দেশে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে বিচারক নিয়োগের ক্ষেত্রে নীতিমালা প্রণয়নসহ ১১ দফা দাবি জানিয়েছে অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ফোরাম নামে একটি সংগঠন। স্বাধীন ও শক্তিশালী বিচার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে বিচার বিভাগের জন্য আলাদা সচিবালয় এবং সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনসহ এই ১১ দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়নের আহ্বানও জানিয়েছেন সাবেক বিচারকরা। মঙ্গলবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির নসরুল হামিদ মিলনায়তনে ‘বিচার বিভাগ পুনর্গঠন ও সংস্কার প্রস্তাব’ শিরোনামে এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি করেন সংগঠনের নেতারা।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ড. আবুল হোসেন খন্দকারের সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন অবসরপ্রাপ্ত বিচারক মো. ফিরোজ আলম। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত অবসরপ্রাপ্ত বিচারকরা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় প্রদানকারী সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হককে জনতার আদালতে বিচারের দাবিও জানান।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারক ফোরামের ১১ দফা দাবিতে রয়েছে: বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা নিশ্চিত ও দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় আইনের সংশোধন করতে হবে, সংবিধানের ১১৬ অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিচারকদের স্বাধীন করতে হবে, বিচারকদের নিয়োগ, পদোন্নতিসহ যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনার নীতিমালা প্রণয়ন ও অন্যান্য কার্যাদি সম্পন্ন করার জন্য বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের অধীনে আলাদা সচিবালয় গঠন করতে হবে, মাসদার হোসেন মামলায় দেয়া বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের রায়ের পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে হবে, ভবিষ্যতে স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা বিলুপ্তি এবং সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সংবিধানের আমূল সংস্করণ করতে হবে। সুপ্রিম কোর্টের উভয় বিভাগে বিচারপতি নিয়োগের ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
এ ছাড়া যেসব বিচারক আচরণবিধি লঙ্ঘন করে স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাদের ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য প্রকাশ্যে সরকারকে সমর্থন করে ন্যায়বিচারের পরিপন্থি কাজ করেছে, জামিনযোগ্য মামলায় জামিন না দিয়ে শত সহস্র নিষ্পাপ মানুষকে কারাগারে পাঠিয়েছে, রিমান্ড আদেশ দিয়ে হয়রানি ও নির্যাতনের সুযোগ করে দিয়েছে এবং ফরমায়েশি রায় দিয়ে শাস্তি দিয়েছে তাদেরকে চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
বিচারিক আদালতের সকল স্তরে গুরত্বপূর্ণ পদে থাকা ন্যায়বিচার পরিপন্থি স্বৈরাচারী সরকারের পক্ষে কাজ করা বিচারকদের বদলি করে সৎ ও নিরপেক্ষ বিচারকদের পদায়ন করতে হবে, সুপ্রিম কোর্টের বর্তমান রেজিস্ট্রার জেনারেলসহ সব বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং আইন মন্ত্রণালয়ে কর্মরত স্বৈরাচারী সরকারের সহযোগী বিশেষ করে আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব গোলাম সারওয়ার, যুগ্ম সচিব বিকাশ কুমার সাহা ও শেখ গোলাম মাহবুব, মাহাবুবুর রহমান সরকার (বর্তমানে জেলা জজ, নরসিংদী), এ.এইচ.এম. হাবিবুর রহমান জিন্নাহ (সদস্য, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল), শহিদুল আলম ঝিনুকসহ (তথ্য কমিশনার ও সাবেক আই.জি.আর) সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সব কর্মকর্তাকে দ্রুত অপসারণ করে সৎ, যোগ্য ও নিরপেক্ষ কর্মকর্তা নিয়োগ করতে হবে।
চুক্তিভিক্তিক বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়োগ বাতিল করে সেখানে যোগ্য ও নিরপেক্ষ অবসর প্রাপ্ত বিচারবিভাগীয় কর্মকর্তাদের নিয়োগ দিতে হবে, উচ্চ আদালতে কর্মরত বিচারপতিদের যারা শপথ ভঙ্গ করে, আচরণ বিধি লঙ্ঘন করে বিদায়ী স্বৈরশাসককে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন, যাদের কারণে বিচার বিভাগ আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, তাদেরকে অপসারণ করে বিচারের আওতায় আনতে হবে, আপিল বিভাগে কর্মরত যেসব বিচারপতি আচরণ বিধি লঙ্ঘন করে শপথ ভঙ্গ করে রাজনৈতিক বক্তব্য দেয়ার পাশাপাশি স্বৈরশাসককে তাদের অপকর্মে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদেরকেও বিচারের আওতায় আনতে হবে।
