‘আদিবাসী’ মানে হচ্ছে ‘আদিমতম অধিবাসী’ বা ‘ভূমিপুত্র’। ‘আদিবাসী’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ ‘Indigenous people’. প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ মর্গানের সংজ্ঞানুযায়ী আদিবাসী হচ্ছে, ‘কোনো স্থানে স্মরণাতীতকাল থেকে বসবাসকারী আদিমতম জনগোষ্ঠী যাদের উৎপত্তি, ছড়িয়ে পড়া এবং বসতি স্থাপন সম্পর্কে বিশেষ কোনো ইতিহাস জানা নেই।’ মর্গান বলেন, ‘The Aboriginals are the groups of human race who have been residing in a place from time immemorial … they are the true Sons of the soil..’ .সূত্র – (Morgan, An Introduction to Anthropology, 1972)
একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী মহল ‘আদিবাসী’ বিতর্ক তুলে ইতিহাস বিকৃতায়নের মাধ্যমে বাঙালি জনগোষ্ঠীকে হেয় প্রতিপন্ন করার পাশাপাশি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে বিপন্ন করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত আছে। যার পরিপ্রেক্ষিতে এই তথ্যবহুল আলোচনা। নিচের তথ্যসূত্রগুলোর সাহায্যে আমরা যাচাই করে দেখবো, বাংলাদেশে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও পাহাড়িদের এদেশের আদিবাসী বলা যাবে কি না। চলুন শুরু করা যাক।
শুরু করি কক্সবাজার নামকরণ দিয়ে
কক্স সাহেবের বাজার থেকে কক্সবাজারকিন্তু ইতিহাস বলছে এই শহরের আদি নাম ‘প্যানোয়া’।
প্যানোয়া নামের আক্ষরিক অর্থ ‘হলুদ ফুল’। আর এর আরও একটি প্রাচীন নাম হচ্ছে ‘পালঙ্কী’। সেই পালঙ্কী থেকে এখনকার কক্সবাজারের পথ চলার সুদীর্ঘ ইতিকথা জানাতেই আজকের এই প্রয়াস।
ইতিহাস বলছে, ১৬১৬ সালে মুঘল অধিগ্রহণের আগে পর্যন্ত ‘কক্সবাজার’ জেলাসহ চট্টগ্রামের একটি বড় অংশ আরাকান রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। মুঘল সম্রাট শাহ সুজা পাহাড়ি রাস্তা ধরে আরাকান যাওয়ার পথে কক্সবাজারের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হন এবং এখানেই অস্থায়ী দূর্গ স্থাপনের আদেশ দেন। তার যাত্রাবহরের প্রায় একহাজার পালঙ্কী কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারা নামের স্থানে অবস্থান নেয়। ডুলহাজারা অর্থ হাজার পালঙ্কী। মুঘলদের পরে ত্রিপুরা, আরকান তারপর পর্তুগিজ ও ব্রিটিশরা এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। আর কক্সবাজার নামটি আসে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স নামে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক অফিসারের নাম থেকে।
তার আগে কক্সবাজারের নাম ছিল পালঙ্কী। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি অধ্যাদেশ- ১৭৭৩ জারি হওয়ার পর ওয়ারেন্ট হোস্টিং বাংলার গভর্নর হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। তখন হিরাম কক্স পালঙ্কীর মহাপরিচালক নিযুক্ত হন। ক্যাপ্টেন কক্স আরাকান শরণার্থী এবং স্থানীয় রাখাইনদের মধ্যে বিদ্যমান হাজার বছরের পুরোনো সংঘাত নিরসনের চেষ্টা করেন এবং শরণার্থীদের পুনর্বাসনে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি সাধন করেন।
কিন্তু কাজ পুরোপুরি শেষ করার আগেই ১৭৯৯ সালে তিনি মারা যান। তার পুনর্বাসন অবদানকে স্মরণীয় করে রাখতে একটি বাজার প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং এর নাম দেওয়া হয় কক্সসাহেবের বাজার।
১৭৮৪ সালে বার্মা কর্তৃক স্বাধীন আরাকান রাজ্যের পতনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে মগদের বসতি গড়ে ওঠে।
দ্বিতীয় দফায় মগদের দেশত্যাগ আরম্ভ হয়, আরাকান থেকে আগত শরণার্থীরা চট্টগ্রাম জেলার দক্ষিণ অঞ্চলে একটাস্থায়ী ঠিকানা খুঁজে নেয়।
