• ১৭ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ , ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ , ২৯শে শাওয়াল, ১৪৪৭ হিজরি

বহুল বিতর্কিত সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক আইন কমিশন থেকে পদত্যাগ , বিচারের মুখোমুখি হতে হবে ?

usbnews
প্রকাশিত আগস্ট ১৪, ২০২৪
বহুল বিতর্কিত সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক আইন কমিশন থেকে পদত্যাগ , বিচারের মুখোমুখি হতে হবে ?
নিউজটি শেয়ার করুনঃ

আইন কমিশনের চেয়ারম্যানের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক।মঙ্গলবার (১৩ আগস্ট) রাতে তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তা পদত্যাগের বিষয়টি সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেন।

২০১৩ সালের ২৪ জুলাই প্রথমবারের মতো তিন বছরের জন্য আইন কমিশনের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ পান খায়রুল হক। এরপর ২০১৬ সালে মেয়াদ শেষে মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানো হয়। এরপর ২০২২ সালের ২৭ অক্টোবর তাকে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান পদে পুনর্নিয়োগ দিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ থেকে আদেশ জারি করা হয়।

এবিএম খায়রুল হক ১৯৪৪ সালের ১৮ মে মাদারীপুরের রাজৈর থানার আড়াইপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে স্নাতক পাস করেন। লন্ডন থেকে ১৯৭৫ সালে বার-এট-ল ডিগ্রি লাভ করেন। এরপর তিনি ১৯৭৬ সালে হাইকোর্ট বিভাগে এবং ১৯৮২ সালে আপিল বিভাগে আইনজীবী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হন।

১৯৯৮ সালের ২৭ এপ্রিল তিনি হাইকোর্টের অস্থায়ী বিচারপতি এবং ২০০০ সালের ২৬ এপ্রিল হাইকোর্ট বিভাগের স্থায়ী বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান। ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই আপিল বিভাগের বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পান এবিএম খায়রুল হক।

 

A K M Wahiduzzaman: এ বি এম খায়রুল হক আদলত অবমাননার মাধ্যমে শাস্তিযোগ্য  অপরাধ করেছেন

তিনি প্রধান বিচারপতি থাকাকালে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের মাধ্যমে সাংবিধানিক শূন্যতার সূচনা হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে করা পঞ্চম সংশোধনী বাতিল, সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের করা সপ্তম সংশোধনী বাতিল, বঙ্গবন্ধুকে স্বাধীনতার ঘোষক স্বীকৃতি, নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অপসারণের সরকারি আদেশকে বৈধতা দেয়া, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে সেনানিবাসের বাড়ি থেকে উচ্ছেদ করা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি নিয়ে দায়ের করা লিভ টু আপিল না শুনেই উত্থাপিত হয়নি মর্মে খারিজ করে দেয়া এবং দৈনিক আমার দেশের সম্পাদককে সাজা দেয়ার আদেশ আসে।

চার-তিনে বিভক্ত রায়ে ‘তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা’ বিলুপ্ত : ২০১১ সালের ১০ মে ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে রায় দেয়ার সময় প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ছিলেন বিচারপতি খায়রুল হক। রায় প্রদানকারী বাকি ৬ জন বিচারপতির মধ্যে ৩ জন তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন। ৩ জন দেন ভিন্নমত। রায়ে এই ব্যবস্থার আওতায় পরবর্তী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলে মত দেয়া হয়। ওই সময় সংক্ষিপ্ত রায়ে সর্বোচ্চ আদালত বলে, বিদায়ী প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের বিচারপতিদের বাদ রেখে সংসদ এ সরকার পদ্ধতি সংস্কার করতে পারে।

বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের লেখা রায়ের সঙ্গে একমত হন তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি এস কে সিনহা ও বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন। এই রায়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা। তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। তবে বিচারপতি মো. ইমান আলী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে বা বিপক্ষে মত না দিয়ে বিষয়টি জাতীয় সংসদের ওপর ছেড়ে দেন। অর্থাৎ এই রায়টির পক্ষে ৪ জন এবং বিপক্ষে ৩ জন অভিমত দেন। এটি সর্বসম্মত ছিল না, বরং ছিল বিভক্ত রায়। ন্যূনতম সংখ্যাগরিষ্ঠতায় এটি গৃহীত হয়। পরে ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১২ তারিখে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করা হয়। এতে বিচারপতিদের মতভিন্নতায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায়। তবে, আগামী দুই মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যেতে পারে বলে সাবেক প্রধান বিচারপতি খায়রুল হকের রায়ে যে অভিমত ছিল, পূর্ণাঙ্গ রায়ে তা বহাল থাকে। বিপক্ষে মত প্রদানকারী দুজন বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা ও নাজমুন আরা সুলতানার দৃষ্টিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানসম্মত, গণতান্ত্রিক এবং সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয়।