বিচারক ড. সাজ্জাদ হোসেন বাবু বলেন, আইন মন্ত্রণালয়ের সচিবের নির্দেশনার আলোকে আদেশ না দেয়ায় আমাকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। বিচারকরা কি আদেশ দেবেন তার সবকিছুই আইন মন্ত্রণালয় থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। স্বৈরাচার সরকারের গোড়াপত্তন করেছিলেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে এই নৈরাজ্য সৃষ্টি করার সুযোগ দিয়েছেন। এজন্য তাকে জনতার আদালতে এনে বিচার করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এ বি এম খায়রুল , ফাইল ছবি
সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক নিজের রায়েই বলেছিলেন, অবসর গ্রহণের পর কোনো বিচারপতি প্রজাতন্ত্রের লাভজনক পদ গ্রহণ করতে পারেন না। অথচ তিনি সেই আদেশ লঙ্ঘন করে নিজেই রাষ্ট্রের একটি লাভজনক পদ গ্রহণ করেন।বিচারপতি খায়রুল হক ষোড়শ সংশোধনী বাতিল রায়ের সমালোচনা করে বলেছেন, এতে অতি মাত্রায় অপ্রাসঙ্গিক কথা বলা হয়েছে- যার কোনো প্রয়োজন ছিল না। এ রায় পূর্বপরিকল্পিত। তার এ বক্তব্য প্রসঙ্গে অনেকে প্রশ্ন তুলছেন, তাহলে মুন সিনেমা হলের মালিকানা সংক্রান্ত একটি দেওয়ানি মামলার রায় দিতে গিয়ে তিনি কীভাবে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করার মতো গুরুতর ঘটনা ঘটালেন?। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত তাঁর দেয়া রায়টি তেমনিভাবে পূর্বধারণাপ্রসূত কি না- সে প্রশ্নও উঠেছে। অথচ ষোড়শ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারপতিগণ সংসদসহ সংশ্লিষ্ট জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর বিষয়সমূহের প্রসঙ্গই উল্লেখ করেছেন।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণার এক সপ্তাহ পর বিচারপতি খায়রুল হক অবসরে যান। অবসরের দীর্ঘ সোয়া এক বছর পর তিনি পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন। এর ফলে বিচারপতি খায়রুলের দেয়া পূর্ণাঙ্গ রায় তার নৈতিক অবস্থান হারিয়ে ফেলে।বিচারপতি খায়রুল হক তাঁর তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত রায়ে আরো দু’টি মেয়াদে এই ব্যবস্থা অব্যাহত রাখার কথা বলেন। এরপর তাঁর অবসরে যাওয়ার পরে এবং পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের আগেই ক্ষমতাসীন দল যখন এই রায়ের স্পিরিট উপেক্ষা করে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত করে সংশোধনী বিল সংসদে পাস করে। সেই সময়ে অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি কোন শব্দই উচ্চারণ করেননি। আর অবসরে যাওয়ার ১৬ মাস পরে লিখিত বিস্তারিত রায়ে তত্ত্বাবধায়কের বিষয়টি একেবারে তুলে দেয়াকেও ‘অনৈতিক’ আখ্যায়িত করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য -সবচেয়ে বিতর্কিত সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক। ২০১৩ সালে সরকার তিন বছরের জন্য সাবেক এ প্রধান বিচারপতিকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেয়। তারপর থেকে তিন মেয়াদে তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করেন।
আইন কমিশনের চেয়ারম্যান সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক পদত্যাগ করেছেন। প্রধান উপদেষ্টা বরাবর আজ মঙ্গলবার তিনি পদত্যাগপত্র দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
দেশের ১৯তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে ২০১০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পান এ বি এম খায়রুল হক। একই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে তাঁর নিয়োগ কার্যকর হয়। পরের বছরের ১৭ মে তিনি অবসরে যান।
আরেক প্রধান বিচারপতি নানা বিষয়ে বিতর্কিত। তৎকালীন ফারমার্স ব্যাংক (বর্তমানে পদ্মা ব্যাংক) থেকে চার কোটি টাকা ঋণ নিয়ে আত্মসাতের মামলায় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ ১১ জন আসামির আটজনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে।
২০১৯ সালের ১০ জুলাই এস কে সিনহাসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। মামলার বাদী দুদকের পরিচালক সৈয়দ ইকবাল হোসেন।
যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল নিয়ে স্কাইপি কেলেঙ্কারিতে জানা যায় পদোন্নতির জন্য কে কি কাজ করছেন। তাদের বিচারিক কার্যক্রম নিয়ে ও দেশি ও বিদেশী মহলে প্রচুর বিতর্ক রয়েছে।