ক্রমে মাতামুহুরী উপত্যকার মধ্য দিয়ে তারা বান্দরবানে ছড়িয়ে পড়ে।
তৃতীয় দলটি সীতাকুণ্ডু অঞ্চল থেকে খাগড়াছড়িতে প্রবেশ করে।
চতুর্থ দলটি বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে বৃহত্তর পটুয়াখালীর দক্ষিণ অঞ্চলেপৌছে এবং সেখানে বসতি গড়ে তোলে।
ভারত-মিয়ানমার থেকে আসা ‘অভিবাসীরা’ কখনো আদিবাসী হতে পারে না। বর্তমান বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলগুলোতে উপজাতিদের বসতি স্থাপনের বহু পূর্ব থেকেই বাঙালি জনগোষ্ঠীর বসবাস ছিল, যদিও সমতলের তুলনায় পার্বত্য অঞ্চলে তাদের সংখ্যা ছিল তুলনামূলক কম। প্রস্তর যুগের বাঙালি সভ্যতার নিদর্শন স্বরুপ প্রত্নতাত্ত্বিকেরা রাঙ্গামাটিতে ‘Stone Element’ (পাথরের তৈরি অস্ত্র) ও ফেনীতে ‘Hand Axe’ (কুঠার) উদ্ধার করেছে, যেগুলোর বয়স ১০,০০০ থেকে ১৫,০০০ বছর।
বাংলাদেশের উপজাতীয় ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র নয়, তার প্রমাণ প্রখ্যাত উপজাতি গবেষক ও নৃতত্ত্ববিদ RHS Huchinson (1906), T H Lewin (1869), অমেরেন্দ্র লাল খিসা (১৯৯৬), J. Jaffa (1989) এবং N Ahmed (1959) প্রমুখের লেখা, গবেষণাপত্র, থিসিস এবং রিপোর্ট বিশ্লেষণে পাওয়া যায়।
চাকমা পণ্ডিত অমেরেন্দ্র লাল খিসা ‘অরিজিনস অব চাকমা পিপলস অব হিলট্রেক্ট চিটাগং’ এ লিখেছেন, ‘তারা এসেছেন মংখেমারের আখড়া থেকে পরবর্তীতে আরাকান এলাকায় এবং মগ কর্তৃক তাড়িত হয়ে বান্দরবানে অনুপ্রবেশ করেন। আজ থেকে আড়াইশ তিনশ; বছর পূর্বে তারা ছড়িয়ে পড়ে উত্তর দিকে রাঙামাটি এলাকায়।’ এর প্রমাণ ১৯৬৬ সালে ‘বাংলাদেশ জিওগ্রাফিক্যাল সোসাইটি’ প্রকাশিত ‘দি অরিয়েন্টাল জিওগ্রাফার জার্নাল’।
চাকমারা আজ থেকে মাত্র দেড়শ’ থেকে তিনশ’ বছর পূর্বে মোগল শাসনামলের শেষ থেকে ব্রিটিশ শাসনামলের প্রথম দিকে মায়ানমার আরকান অঞ্চল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করে (Lewin, 1869). প্রখ্যাত নৃতত্ত্ববিদ এবং ব্রিটিশ প্রশাসক টি. এইচ. লেউইন-এর মতে, ‘A greater portion of the hill tribes at present living in the Chittagong Hill Tracts undoubtedly come about two generations ago from Aracan. This is asserted both by their own traditions and by records in Chittagong Collectorate’. সূত্র – (Lewin, 1869, p. 28).
অর্থাৎ পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসী বিষয়ে ১৮৬৯ সালে প্রকাশিত রিপোর্টে চট্টগ্রামের তৎকালীন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (ডিসিডিএম) ক্যাপ্টেন টমাস হার্বার্ট লেউইনের মতে, ‘চট্টগ্রামের পাহাড়ে বসবাসকারী মানবগোষ্ঠীর বেশির ভাগই নিশ্চিতভাবে দুই পুরুষ আগে আরাকান (অর্থাৎ, পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে) থেকে এসেছে।’ আসলে ১৮২৪ সালে বার্মার (বর্তমান মিয়ানমার) যুদ্ধে শরণার্থী হিসেবে এরা পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে থেকে এখানে এসেছিল।
‘পার্বত্য চট্টগামে ১২টা ভিন্ন জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বাস করে। এদের বেশির ভাগই ১৬ থেকে ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময় এই অঞ্চলের বাইরে থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে। ধারণা করা হয়, সবচেয়ে আগে আসে চাকমা সম্প্রদায় এবং পাহাড়ি অঞ্চল অতিক্রম করে এসে ১৭ শতকের মধ্যেই তারা চট্টগ্রামের সমতল ভূমি থেকে শুরু করে সমুদ্র তীরবর্তী এলাকায় বাস করতে থাকে। সে সময় স্থানীয় বাঙলাভাষীদের সাথে জমি নিয়ে চাকমা সম্প্রদায়ের নিরন্তর ঝামেলা লেগেই থাকতো।’সূত্র – (Genocide in the Chittagong Hill Tracts, Bangladesh; IWGIA Document 51, Wolfgang May (ed.), Page: 14-15).
