র্যাট হোল মাইনার্স ঝুঁকিপূর্ণই পদ্ধতি , উদ্ধারের সাফল্য এবং সাম্মানি পুরস্কার না নিয়ে দিয়ে দিলেন যাদের উদ্ধার করেছিল তাদের।
শেষ পর্যায়ে অসাধ্যসাধন করেন র্যাট হোল মাইনার্সরা। যখন অ্যামেরিকা থেকে আনা যন্ত্র ভেঙে পড়ে, তখন এই র্যাট হোল মাইনার্সদের কাজে লাগানো হয়। তারা শাবল, গাঁইতি দিয়ে কাজ শুরু করেন। তারাই শেষ ১০-১২ মিটার খননের কাজটা করেন ২৪ ঘণ্টারও কম সময়ে। ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে তাঁরা কাজ এগিয়েছেন। একজন খোঁড়ার কাজ করেছেন। আর একজন সেই ধ্বংসস্তূপ সংগ্রহ করেছেন। তৃতীয়জন চাকা লাগানো গাড়িতে তা তুলে দিয়েছেন। এভাবে পালা করে তাঁরা এগিয়েছেন। অক্সিজেনের জন্য তাঁদের সঙ্গে ছিল ব্লোয়ার।
১৭ দিনের অত্যাধুনিক যন্ত্রের ব্যর্থ প্রয়াস। মেশিন যা পারেনি তা করে দেখিয়েছিলেন মুন্না কুরেশি ও তাঁর ১১ সঙ্গী। ৪০০ ঘণ্টা পার করে যখন নিশ্চিত মৃত্যুর কথা ভেবে নিয়েছিলেন ঠিক তখন ‘আল্লাহর ফেরেশতা’-র মতো ৪১ জন শ্রমিক’কে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছিল ‘র্যাট হোল মাইনার্সরা। মাত্র ১৫ মিনিটের ব্যবধানে আটকে থাকা শ্রমিকদের সুড়ঙ্গ থেকে বাইরে বের করে আনেন তাঁরা। নিজেদের প্রাণের ঝুঁকি রেখেও অন্যের প্রাণ বাঁচাতে ঝাঁপিয়ে পড়েন কামাল , ওয়াকিল হাসান , মুন্না কুরেশির টিম।
ভারতের উত্তরাখণ্ডের উত্তরকাশীর সুড়ঙ্গ থেকে ৪১ জন শ্রমিকদের উদ্ধার করে উদ্ধারকারী দল। আর এই অসম্ভব কঠিন উদ্ধার কাজের পিছনে বড় ভূমিকা নেন র্যাট হোল মাইনার্স-রা। কয়েক কোটি টাকার অত্যাধুনিক মেশিন যেখানে ব্যর্থ হয়, বড় ইঞ্জিনিয়রা যেখানে কার্যত হাল ছাড় দেন, সেখান থেকেই র্যাট হোল মাইনার্স-রা বাজিমাত করেন। এই র্যাট হোল মাইনার্স-দের কয়েকজন দিল্লির পানি বোর্ডে কাজ করেন।
‘র্যাট হোল মাইনার্স দলের ওয়াকিল হাসান বললেন, ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করেছি সেটাই বড় এবং যারা আটকে ছিল তাদের খুশি দেখতে পেরে আমরা খুশি। স্বস্তির হাসি, নতুন জীবন ফিরে পাওয়ার হাসি।
র্যাট হোল মাইনার্সদের কামাল আরেক বীর। তিনি মিডিয়াকে জানালেন , আমরা আগেও গর্ত খুঁড়েছি, আজও খুঁড়ছি, প্রয়োজন পরলে ভবিষ্যতেও এই কাজ করব।
তাঁরা বলেন, “আমরা মুখ্যমন্ত্রীকে সম্মান করি। তবে এই টাকায় আমাদের কিছু হবে না। এটা নায্য নয়। আমরা যে কোনও মুহূর্তে মারা যেতে পারতাম। নিজেদের জীবন বাজি রেখে আটক শ্রমিকদের উদ্ধার করে এনেছিলাম। মৃত্যু নিশ্চিত জেনেও শেষ চেষ্টা করেছিলাম। একটা প্রাণ ৫০ হাজার টাকা বিক্রি হতে পারে না। আমরা আগেও গর্ত খুঁড়েছি, আজও খুঁড়ছি, প্রয়োজন পরলে ভবিষ্যতেও এই কাজ করব। আমাদের এই ত্যাগ’কে টাকা দিয়ে মূল্যায়ন করবেন না। তাই এই ‘সম্মান’ উদ্ধার হওয়া থাকা শ্রমিকদেরই দেওয়া হোক।