 

‘খায়রুল হককেও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে’

‘অবসরের ১৬ মাস পর রায় লিখে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। এই গুরুতর অপরাধের জন্য একদিন বাংলাদেশের মাটিতে তাকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।’

 

১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬  জাতীয় প্রেসক্লাবের ভিআইপি লাউঞ্জে ‘অবসরের পর রায় লেখা বিচার ব্যবস্থা এবং গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত’-শীর্ষক এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে   বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেছেন, ‘অবসরের ১৬ মাস পর রায় লিখে সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন। এই গুরুতর অপরাধের জন্য একদিন বাংলাদেশের মাটিতে তাকে অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে।’

‘খায়রুল হককেও বিচারের মুখোমুখি হতে হবে’
মওদুদ আহমদ বলেন, তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক ত্রয়োদশ সংশোধনীর ওপর ২০১১ সালের ১০ মে শর্ট অর্ডার (সংক্ষিপ্ত রায়) দেন। ওই সংক্ষিপ্ত রায়ে তিনি বলেছিলেন, ‘পরবর্তী দশম ও একাদশ সংসদের নির্বাচন জাতীয় স্বার্থে এবং জনগণের কল্যাণের জন্য ত্রয়োদশ সংশোধনীতে দেয়া একটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে পারে।’

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, এবিএম খায়রুল হক ত্রয়োদশ সংশোধনীর ওপর যে রায় দেন তাতে সুপ্রিমকোর্টের ৭ জন বিচারপতির মধ্যে ৩জন বিচারপতি একমত হন নাই। এই বিষয়ে শুনানিকালে (তৎকালীন) প্রধান বিচারপতি যে ৮জন সিনিয়র আইনজীবীর (অ্যামিকাস কিউরি) মতামত নিয়েছিলেন তার মধ্যে ৭ জনই নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে সংবিধান সম্মত বলে মতামত দিয়েছিলেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির এ সদস্য বলেন, সংক্ষিপ্ত রায় দেয়ার ৭ দিনের মাথায় অর্থাৎ ২০১১ সালের ১৭ মে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক অবসরে চলে যান। অবসরে যাওয়ার ১৬ মাস পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ রায় ঘোষণা করেন তিনি। কিন্তু পূর্ণাঙ্গ রায়ের আদেশে বিচারপতি আগেকার ঘোষণার ওই অংশটি সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়ে দিলেন। একজন প্রধান বিচারপতি কিভাবে তার নিজের ঘোষিত রায়ের পরিবর্তন করে দিতে পারেন?

এ প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘এই রায়ের (পূর্ণাঙ্গ) মাধ্যমে বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক শুধু সংবিধানই লঙ্ঘন করেন নাই, তিনি দেশের প্রধান বিচারপতি হয়ে একটি চরম অনৈতিকতার পরিচয় দিয়েছেন। একটি হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য শুধু নিজের বিবেককেই নয় সারা জাতিকে প্রতারিত করেছেন। একদিন বাংলাদেশের মাটিতে এই গুরুতর অপরাধের জন্য অবশ্যই তাকে বিচারের সম্মুখীন হতে হবে।

মওদুদ আহমদ বলেন, ‘অবসরে যাওয়ার পর কোনো বিচারকের রায় লেখার এখতিয়ার আছে কি না-সেই বিষয়ে একটি গুরুতর সাংবিধানিক প্রশ্ন উঠে এসেছে, যা বর্তমান প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা তার প্রধান বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এক বক্তব্যে এই কথা বলেছেন।’

বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘সরকার বিএনপি তথা বিরোধী দলকে নিশ্চিহ্ন করতে চায়। এজন্য তারা নানা ষড়যন্ত্র করছে। তাই আমাদের জোটের মধ্যে, নিজেদের মধ্যে ঐক্য অটুট রাখতে হবে। আমাদের মধ্যে যেন কোনো বিভেদের সুর না থাকে। ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে।