১৯৬৯ সালে রাঙামাটি থেকে প্রকাশিত বিরাজ মোহন দেওয়ানের ‘চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত’ বইয়ে (দ্বিতীয় সংস্করণ, ২০০৫), পাহাড়ের অধিবাসীদের ‘উপজাতি’ অভিধাতেই ভূষিত করা হয়েছে।
‘উপজাতিরা সংস্কারপ্রিয়। ইহাতে অতীতে চাকমারা প্রতিবেশী হিন্দু ও মুসলমানদের সংস্পর্শে আসিয়া বহু ধর্মীয় সংস্কার অনুকরণ করে ঠিকই। আর ইহারই কারণ J.H. Hutton ও সুবোধ ঘোষ মহাশয় উভয়েরই মন্তব্যে প্রকাশ উপজাতীয় সংস্কারাদি হিন্দু ধর্ম থেকে পৃথক করা দুস্কর।’ সূত্র –দেওয়ান ব.ম., চাকমা জাতির ইতিবৃত্ত, ২০০৫, পৃ. ২১৩)।
বাংলা ১৩৯২ সালে কলকাতা থেকে প্রকাশিত সিদ্ধার্থ চাকমার ‘প্রসঙ্গঃ পার্বত্য চট্টগ্রাম’ বইয়ে পাহাড়িদের ‘উপজাতি’ হিসেবেই অভিহিত করা হয়।
‘পার্বত্য চট্টগ্রামের অনেক বুদ্ধিজীবী মনে করেন, উপজাতি সম্পর্কিত সব দায়দায়িত্ব সরকার ছেড়ে দিয়েছে আমলাদের হাতে। তাদের মতে, রাজনৈতিক কমিটি যদি গঠিত হতো তাহলে আমলাতন্ত্রের স্বেচ্ছাচারিতার কারণে জটিল হতে হতে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি সমস্যা বর্তমানের সংকটরূপ ধারণ করত না।’ সূত্র –(চাকমা স., ১৩৯২ বঙ্গাব্দ, পৃ. ১৩৪)।
১৯৭৫ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতির রাঙামাটি আগমন উপলক্ষে স্থানীয় পাহাড়ি নেতারা জিয়াউর রহমানকে যে স্মারকলিপি প্রদান করেন, সেখানে পাহাড়ের অধিবাসীদের ‘উপজাতি’ বলা হয়েছে। উল্লেখ্য, উক্ত স্মারকলিপি প্রদানকারীদের মধ্যে চারু বিকাশ চাকমা, অশোক কুমার দেওয়ান, জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা, মং শৈ প্রু চৌধুরী (বোমাং সার্কেল চিফ), মং প্রু সাইন (মং সার্কেল চিফ) এবং বীরেন্দ্র কিশোর রোয়াজা, সাবেক এমপিএ উল্লেখযোগ্য। সূত্র –রহমান, পার্বত্য তথ্য কোষ, ২০০৭, পৃষ্ঠা. [১২৯-১৩৫](tel:129135)), (রহমান, পার্বত্য তথ্য কোষ, ২০০৭, পৃষ্ঠা [১২৯-১৩৫](tel:129135))।
১৯৯৩ সালের জ্ঞানেন্দু বিকাশ চাকমা রচিত ‘ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে পার্বত্য স্থানীয় সরকার পরিষদ’ বইয়েও ‘উপজাতি’ শব্দটিই ব্যবহার করা হয়েছে।
১৬ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৩ সালে রাঙামাটিতে প্রদত্ত প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের একটি উক্তিকে অপব্যাখ্যা করে জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) উপজাতীয় জনগণের সমর্থন আদায় করতে সমর্থ হয়। উপজাতীয়রা বাঙালি বলতে বাঙালি মুসলমানদের বোঝে। জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) শেখ মুজিবের উপরোক্ত বক্তব্যকে অপব্যাখ্যা করে বলেছে, ‘তিনি উপজাতীয় জনগণকে বাঙালি আখ্যা দিয়েছেন। অর্থাৎ ভবিষ্যতে উপজাতীয়দের সবাইকে বাঙালি বা মুসলমান হতে হবে। সবাইকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হবে।’সূত্র – (চাকমা জ. ব., ১৯৯৩, পৃষ্ঠা. ৫২)।
মারমারা পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছে মিয়ানমার (বার্মা) থেকে। মারমা বা মগ জনগোষ্ঠী ১৭৮৪ সনে এ অঞ্চলে দলে দলে অনুপ্রবেশ করে এবং আধিপত্য বিস্তার করে। (Shelley, 1992 and Lewin, 1869).
বান্দরবনের সাবেক মং রাজা অংশে প্রু চৌধুরী এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘আমরা এই অঞ্চলে আদিবাসী নই’। বান্দরবান এলাকায় মারমা বসতি ২০০ বছরেরও পুরোনো। মং রাজাদের বংশলতিকা এবং ইতিহাস ধারাবাহিকভাবে লিপিবদ্ধ থাকায় এ বিষয়ে সংশয়ের কিছু নেই।
চাকমারা যে ভাষায় কথা বলেন, বিখ্যাত ভাষাতাত্ত্বিক গ্রিয়ার্সনের মতে সেটা হলো চট্টগ্রাম অঞ্চলের বাংলা উপভাষারই একটি রূপ মাত্র। মারমাদের ভাষা চাকমাদের ভাষা থেকে আলাদা। তারা যে ভাষায় কথা বলেন, তা হলো আরাকানি ভাষার একটি রূপ। আরাকানি ভাষা আবার প্রাচীন বর্মি ভাষার সাথে সম্পর্কযুক্ত।
ত্রিপুরারা পার্বত্য চট্টগ্রামে এসেছে পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরা রাজ্য থেকে। সেখানকার রাজরোধ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর একটি ক্ষুদ্রতর অংশ স্বেচ্ছানির্বাসন বেছে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছে।
‘পার্বত্য চট্টগ্রামের এসব উপজাতীয় জনগোষ্ঠীগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, এসব জনগোষ্ঠীগুলোর প্রায় সবাই যুদ্ধ-বিগ্রহ এবং হিংস্র দাঙ্গা-হাঙ্গামার ফলে তাদের পুরাতন বসতি স্থান থেকে এখানে পালিয়ে এসেছ। নতুবা, এক জনগোষ্ঠী অন্য জনগোষ্ঠীর পশ্চাদ্ধাবন করে আক্রমণকারী হিসেব এদেশে প্রবেশ করেছে।’সূত্র – (Hutchinson, 1909, Bernot, 1960 and Risley, 1991).
ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত যে, সিলেট অঞ্চলের খাসিয়া, মণিপুরী ও পাত্ররা তৎকালীন বৃহত্তর আসামের খাসিয়া জয়ন্তী পাহাড়, মণিপুর, কাঁচাড় ও অন্যান্য সংলগ্ন দুর্গম বনাচ্ছাদিত আরণ্যক জনপদ থেকে যুদ্ধ, আগ্রাসন, মহামারী এবং জীবিকার অন্বেষণে সুরমা অববাহিকায় প্রবেশ করে ও সিলেটের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে বসতি স্থাপন করে। নৃ-বিজ্ঞান ও ভৌগোলিক জ্ঞানের সকল বিশ্লেষণেই এরা উপজাতীয় এবং ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী বৈ আর কিছুই নয়। এরা কোনো বিবেচনায়ই সিলেটের আদিবাসী হতে পারে না। এরা আদি আরণ্যক পার্বত্য নিবাসের (আসাম, মণিপুর, মেঘালয় ইত্যাদি) আদিবাসী হলেও যখন স্থানান্তরিত হয়ে নতুন ভূখণ্ডে আসে সেখানে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি ক্ষুদ্র উপজাতীয় গোষ্ঠী কিংবা ভিন্ন সংস্কৃতির ক্ষুদ্র জাতিসত্তা হিসেবে সমান্তরালভাবে থাকতে পারে। কিন্তু কখনো তারা নতুন জায়গায় আদিবাসী হতে পারে না।
ঠিক একইভাবে, ময়মনসিংহ (হালুয়াঘাট অঞ্চল) এবং টাঙ্গাইল অঞ্চলের (মধুপুর) গারো, সিংট্যানেরা ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের পরে এদের অনেকে তাদের আদিনিবাস ভারতের উত্তরের গারো পাহাড়ে ফিরে গেলেও বেশ কিছুসংখ্যক গারো ও সিংট্যানরা বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলে রয়ে গেছে। গারোদের আদি নিবাস ভারতের গারোল্যান্ড। কোনোক্রমেই তারা ময়মনসিংহ কিংবা টাঙ্গাইলের আদিবাসী হতে পারে না। আরো বলা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে আজ থেকে মাত্র ৬০-৭০ কিংবা একশ’, সোয়াশ’ বছর আগে সিলেটের শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ এবং উত্তর সিলেটের কোনো কোনো নিচু পাহাড়ি অঞ্চলে চা বাগান স্থাপনের জন্য ব্রিটিশ উপনিবেশবাদীরা বর্তমান ভারতের বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জঙ্গলাকীর্ণ মালভূমি অঞ্চল যেমনঃ ছোট নাগপুরের বীরভূম, সীঙভূম, মানভূম, বাকুড়া, দুমকা, বর্ধমান প্রভৃতি অঞ্চল যা তৎকালীন সাঁওতাল পরগণাখ্যাত ছিল সেসব অঞ্চলে গরিব অরণ্যচারী আদিবাসী সাঁওতাল, মুণ্ডা, কুল, বীর, অঁরাও, বাউরী ইত্যাদি নানা নামের কৃষ্ণকায় আদিম জনগোষ্ঠীর মানুষকে শ্রমিক হিসেব স্থানান্তরিত করে অভিবাসী হিসেবে নিয়ে আসে।
একইভাবে যুদ্ধ, মহামারী থেকে আত্মরক্ষার জন্য এবং জীবিকার সন্ধানে রাজমহলের গিরিপথ ডিঙ্গিয়ে সাঁওতাল জনগোষ্ঠী বাংলাদেশের বরেন্দ্রভূমি অঞ্চলে (রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুর) বাসবাস শুরু করে। উত্তরাঞ্চলের কুচবিহার ও জলপাইগুড়ি জেলা থেকে দক্ষিণের রংপুর-দিনাজপুরের নদী অববাহিকামণ্ডিত সমভূমিতে নেমে বসবাস শুরু করে কুচ ও রাজবংশী জনগোষ্ঠী। এরা সকলেই তাদের মূল নিবাসের আদিবাসী হিসেব বিবেচ্য হলেও কোনো যুক্তিতে তাদের নতুন আবাসস্থল বাংলাদেশের ঐসব অঞ্চলগুলোর আদিবাসী বা ভূমিপত্র হিসেব চিহ্নিত হতে পারে না।
অর্থাৎ এখানে বিবেচনা করতে হবে, বাংলাদেশের উপজাতীয় জনগোষ্ঠীসমূহ বাংলাদেশের বর্তমান ভূখন্ড অধিকৃত হওয়ার পূর্ব থেকে বা প্রি-কলোনিয়াল কি-না। তবে এ আলোচনার পূর্বে একটি বিষয় নির্ধারণ করা জরুরি যে, বিবেচনাটি কি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ভূখন্ডের উপর হবে, না বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক হবে। কারণ, অঞ্চলভিত্তিক হলে সেন্টমার্টিন দ্বীপে যিনি প্রথম বসতিস্থাপন করেছেন তিনিও বাংলাদেশের আদিবাসী। এবং আগামীতে যদি বাংলাদেশ ভূখন্ডে নতুন কোনো দ্বীপ সৃষ্টি হয় আর সেই দ্বীপে যারা বা যিনি নতুন বসতি গড়বেন তিনিও আদিবাসী হবেন। বর্তমান সরকার নতুন সৃষ্ট ভাসান চরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন করার চেষ্টা করছে, সেটা যদি সফল হয় তাহলে রোহিঙ্গাদেরও কি বাংলাদেশের আদিবাসী বলা হবে?
