হামলা, নৃশংসতা কেবল পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে করবে।
বাংলাদেশ তার ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু মুহূর্ত এখন অতিক্রম করছে। আর এ সময়ে বেশ কিছু দুঃখজনক ঘটনাও ঘটে চলছে। সোমবার দুপুর থেকে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায় হামলা হয়েছে। হয়েছে লুটপাট। ভিডিওচিত্রে স্পষ্ট এরা ছাত্র নয়। এরা এ আন্দোলনের বন্ধুও নয়।
আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই হয়তো এদের আবির্ভাব। আক্রান্ত হয়েছে কিছু মিডিয়া হাউজও। বেশ কিছু থানাতেও হামলা হয়েছে। কিছু পুলিশ সদস্যকে হত্যাও করা হয়েছে। এটা নিন্দনীয় এবং মর্মান্তিক। এতে কেবল বিশৃঙ্খলাই তৈরি হবে।
পুলিশ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। নিশ্চয় কিছু কর্মকর্তা বাড়াবাড়ি করেছেন। কিছু সদস্য অপরাধও করেছেন। দেশে প্রচলিত আইন রয়েছে। যারা হত্যায় জড়িত তাদের বিচারের দাবি তোলেন, বিচারের ব্যবস্থা করেন। কিন্তু কারও আইন হাতে তুলে নেয়ার অধিকার নেই।
সংখ্যালঘু শব্দটি ব্যবহার বন্ধ করুন। আমরা সবাই দেশের নাগরিক। সবার অধিকার সমান। সংখ্যালঘু বলে একটি বিভেদ তৈরী করবেন না। রাষ্ট্রের নাগরিক সবার অধিকার সমান। সংখ্যালঘু বলে একটি পক্ষকে অপমান করার দুঃসাহস আর দেখবেন না। তারা আমাদের ভাইবোন আমাদের মতো তাদের অধিকার সমান। তারা আমাদের সহযোগী। সংখ্যালঘু বলে একটা রেখা টানবেন না।সবাই মিলে দেশ গঠনের মাধ্যমে যে নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করব।
ক্ষদ্র একটা উদাহরণ দিতে হয় ,বানিয়াচং থানায় আগুন দেওয়া হলে ভেতরে থাকা বেশ কিছু গাড়ি পুড়ে যায়। রাত দুইটার দিকে থানার দ্বিতীয় তলায় অবরুদ্ধ পুলিশ সদস্য ও নেতাদের উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাঁদের সেনাবাহিনীর গাড়িতে ওঠানোর সময় উপপরিদর্শক সন্তোষ দাশ চৌধুরীকে উপস্থিত লোকজন ছিনিয়ে নিয়ে সবার সামনে পিটিয়ে হত্যা করেন। পরে লাশ নিয়ে বানিয়াচং বড় বাজার শহীদ মিনারের মাঠে যাওয়া হয়। সেখান থেকে ভোররাতে লাশ থানার সামনে এনে ফেলে রাখা হয়। আজ সকাল ১০টার দিকে ক্ষুব্ধ লোকজন লাশ থানার সামনে একটি আকাশিগাছে ঝুলিয়ে রাখেন। দিনভর হাজারো মানুষ লাশ দেখতে থানা প্রাঙ্গণে ভিড় করেন। এদিকে গাছে লাশ ঝোলানোর খবর পেয়ে আজ বেলা দুইটায় সেনাবাহিনীর একটি দল ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধার করে।
বানিয়াচং উপজেলা সদরে দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘মানুষের সব ক্ষোভ ছিল ওই পুলিশ কর্মকর্তার ওপর। কারণ, তিনি চাকরি করার সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন। পাশাপাশি বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চালাতেন। এ ছাড়া এলাকার মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে তাঁর গোপন ব্যবসা ছিল। এ জন্য ক্ষুব্ধ লোকজন তাঁকে মেরেছেন।’‘মানুষের সব ক্ষোভ ছিল ওই পুলিশ কর্মকর্তার ওপর। কারণ, তিনি চাকরি করার সময় সাধারণ মানুষের সঙ্গে ক্ষমতার অপব্যবহার করেছিলেন। পাশাপাশি বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চালাতেন।
তিন দিনে ঢাকা মেডিকেলে ৬৯ লাশ
গত তিন দিনে শুধু ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই ৬৮ জনের মরদেহ আনা হয়েছে। এর মধ্যে গত রোববার ১১ জনের, গতকাল ৩৭ জনের এবং আজ আনা হয় ২১ জনের লাশ।
আজ যেসব লাশ এসেছে, তার মধ্যে একটি উত্তরা থেকে আনা পুলিশের পরিদর্শক রাশেদুল ইসলামের (৪৪)। তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। উত্তরা থেকে সুলতান (৩০) নামে গুলিবিদ্ধ এক ব্যক্তির লাশসহ অজ্ঞাতপরিচয় পরিচয় আরও তিনজনের গুলিবিদ্ধ লাশ আনা হয়। অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের বয়স আনুমানিক ৪০, ৩২, ৩৮ বছর।
এদিকে বিজিবি সদস্য আবদুল আলিম শেখের (৪৬) লাশ আজ আনা হয় গাজীপুর থেকে। পুলিশ সদস্য মনির হোসেনের (৪৫) লাশ আনা হয় পোস্তগোলা এলাকা থেকে। তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। সংসদ ভবন এলাকা থেকে আনা হয় পুলিশ সদস্য মাহফুজুর রহমানের (২৪) লাশ। যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে আনা হয় র্যাব সদস্য আনোয়ার হোসেন (৫৭) ও পুলিশ সদস্য সঞ্জয় কুমার দাসের (৩১) লাশ। আনোয়ারকে গুলি করে এবং সঞ্জয়কে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, গতকাল দুপুরে পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনায় অনেকেই হতাহত হন। পরে বিক্ষোভকারীরা যাত্রাবাড়ী থানায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে তারা থানার ভেতর ঢুকে পুলিশ সদস্যদের মারধর করে। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য হতাহত হন।