প্রধান বিচারপতি থাকাকালে ২০১১ সালের ৩০শে জুন সংবিধানের ১৫তম সংশোধনী বাতিল করে রায় দিয়েছিলেন বিচারপতি খায়রুল হক। এই রায়ের মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হয়ে যায় বলে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বলা হয়। এরপর দুটি নির্বাচন হয়েছে কার্যত ক্ষমতাসীন দলের অধীনে। এই কারণে চলমান রাজনৈতিক সংকট ঘনীভূত হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।
গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়া বা এর সঙ্গে জড়িত এমন ব্যক্তিদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম ধাপের ভিসা নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হওয়ার পর বিচারপতি খায়রুল হকের নামও আসছে নানা মাধ্যমে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কারা ভিসা নিষেধাজ্ঞায় পড়েছেন তা প্রকাশ করা হয়নি।

‘খায়রুল হকের কারণে মানুষ ভোটাধিকার হারিয়েছেন’

suprim

১০ আগস্ট ২০১৭ সালে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির তৎকালীন সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বলেছিলেন , তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে খায়রুল হকের দেয়া ত্রয়োদশ সংশোধনী রায়ের মাধ্যমে দেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে দেশের মানুষ তাদের ভোটের অধিকার হারিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার দুপুরে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির শহীদ শফিউর রহমান মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলেনে তিনি এ মন্তব্য করেন । ষোড়শ সংশোধনীর রায়কে পূর্ব ধারণাপ্রসূত বলে বুধবার সংবাদ সম্মেলনে খায়রুল হক যে বক্তব্য দিয়েছেন সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের এ নেতা বলেন, তাহলে কি ত্রয়োদশ সংশোধনীর রায়ও পূর্ব ধারণাপ্রসূত?

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় নিয়ে আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি খায়রুল হকসহ বিভিন্ন মহলের প্রতিক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া জানাতে সংবাদ সম্মেলন করে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি।

বিচারপতি খায়রুল হক সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন: খোকন

   ১৭ মাস পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় দিয়ে বিচারপতি খায়রুল হক সংবিধান লঙ্ঘন করেছেন বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন।  ২২ জানুয়ারি, ২০১৬  জয়পুরহাট শহরের স্টেশন রোডে দলীয় কার্যালয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ৮০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনায় খোকন এ মন্তব্য করেন। মাহাবুব উদ্দিন খোকন  বলেন, বিচারপতি খায়রুল হক জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। তাঁর বিচার হওয়া উচিত বলে অমি মনে করি।

 

বিচারপতি খায়রুল হককে আজীবন জেলে দেখতে চেয়েছিলেন  জাফরুল্লাহ

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে রায় দেওয়ায় বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের বিচার চেয়েছিলেন গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

তিনি বলেছেন, ‘একজন মানুষ খুন করলে তার ফাঁসি হয়, যাবজ্জীবন হয়। কেউ গণতন্ত্র হত্যা করলে, গণতন্ত্রকে কবরস্থ করলে তার কী শাস্তি হওয়া উচিত? সেই ব্যক্তি বিচারপতি খায়রুল হক। প্রকাশ্যে তার বিচার হওয়া উচিত। সে জাতিকে ধ্বংস করে দিয়েছে। তাকে আজীবন জেলখানায় দেখতে চাই। এখান থেকে দেশকে ফিরিয়ে আনতে হবে।’

০৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, রাজধানীর নয়াপল্টনে ‘রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে পেশাজীবীদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন।

পেশাজীবীদের উদ্দেশে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, পেশাজীবীদের আওয়াজ উঠাতে হবে। এই অনাচার-অত্যাচার আমরা আর সহ্য করব না। জীবনের শেষ ক্ষণে থাকলেও আমরা ভীত নই। আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি।

 

উচ্চ আদালতে যা ঘটেছিল : দেশের সর্বোচ্চ আদালতে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিলের বিষয়ে কার্যক্রম শুরু হলে সেখানেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে সর্বসম্মত মত মেলেনি। উচ্চ আদালতের ৭ জন বিচারপতির মধ্যে ৪ জন বিচারপতি তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিলের পক্ষে রায় দেন এবং ৩ জন ভিন্নমত পোষণ করেন। নিয়ম অনুযায়ী সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারপতির রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল বলে ঘোষিত হয়। তবে বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিঞার অভিমতে বলা হয়, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার (ত্রয়োদশ সংশোধনী) সংবিধান পরিপন্থী বলে ঘোষণা করা হলে নিশ্চিতভাবেই দেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে। এই সংশোধনী সাংবিধানিক অপরিহার্যতা।’ প্রধান বিচারপতি ও তার সঙ্গে সহমত পোষণকারী অপর তিন বিচারপতির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে বিচারপতি আবদুল ওয়াহাব মিঞা ১৭৮ পৃষ্ঠার অভিমত দেন। এতে বলা হয়, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার (ত্রয়োদশ সংশোধনী) সংবিধান পরিপন্থী বলে ঘোষণা করা হলে নিশ্চিতভাবেই দেশে রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে, যেমনটি হয়েছিল ১৯৯৬ সালে। এর ফলে দেশের অর্থনীতির ওপর প্রভাব পড়বে, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক রাজনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশ এগিয়ে যাওয়ার পরিবর্তে পেছনে চলতে শুরু করবে। গত তিনটি সাধারণ নির্বাচনে এই ব্যবস্থা মানুষ ব্যাপকভাবে গ্রহণ করেছে। নির্দলীয় সরকারের অধীনেই তিনটি সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।’ বিচারপতি ওয়াহাবের অভিমতের সঙ্গে বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা একমত পোষণ করেন। আর বিচারপতি মো. ইমান আলী বিষয়টি সংসদের উপর ছেড়ে দেন।