একইভাবে ঢাকার আদি বাসিন্দা যারা তারাও বাংলাদেশের আদিবাসী এবং যে সকল উপজাতি ঢাকায় নানাভাবে স্যাটেল করেছেন তারা স্যাটেলার? আর যদি সমগ্র বাংলাদেশ ভূখন্ড ধরা হয়, তবে বাংলাদেশের প্রথম উপনিবেশকারী হচ্ছে আর্যজাতি। আর্যরা উত্তরবঙ্গ দিয়ে বাংলাদেশ ভূখন্ডে প্রবেশ করেছে। তখন বাংলাদেশ ভূখন্ডে চাকমা, মারমা, গারো, হাজং, সাঁওতাল কারো অস্তিত্ব ছিল না। অর্থাৎ আর্যদের আগমণের পূর্বে এখানে যে অনার্য জনগোষ্ঠী বসবাস করতো তারা প্রি-কলোনিয়াল। আর্যদের আগমনের পূর্বে এখানকার অনার্য বাসিন্দারা প্রাকৃত ধর্মে বিশ্বাসী ছিল। আর্যদের প্রভাবে তারা সনাতন ধর্ম গ্রহণ করে। পরবর্তীতে হিন্দু রাজাদের নিকট থেকে বাংলা বৌদ্ধ রাজাদের দখলে যায়। বাংলাদেশে বৌদ্ধদের ইতিহাস সমৃদ্ধ। বাংলা সাহিত্যের আদি কিতাব চর্যাপদ তার উৎকৃষ্ট প্রমাণ। বাংলায় বৌদ্ধদের ইতিহাস আর চাকমাদের ইতিহাস এক নয়। অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রি-কলোনিয়াল জনগোষ্ঠী হচ্ছে নানা বিবর্তনের মধ্য দিয়ে উঠে আসা এখানকার মূল জনস্রোত, বাঙালি জনগোষ্ঠী। সুতরাং বাংলাদেশের মূল ভূমিপুত্র বাঙালি জনগোষ্ঠীই হলো এদেশের প্রকৃত আদিবাসী।
সকল ঐতিহাসিক, নৃতাত্ত্বিক, প্রত্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ও উপজাতীয় জনগোষ্ঠীর কেউই বাংলাদেশে স্মরণাতীত কাল থেকে বসবাস করছে না। তাদের সকলেই বহির্বিশ্ব বিশেষ করে ভারত ও মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে বিভিন্ন সময়ে। এই অনুপ্রবেশও স্মরণাতীত কাল পূর্বে ঘটে নি। মাত্র কয়েকশ’ বছর পূর্বে ভারত ও মিয়ানমার থেকে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। সুতরাং বাংলাদেশের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে এদেশের আদিবাসী বা ভূমিপুত্র বলার কোনো সুযোগ নেই।
হামের পুত্র হিন্দের নাম অনুসারেই ভারতের নাম হয়েছে হিন্দুস্তান। “হিন্দের দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিল ‘বঙ্গ’। এই ‘বঙ্গ’-এর সন্তানরাই বাঙালি বলে পরিচিতি
ঐতিহাসিক ও গবেষক ড. মোহাম্মদ হান্নান লিখেছেন, “হযরত আদম (আ.) থেকে আমাদের এই মানব জাতির শুরু। কিন্তু হযরত নূহ (আ.)-এর সময়ে সমগ্র পৃথিবীতে এক মহাপ্লাবন ঘটেছিল। এই মহাপ্লাবনে দুনিয়ার সকল কিছু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। কেউ জীবিত ছিল না, শুধু নূহ (আ.)-এর নৌকায় আরোহণ করেছিলেন ৮০ জন নূহের ভক্ত; এই ৮০ জন থেকেই মানব জাতির আবার নতুন যাত্রা।”এই নতুন যাত্রায় বেঁচে যাওয়া ৮০ জনের মধ্যে ছিলেন হযরত নূহের এক পুত্র; নাম তার ‘হাম’। নূহ তার পুত্র হামকে বললেন, ‘তুমি মানব বসতি স্থাপনের জন্যে চলে যাও পৃথিবীর দক্ষিণ দিকে’। পিতার নির্দেশ পেয়ে হাম চলে এলেন আমাদের এশিয়া মহাদেশের কাছাকাছি। সেখানে এসে তিনি তার জ্যেষ্ঠ পুত্র হিন্দকে পাঠালেন ভারতের দিকে। অনেকে মনে করেন, হামের পুত্র হিন্দের নাম অনুসারেই ভারতের নাম হয়েছে হিন্দুস্তান। “হিন্দের দ্বিতীয় পুত্রের নাম ছিল ‘বঙ্গ’। এই ‘বঙ্গ’-এর সন্তানরাই বাঙালি বলে পরিচিতি লাভ করে। সে হিসাবে বাঙালির আদি পুরুষ হচ্ছেন ‘বঙ্গ’।”সূত্র – – গোলাম হোসায়ন সলীম : বাংলার ইতিহাস (রিয়াজ-উস-সালাতীনের বঙ্গানুবাদ), সূত্র – আকবরউদ্দীন অনূদিত, অবসর প্রকাশন, ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃষ্ঠা ২৪)। আরো দেখুন,সূত্র – ড. মোহাম্মদ হান্নান : দেশের নামটি বাংলাদেশ কে রেখেছে এই নাম, অনুপম প্রকাশনী, ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯, পৃষ্ঠা ১৫-১৬)
পাল আমলে বাঙলায় মুসলমানদের অবস্থান