এ ছাড়া বাড্ডা থেকে আবদুল জব্বার (৩০) ও আশরাফুল (১৭), ডেমরা থেকে রোমান (১৭), বংশাল থেকে সাইফুদ্দিন (৬০), মিরপুর থেকে মো. রুবেল (১৮) ও অজ্ঞাতপরিচয় (৩০) এবং হাতিরঝিল থেকে শাহরিয়ার আলম রাব্বী (৩২) নামের এক ব্যক্তির গুলিবিদ্ধ লাশ আজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আনা হয়।
এদিকে গতকাল রাতে স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও মিটফোর্ড হাসপাতালে ২০ বছর বয়সী এক অজ্ঞাতপরিচয় তরুণের লাশ আসে। তাঁর লাশ আনা হয় বংশাল থেকে।
এদিকে নিরীহ পুলিশ সদস্যদের ওপর আক্রমণ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন বাংলাদেশ পুলিশের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. সোহেল রানা। তিনি বলেন, বাহিনী নয়, পুলিশের নেতৃত্বে সমস্যা। পুলিশ সদস্যদের মধ্যে দোষীরা শাস্তি পাবে। গতকাল মঙ্গলবার অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক মো. সোহেল রানা স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশের পক্ষ থেকে এ কথা বলা হয়। পুলিশও একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে উল্লেখ করে ওই বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এ মুহূর্তে দেশ ও জাতির মতো বাংলাদেশ পুলিশও একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। দৃশ্যত বাংলাদেশ পুলিশ এখন সম্পূর্ণরূপে নেতৃত্বহীন। অভিযুক্তরা গা ঢাকা দিয়েছে। জুনিয়র কর্মকর্তা ও সদস্যরা দিশেহারা। এরা সবাই নিরীহ সদস্য। সোহেল রানা বলেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে দেশের স্বার্থে রাষ্ট্রীয় একটি প্রতিষ্ঠান রক্ষার উদ্দেশে সকলের সহযোগিতা চাচ্ছি। শিগগির পুলিশের প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও নেতৃত্ব যথাযথভাবে সক্রিয় হবে বলে বিশ্বাস করি। ছাত্র-জনতার বিজয়ের ফল নতুন সরকার সাধারণ ছাত্র-জনতাকে হত্যায় অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারপূর্বক তাদের বিরুদ্ধে যথোচিত কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবে, আমি নিশ্চিত। তিনি আরও বলেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থার পাশাপাশি নিরীহ সদস্যদের পুরো উদ্যমে জনসেবায় ব্রত হওয়ারও সুযোগ দেওয়া উচিত।
পুলিশের স্থাপনা ও সম্পদ কেবল পুলিশের নয়, জনগণেরও। পুলিশসহ রাষ্ট্রীয় সকল সম্পদ ধ্বংস বা নষ্ট না করার অনুরোধ রইলো। সোহেল রানা বলেন, যে পুলিশ একাত্তরে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে আপনার পাশে দাঁড়াতে পেরেছে, যে পুলিশ করোনায় স্পষ্টতই মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে মানুষের পাশে ছিল, তাদের মধ্যে সীমাহীন ভালোটাও রয়েছে। আসুন ভালো মানুষকে টিকে থাকার ও ভালো গুণাবলী চর্চার সুযোগ করে দিই। মহান সৃষ্টিকর্তা চাইলে, নতুন প্রজন্মের নতুন আদর্শ নেতৃত্বে আমরা সেটা পারবো। নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করে আরও বলা হয়, জনসাধারণকে ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিজয়ের শুভেচ্ছা। এ আন্দোলনে যারা শাহাদাত বরণ করেছেন, তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
দেশ প্রেমিক ছাত্র জনতার গণঅভ্যূত্থানে স্বৈরাচার খুনি হাসিনা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে। দেশের মানুষ আজ স্বাধীনতার স্বাদ উপভোগ করছে। বিজয়ের আনন্দ উৎযাপন করছে। কিন্তু সুযোগ সন্ধ্যানীরা ওৎ পেতে আছে। তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের পায়তারা করছে। বিভিন্ন ধর্মীয় স্থাপনায় বিশেষ করে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের মন্দিরে হামলা, তাদের বাড়ি-ঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এ জন্য আমাদের সকলকে সজাগ থাকতে হবে। কেউ যেন এ ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে। আমাদের সকলকে পাহাড়াদারের ভূমিকা পালন করতে হবে। কারণ এই দেশ মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সকলের। সকলে মিলে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির মাধ্যমে দেশটাকে এগিয়ে নিতে হবে।