এই মামলার শুনানিতে সুপ্রিমকোর্টের ৮ জন সিনিয়র আইনজীবীকে এ্যমিকাস কিউরি (আদালতের আইনি সহায়তাকারী) নিযুক্ত করা হয়। এরা হলেন, সাবেক বিচারপতি টি.এইচ খান, সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন, সাবেক এ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার রফিক-উল হক, সাবেক এ্যাটর্নি জেনারেল মাহমুদুল ইসলাম, সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. এম জহির, ব্যারিস্টার আমীর উল ইসলাম, ব্যারিস্টার রোকনউদ্দীন মাহমুদ এবং ব্যারিস্টার আজমালুল হক কিউসি। এছাও সরকার পক্ষে ছিলেন এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। একমাত্র  ব্যারিস্টার আজমালুল হক ছাড়া অন্য সকলেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পক্ষে আইনি ও সাংবিধানিক ব্যাখ্যা আদালতের সামনে উপস্থাপন করেন। সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি বা বিচার বিভাগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে জড়ানোর বিষয়ে তাদের কারো কারো আপত্তি ছিল। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ধারণার সঙ্গে তাদের কোনো দ্বিমত বা আপত্তি ছিল না। এমনকি তাদের কেউ কেউ আপিল বিভাগের শুনানিতে বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলে দেশে রাজনৈতিক বিরোধ চরম আকার ধারণ করবে। এতে যে কোনো সময় রাজনৈতিক প্রলয়ও ঘটে যেতে পারে। আর এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে যুক্তিপূর্ণ অভিমত তুলে ধরে বলেন, ‘অনির্বাচিত লোক গণতন্ত্রের চর্চা করলে গণতন্ত্রের স্পিরিট নষ্ট হবে, এটা ঠিক নয়।’ আপিল বিভাগের সাত সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চে নবম দিনের শুনানিতে এ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘জাতির একটি সন্ধিক্ষণে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী আনা হয়। বিতর্কমুক্ত একটি ভোটার তালিকা তৈরি, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং সর্বোপরি গণতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখার জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমাদের প্রজাতন্ত্রের ধারাবাহিকতাকে নষ্ট করছে বলে যে অভিযোগ করা হচ্ছে তা সঠিক নয়। যারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অবৈধ বলে মন্তব্য করছে, আমি তাদের সাথে দ্বিমত পোষণ করি।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের ঐতিহাসিক প্রয়োজনেই এটা করা জরুরি ছিল। কাজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা খারাপ নয়। তবে কিছু লোকের কারণে এটা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির রদবদল করতে হলে তা সংসদ করবে।’ এমনকি আপিল আবেদনকারী আবদুল মান্নান রায় তাঁর পক্ষে যাওয়ায় খুশি হলেও রায়ের দ্বিতীয় অংশ উল্লেখ করে বলেন, ‘দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচন এ পদ্ধতিতে হবে।’

বিপুল ঐকমত্য উপেক্ষা : শুরু থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির অবস্থান পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বরাবরই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার প্রতি বিপুল ঐকমত্য সাধিত হয়েছে। কি রাজনৈতিক, কি আইনগত আর কি বুদ্ধিবৃত্তিক- সকল দিক দিয়েই এর প্রতি বিপুল জনসমর্থন বিদ্যমান। রাজনৈতিকভাবে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালে দেশে একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দলমত নির্বিশেষে একটি রাজনৈতিক ঐক্য গড়ে উঠেছিল। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট, জামায়াতসহ ইসলামপন্থী দলসমূহ, এরশাদের জাতীয় পার্টি প্রভৃতি সকল দল এই ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজপথের বিপুল আন্দোলনসহ সর্বময় কর্মকা- চালিয়েছে। এর ফলে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপিও এর সঙ্গে একাত্ম হয়ে সংসদে আইন প্রণয়নে উদ্যোগী হয়েছে। ফলে এই ব্যবস্থার বিপক্ষে কথা বলার কোন সুযোগ অবশিষ্ট ছিল না।