ইতিহাসে বাংলায় মুসলমানদের অবস্থানের কথা প্রথম জানান দেন আরব ভুগোলবিদ মাসুদি। তিনি পাল আমলে বাঙলায় মুসলমানদের অবস্থানের কথা জানান। রিচার্ড এম ইটনের মতে, এটাই ইতিহাসে বাংলায় মুসলমানদের প্রথম উল্লেখ। সূত্র –ইটন, রিচার্ড এম, The Rise of Islam and Bengal Frontier (1204-1760) অনুবাদ হাসান শরীফ, প্রকাশ জুন ২০০৮, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, পৃষ্ঠা-৩৪।
বাংলাদেশে বখতিয়ার খিলজীর আগমনের অনেক পূর্বেই আরব বণিকদের দ্বারা ইসলাম চট্টগ্রামে ও নিকটবর্তী অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। সূত্র –Richard Symonds এর ‘The Making of Pakistan’-এ অধ্যাপক আহমদ আলীর প্রবন্ধে (১৯৭ পৃষ্ঠা) রয়েছে : The culture that developed in Bengal was entirely different from that of the Hindus. The ports of the country especially Chittagong had come under the influence of the Arabs as early as the 7th Century A. D. and many of the Arab voyages and traders had left a permanent impress upon the area. Islam, therefore, took root very early in this respective soil.
বাঙালি মুসলমানেরা ইরানী ও তুর্কী সংস্কৃতির প্রভাবমুক্ত এক স্বতন্ত্র রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি গড়তে চেয়েছিল। সাম্যধর্মী আরব বণিকেরা পাল রাজাদের আমলে বাংলার কূলে কূলে ব্যবসা করতেন। বখতিয়ার খিলজী পূর্ববর্তী বাংলাদেশে ইসলামের আগমন সম্পর্কে সূত্র – ড. আবদুল করিম তাঁর ‘চট্টগ্রামের ইতিহাস’ গ্রন্থে বলেন, … খৃষ্টীয় অষ্টম/নবম শতাব্দীতে চট্টগ্রামের সঙ্গে আরবীয় মুসলমান বণিকদের যোগাযোগ ছিল। পরবর্তীকালে চট্টগ্রামে আরব ব্যবসায়ীদের আনা-গোনার আরও প্রমাণ পাওয়া যায়। আরব বণিকেরা চট্টগ্রামে স্বাধীন রাজ্যগঠন না করলেও আরবদের যোগাযোগের ফলে চট্টগ্রামের সংস্কৃতিতে তাদের প্রভাব এখনও পরিলক্ষিত হয়। চট্টগ্রামী ভাষায় প্রচুর আরবী শব্দ ব্যবহৃত হয়। চট্টগ্রামী ভাষায় ক্রিয়াপদের পূর্বে ‘না’ সূচক শব্দ ব্যবহারও আরবী ভাষার প্রভাবের ফল। অনেক চট্টগ্রামী পরিবার আরব বংশোসম্ভূত বলে দাবী করে। চট্টগ্রামী লোকের মুখাবয়ব আরবদের অনুরূপ বলেও অনেকে মনে করেন। তাছাড়া চট্টগ্রামের কয়েকটি এলাকা যেমন, আলকরণ, সুলুক বহর(সুলুক-উল-বহর), বাকালিয়া ইত্যাদি এখনও আরবী নাম বহন করে। আগেই বলা হয়েছে যে, কোনো কোনো পণ্ডিত মনে করেন যে, আরবী শব্দ শৎ(বদ্বীপ) এবং গঙ্গা (গঙ্গ) থেকেই চট্টগ্রাম নামের উৎপত্তি হয়। সূত্র –(ইস্টার্ণ বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার, চট্টগ্রাম, পৃষ্ঠা: ১ দ্রষ্টব্য)।
বাংলার অন্যতম প্রাচীন সোমপুর বিহারের ১২৫নং কক্ষে মাটির পাত্রে খলিফা হারুন-অর-রশিদের শাসনামলের রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া যায়। এ দ্বারা খলিফা হারুনুর রশীদের আমলে আরবদের সাথে বাংলার বাণিজ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। এশিয়াটিক সোসাইটি প্রণীত বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা-১ প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য খণ্ডে বলা হয়েছে, বাংলায় রাজশক্তির মাধ্যমে তের শতকে মুসলমানদের আগমন ঘটলেও প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক সূত্র থেকে জানা যায়, আট শতক থেকেই বাংলার সঙ্গে মুসলমান আরব বণিকদের যোগাযোগ স্থাপিত হয়। সূত্র –– রহমান, সুফি মুস্তাফিজুর(সম্পাদিত), প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, এশিয়াটিক সোসাইটি, বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা, খণ্ড-১, পৃষ্ঠা-২৯৭, প্রথম প্রকাশ, ডিসেম্বর, ২০০৭, ঢাকা।
