের মিত্র নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেটো দিয়ে ‘যুদ্ধবিরতি’ শব্দটির বিরোধিতা করেছে এবং ওয়াশিংটন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইল-বিরোধী প্রস্তাবগুলোকে ব্যর্থ করতে তাদের ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করেছে।
একটি কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অনুরোধে সর্বশেষ বিলম্ব হয়েছে।
ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বুধবার বলেন, হামাসকে ‘নির্মূল’ না করা পর্যন্ত গাজায় কোনো যুদ্ধবিরতি হবে না।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষক রিচার্ড গোয়ান বলেন, ‘নিউইয়র্কের (জাতিসঙ্ঘ সদর দফতর) সবাই এখনো হোয়াইট হাউসের জন্য অপেক্ষা করছে। একটি দৃঢ় ধারণা রয়েছে যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।’
গোয়ান বলেন, ‘জাতিসঙ্ঘে ওয়াশিংটনের রাষ্ট্রদূত লিন্ডা থমাস-গ্রিনফিল্ড চুক্তির জন্য মার্কিন ব্যবস্থার মধ্যে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তবে ইসরাইলিরা যদি প্রস্তাবের বিরোধিতা করতে থাকে, বাইডেন এখনো এটিকে ব্লক করার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।’
অধিকৃত গাজা উপত্যকা জুড়ে আকাশ, স্থল ও সমুদ্র থেকে তীব্র, নৃশংস এবং নির্বিচারে ইসরাইলি বোমাবর্ষণ এবং অধিকৃত গাজা উপত্যকার দক্ষিণে ইসরাইলি সামরিক স্থল অভিযানের সম্প্রসারণে এটি গভীরভাবে মর্মাহত করে। ইসরাইলি এই সামরিক অভিযানের ফলে প্রায় ২০ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
এতে বলা হয়, অধিকৃত গাজা উপত্যকায় বিপর্যয়কর মানবিক সঙ্কট মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা প্রতিরোধে ইসরাইল ও অন্যান্য রাষ্ট্রপক্ষের বাধ্যবাধকতা সম্পর্কে গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
আল জাজিরার হামদাহ সালহুত অধিকৃত পূর্ব জেরুসালেম থেকে জানিয়েছেন, গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় যে তথ্য দিয়েছে, তার সাথে এই দাবি বিপরীত মনে হচ্ছে। ফিস্তিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব মতে, গাজায় ৭ অক্টোবর ইসরাইলি হামলা শুরুর পর থেকে যে ২০ হাজারের বেশি লোক নিহত হয়েছে, তার মধ্যে প্রায় আট হাজার শিশু এবং ৬,২০০ নারী। আ বাকি ৫,৮০০ ফিলিস্তিনি পুরুষের বেশির ভাগই বেসামরিক নাগরিক।
২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে ইসরাইলের শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তা, সংসদ সদস্য, রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তারেদ বর্ণবাদী বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, সহিংসতা ও গণহত্যার উস্কানি এবং ফিলিস্তিনিদের লক্ষ্য করে অমানবিক বক্তব্যের বিষয়েও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি।
কমিটি গত কয়েক সপ্তাহে অধিকৃত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুসালেমে ইসরাইলি বাহিনীর প্রাণঘাতী অস্ত্রের অবৈধ ব্যবহার বৃদ্ধি, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, নির্বিচারে গ্রেফতার এবং ফিলিস্তিনিদের আটকসহ মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতির বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
একই সাথে কমিটি অধিকৃত গাজা উপত্যকায় তাৎক্ষণিক ও টেকসই যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।
এতে ইসরাইল ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রসিকিউটর এবং পূর্ব জেরুসালেম ও ইসরাইলসহ অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সাথে তাদের তদন্তে পূর্ণ সহযোগিতা করার আহ্বান জানানো হয়।
গত ৭ অক্টোবর ইসরাইল সীমান্তে হামলা করে ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ আন্দোলন হামাস। তাদের ওই আক্রমণ প্রতিহত করতে না পারার কারণে ক্রমাগত সমালোচনার সম্মুখীন হচ্ছে দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। সম্প্রতি ইসরাইলি গণমাধ্যম মারিভের এক জরিপে দেখা গেছে যে বর্তমানে মাত্র ২৭ শতাংশ ইসরাইলি মনে করেন যে নেতানিয়াহু সরকার পরিচালনার যোগ্য ব্যক্তি। এছাড়া ৪৯ শতাংশ মনে করেন যে ন্যাশনাল ইউনিটি পার্টির নেতা বেনি গ্যান্টজ সরকার পরিচালনার জন্য সেরা ব্যক্তিত্ব। অনেকে আশা করছেন যে যুদ্ধোত্তর তদন্ত নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটাবে।
অপরদিকে, ২০২২ সালের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু। গত রোববার বিরোধী নেতা ল্যাপিড গাজা উপত্যকায় চলমান হামলার মধ্যে নতুন নির্বাচনের আহ্বান জানান।
জাতিসঙ্ঘের অন্তত ১৩৬ জন কর্মী নিহত হওয়ার ঘটনায় অত্যন্ত উদ্বিগ্ন কমিটি। ইসরাইলকে হামাস ও অন্য ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীর সংগঠিত আন্তর্জাতিক মানবিক আইন এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের উল্লেখযোগ্য লঙ্ঘন নথিভুক্ত করতে বলেছে সংস্থাটি। এছাড়া জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাই-কমিশনারের অফিসে প্রবেশাধিকার দেয়ার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসঙ্ঘের এই কমিটি।
কমিটি যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের পাশাপাশি চলমান সশস্ত্র সঙ্ঘাতের অন্য আন্তর্জাতিক অপরাধের জন্য দায়ী সকলকে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার বিষয়টি নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রপক্ষগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।
ইসরাইলের আরেকটি দাবি ছিল গাজা সিটির আল-শিফা হাসপাতালের নিচে হামাসের সদরদফতর রয়েছে। কিন্তু তারা তাদের দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি। বরং ওয়াশিংটন পোস্টের নতুন তদন্তে দেখা গেছে, এই হাসপাতাল বা গাজার অন্যান্য হাসপাতালের ব্যাপারে ইসরাইলি দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ নেই।