অন্যদিকে দেশের শীর্ষ আইনবিদরাও এর পক্ষে একমত রয়েছেন। দেখা যায়, তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা সম্বলিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে জনৈক আইনজীবী ১৯৯৮ সালে হাইকোর্টে রিট করলে এর প্রেক্ষিতে চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট হাইকোর্টের তিন বিচারপতির বিশেষ বেঞ্চ রায় দেন। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীকে বৈধ ঘোষণা করে এই রায়ে বলা হয়, ‘১৯৯৬ সালের ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানসম্মত।’ এই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলে আপিলকারী ও রাষ্ট্রপক্ষ ছাড়াও শুনানিতে এ্যামিকাস কিউরি (আদালতের আইনি সহায়তাকারী) হিসেবে শীর্ষস্থানীয় আটজনের মধ্যে ৭ জনই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত দেন। কেবল আজমালুল হোসেন কিউসি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং এটা সংবিধানের মৌল কাঠামোর পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন। এমনকি শুনানীকালে সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলমও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে বক্তব্য প্রদান করেন।

রায়ের এই অবস্থানের বিষয়ে পর্যবেক্ষকরা মনে করেন, হাইকোর্ট ও আপিল বিভাগের সংখ্যাগরিষ্ঠ বিচারক এবং এ্যামিকাস কিউরিদের ৮ জনের মধ্যে ৭ জন এবং এ্যাটর্নি জেনারেল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার পক্ষে ছিলেন। এছাড়াও গত এপ্রিল-মে-২০১১ মাসে সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত সংসদীয় কমিটির উদ্যোগে যে সংলাপের আয়োজন করা হয় সেখানেও রাজনৈতিক নেতা, আইনবিদ, অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক, পেশাজীবী প্রভৃতিসহ প্রায় সকলের পক্ষ থেকেই একবাক্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল রাখার পক্ষে মত ব্যক্ত করা হয়। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীও সংশোধিত আকারে এর পক্ষে বক্তব্য দেন। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের আংশিক রায় ঘোষণার পর এই রায়ের প্রথম অংশকে পুঁজি করে পুরো ব্যবস্থাই সংবিধান থেকে তুলে দেয়া হয়। এমনকি এই সংশোধনী সংসদে পাশ করতে গিয়েও নানান নাটকের আশ্রয় নিতে হয়েছিল। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এখন ক্ষমতা পেয়ে এই ব্যবস্থাকে সংবিধান থেকে উচ্ছেদ করা বিপুল জনমতের সঙ্গে যুদ্ধ করারই শামিল হবে। একটি জনমত জরিপেও উল্লেখ করা হয়, “নির্দলীয় সরকারের পক্ষে রয়েছেন দেশের ৮২ ভাগ মানুষ।”

সংবিধান সংশোধনী কমিটির সদস্যরা যা বলেছিলেন: ২০১০ সালের ২১ জুলাই প্রথম ১৫ জন সদস্য নিয়ে সংবিধান সংশোধনী কমিটি গঠন করা হয়। তারা ২৭টি বৈঠক করেন। বৈঠক শেষে ২০১১ সালের ২৯ মার্চ বিদ্যমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অপরিবর্তিত রাখার সুপারিশ করা হয়। সংবিধান সংশোধনী কমিটির সদস্য (সেসময় এঁরা মন্ত্রী ছিলেন) তোফায়েল আহমেদ বলেছিলেন, “এটা সেটল ইস্যু, এটা পরিবর্তন করার দরকার নেই।” আমির হোসেন আমু বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকার যেভাবে আছে সেভাবেই রাখা উচিত।” রাশেদ খান মেনন বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক পরিবর্তনের দরকার নেই।” ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বলেন, “সংবিধানে তিন মাস নির্দিষ্ট করে দেয়া যেতে পারে।” শিরীন শারমিন (বর্তমান স্পিকার) বলেছিলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সংশোধনের দরকার নেই।” সাবেক মন্ত্রী এ্যাডভোকেট আবদুল মতিন খসরু বলেন, “এমন কিছু করা ঠিক হবে না যা বিতর্ক সৃষ্টি করে।” কমিটির কো-চেয়ারম্যান সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও  বলেন, “তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করার দরকার নেই।”