সম্রাট অশোক বা তার অনুসারীদের কেউ চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গা, রাখাইন, চাক উপজাতির ছিলেন না
মহাবিহারের প্রধান আচার্য “অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান’। তিব্বতের রাজার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে তিনি অত্যন্ত দুর্গম হিমালয় পর্বতমালা অতিক্রম করে তিব্বত প্রদেশে এসে পৌঁছান। সেখানে তিনি দীর্ঘ ১৩ বৎসর কাল অতিবাহিত করে বৌদ্ধধর্মের প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বাঙালী অতীশ দীপঙ্কর তিব্বতে বৌদ্ধধর্মের নবজাগরণের সূচনা করেছিলেন। তাঁর লেখনীর ছোঁয়ায় ১৭৫ টির অধিক দার্শনিক গ্রন্থসমূহের আবির্ভাব হয় এবং তিনি বৌদ্ধ ধর্মের এক মানবতাবাদী ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন। তিব্বতী ও চৈনিক বৌদ্ধদের কাছ থেকে অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞান এখনও পর্যন্ত দ্বিতীয় বুদ্ধের ন্যায় পূজিত হয়ে থাকেন। অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতক পর্যন্ত বঙ্গদেশে চন্দ্র ও পাল রাজাদের রাজত্বকালে মহাযান বৌদ্ধধর্মের সুবর্ণযুগে পর্যবসিত হয়েছিল। সোমপুরী, ওদন্তপুরী, বিক্রমশীলা মহাবিহার রাজা মহিপাল ও জয়পালের উল্লেখযোগ্য ও সুমহান কীর্তি। ধর্মপাল বঙ্গদেশে পঞ্চাশোর্ধ বৌদ্ধধর্ম-বিদ্যায়তন সুপ্রতিষ্ঠত করতে সক্ষম হয়েছিলেন, তার উল্লেখ তিব্বতী সাহিত্যে রয়েছে।এককথায় সম্রাট অশোক বা তার অনুসারীদের কেউ চাকমা, মারমা, তঞ্চঙ্গা, রাখাইন, চাক উপজাতির ছিলেন না। অন্যদিকে অতীশ দীপঙ্কর ৯৮২ খ্রিস্টাব্দে বিক্রমপুর পরগনার বজ্রযোগিনী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। এটি বর্তমানে বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার অন্তর্ভুক্ত।সূত্র – – পণ্ডিত, রাজকুমার, বাংলায় বৌদ্ধধর্মের ক্রমবিকাশ, A Peer-Reviewed Bi-monthly Bi-lingual Research Journal Volume-VII, Issue-1, January 2021, Page No. 65-70, International Journal of Humanities & Social Science Studies (IJHSSS), Scholar Publications, Karimganj, Assam, India.
বৌদ্ধ ধর্মের প্রবর্তক সিদ্ধার্থ বা গৌতম বুদ্ধ ৫৬৩ খ্রিষ্ট পূর্বাব্দে নেপালের লুম্বিনীতে জন্মগ্রহণ করেন। অনেকের মতে, তিনি স্বয়ং আজকের বাংলাদেশে এসেছিলেন। ’বঙ্গদেশে কখন বৌদ্ধধর্মপ্রচার হয়েছিল তার সঠিক তথ্য এখনও নির্ধারণ করা সম্ভব হয়নি। তবে অনুমান করা হয় খ্রিষ্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতকে গৌতম বুদ্ধের সময়কাল হতেই সদ্ধর্মের আলো অবিভক্ত বাংলায় বিকীর্ণহয়েছিল। ঐতিহাসিক ড. রমেশচন্দ্র মজুমদার, ড. নীহার রঞ্জন রায় প্রমুখ মনে করেন, অশোকের আগেই বৌদ্ধধর্মপ্রাচীন বাংলায় কোনো কোনো স্থানে প্রচারিত হয়।
তবে প্রখ্যাত ঐতিহাসকি ড. নীহাররঞ্জন রায় গৌতম বুদ্ধের বাংলাদেশে আগমণের তথ্যটি স্বীকার করতে চাননি। কিন্তু তিনি এ কথা স্বীকার করেছেন যে, বুদ্ধদেব স্বয়ং বাঙলাদেশে আসুন বা না আসুন, মৌর্য সম্রাট অশোকের আগেই বৌদ্ধধর্ম প্রাচীন বাঙলায় কোনও কোনও স্থানে বিস্তার লাভ করিয়াছিল। অন্তত খৃস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে বৌদ্ধধর্ম যে সুপ্রতিষ্ঠিত হইয়া গিয়াছিল মহাস্থান-শিলাখন্ড লিপিতে তো তাহার পাথুরে প্রমাণও বিদ্যমান। সূত্র – রাখালদাস বন্দোপাধ্যায়, বাংলার ইতিহাস, প্রথমখণ্ড , রায়, সূত্র – ড. নীহাররঞ্জন, প্রাগুক্ত ,সূত্র – রানা চক্রবর্তী, অবিভক্ত বঙ্গে বৌদ্ধ ধর্মের ইতিবৃত, উত্থান ও পতন- এক অজানা ইতিহাস।