হার মেনেছিল যন্ত্র…
শেষ মুহূর্তে কাজে আসেনি কোনও অত্যাধুনিক সরঞ্জাম। উত্তরকাশীর সিল্কয়ারা-বারকোট সুড়ঙ্গে আটকে থাকা শ্রমিকদের উদ্ধারে শেষ পর্যন্ত কাজে এসেছে, ‘র্যাট হোল মাইনিং’ পদ্ধতি। শুক্রবার, পরিস্থিতি যখন নাগালের বাইরে চলে যায়, তখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় উদ্ধার কাজে পাথর কাটার শ্রমিকদের আনা হবে। যাকে বলে, র্যাট হোল মাইনিং, মানে ইঁদুরের মতো গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে এগোনো। এই ‘র্যাট হোল মাইনিং’ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ! এই পদ্ধতিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে ন্য়াশনাল গ্রিন ট্রাইবুনাল। উত্তরপ্রদেশ এবং দিল্লি থেকে এয়ারলিফট করে ১২ জন র্যাট হোল মাইনার্সকে আনা হয়।সোমবার দুপুর তিনটে থেকে তাঁরা কাজ শুরু করেন। আর তার, ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই চলে এল সাফল্য। র্যাট হোল মাইনার্সের সদস্য ওয়াকিল হাসান বললেন, ‘ইঁদুর যেমন মাটি কাটে, পিছনে ফেলে দেয়, আমরাও তেমনই করছিলাম।’ প্রায় ৪৮ মিটার খননের পর, বার বার যে বাধার সম্মুখীন হতে হচ্ছিল, যে ১০ থেকে ১২ মিটার তখনও খোঁড়া বাকি ছিল, সেটাই হাতে করে সম্পূর্ণ করেন এই মানুষগুলো। এই ১২ জন র্যাট হোল মাইনার্সকে ৫০ হাজার টাকা করে সাম্মানিক দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছে উত্তরাখণ্ড সরকার। কাজটি করেও খুশি প্রত্যেকে। ৪১ জন শ্রমিককে বাঁচাতে পেরে সকলের মুখে চওড়া হাসি।
দুরন্ত উদ্ধার…
উত্তরকাশীর সিল্কিয়ারার সুড়ঙ্গে আটকে থাকা ৪১ জন শ্রমিককে ১৭ দিন পর যে ভাবে উদ্ধার করে আনা হয়, তা হার মানিয়ে দিতে পারে যে কোনও হলিউডি থ্রিলারকেও। প্রত্যেক মুহূর্তে টানটান স্নায়ুযুদ্ধ চলে। দিনদুয়েক আগে প্রথম মুক্তির আলো দেখা যায়। প্রথম ধাপে বের করা হয় ২ জন শ্রমিককে। একটু পরে খবর আসে ২০ জনকে উদ্ধার করা যায়। দেখতে দেখতে বাড়তে থাকা উদ্ধার হওয়া শ্রমিকের সংখ্যা। আধ ঘণ্টার কিছু বেশি সময়ে উদ্ধার হন ৪১ জন শ্রমিকই। টানেলের সামনেই তৈরি ছিল অ্যাম্বুল্যান্স। উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের নিয়ে যাওয়া হয় স্থানীয় হাসপাতালে। সবটারই সৌজন্যে মানবতার ফেরিওয়ালা এই ‘র্যাট হোল মাইনিং’ ।