শক্তিশালী বৌদ্ধ রাজা ধর্মপাল ছিলেন বাঙালি
নৃবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের পলিমাটির বয়স ২০ হাজার বছরের প্রাচীন। পঞ্চগড় সরকারি মহিলা কলেজে সংরক্ষিত নৌকা দুটির আনুমানিক বয়স ৩ হাজার বছর বলে তারা মনে করেন। পঞ্চগড়ের ভিতরগড় দুর্গের বয়স প্রায় ২ হাজার বছর। তার চেয়েও প্রাচীন উয়ারী বটেশ্বরের সভ্যতাকে নৃবিজ্ঞানীগণ মহেঞ্জোদারো সভ্যতার সমসাময়িক বলে দাবি করেন। প্রাচীন বাংলার স্বীকৃত সভ্যতা বৌদ্ধ সভ্যতা। কিন্তু সে বৌদ্ধরা চাকমা ছিলেন না। ছিলেন বাঙালি। শক্তিশালী বৌদ্ধ রাজা ধর্মপাল ছিলেন প্রথম বাঙালি নৃপতি। বাঙালী বৌদ্ধ ধর্মগুরুরা তাদের পাণ্ডিত্যে বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে সুদুর চীন পর্যন্ত আলো ছড়িয়েছিলেন। বাংলা ভাষার প্রাচীন পুস্তিকা চর্যাপদও আবিস্কৃত হযেছে নেপালের রাজসভায়। উল্লেখ্য, চর্যাপদ মূলত বৌদ্ধগান।
ভূমধ্যসাগরাঞ্চলীয় জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে এসেছিল
অস্ট্রিক জাতির প্রায় সমকালে, সম্ভবত পাঁচ হাজার বছর পূর্বে দ্রাবিড় জাতি বাংলায় প্রবেশ করে। জানা যায় যে, তারা ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের সীমান্তবর্তী এলাকার জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। সেখানে প্রাপ্ত ক্রিট দ্বীপের স্টিটাইট (Steatite) পাথরে নির্মিত একটি সিলমোহর থেকে বোঝা যায় যে, ভূমধ্যসাগরাঞ্চলীয় জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে এসেছিল এবং তাদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল ।
আর একটি জনগোষ্ঠী যাদেরকে পণ্ডিতগণ হোমো-আলপাইনাস (পামির ও আলপাইনের লোক) বলে অভিহিত করেন, তারা বাংলাদেশে এসে বসতি স্থাপন করেছিল। তাদের সম্পর্কে বলা হয় যে, তারা ব্রাহ্মণ, কায়স্থ ও বাংলার অন্যান্য হিন্দুদের পূর্বপুরুষ ছিল। তারা আর্য ভাষায় কথা বলত। কিন্তু জাতিতে তারা বৈদিক আর্য ছিল না। বাংলায় আর্যদের আগমনের পূর্বে তারা উন্নত সভ্যতার বিকাশ ঘটিয়েছিল। প্রাচীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আরও একটি জনগোষ্ঠীর উল্লেখ পাওয়া যায়। তারা পুণ্ড্র নামে পরিচিত ছিল। জানা যায় যে, শবর, পুলিন্দ ও মুতিব জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে পুণ্ড্ররা একটি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
বাংলাদেশে আর্যদের আগমন ও তাদের বিস্তারের সময় সম্পর্কে সঠিক করে কিছু বলা বেশ কঠিন। তবে একথা স্পষ্ট করেই বলা যায় যে, প্রায় তিন হাজার পাঁচ শত বছর পূর্বে (খ্রিস্টপূর্ব ১৫০০ অব্দ) আর্যরা ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করলেও তারা বাংলাদেশে এসেছিল অনেক পরে। বলা হয়ে থাকে যে, আর্যরা পশ্চিম হতে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় পাঁচ শতক থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকে। কিন্তু সমগ্র বাংলাদেশকে আর্যায়ন করতে সময় লেগেছিল প্রায় এক হাজার বছর।” – সূত্র – মোহসীন, কে. এম ও আহমেদ, শরীফ উদ্দীন(সম্পাদক), সাংস্কৃতিক ইতিহাস, সূত্র – বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সমীক্ষামালা, খণ্ড-৪, প্রথম প্রকাশ, ডিসেম্বর, ২০০৭, এশিয়াটিক সোসাইটি, ঢাকা, ভূমিকা।সূত্র – চট্টোপাধ্যায়, সুনীতি কুমার, বাঙ্গালী জাতি, বাঙ্গালী সংস্কৃতি ও বাঙ্গালা সাহিত্য, তৃতীয় বর্ষ, প্রথম খণ্ড, প্রথম সংখ্যা, ১৩১৪, বঙ্গশ্রী, পৃষ্ঠা- ৭।
- এম জেড ফয়সাল – (বহু লেখকের লেখা ও তথ্য থেকে নেয়া। সবার প্রতি সম্মান ও কৃতজ্ঞতা)