“১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ নভেম্বর চট্টগ্রামের প্যারেড ময়দানে হাবিলদার রজব আলী পূর্ববঙ্গে বিপ্লবের সূচনা করেন। দেশপ্রেমে সমুজ্জ্বল একদল সিপাহী রজব আলীর নেতৃত্বে বন্দর নগরীর অস্ত্রাগার এবং কোষাগার দখল করেন। তারা ফেনী নদী অতিক্রম করে সীতাকু- হয়ে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। নোয়াখালী এবং কুমিল্লায় অবস্থানরত কোম্পানির শক্তিশালী বাহিনীকে এড়িয়ে দ্রুত ঢাকায় পৌঁছানোর লক্ষ্যে রজব আলী ত্রিপুরা রাজ্যের মধ্যদিয়ে জটিল পাহাড়ি পথ বেয়ে ক্ষুদ্র বাহিনী নিয়ে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন।” কলকাতার ব্যারাকপুরে ও বহরমপুরের বিদ্রোহ ছিলো বিচ্ছিন্ন। কিন্তু, চট্টগ্রামে সংঘবদ্ধ অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন রজব আলী। ১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর রাতে বিদ্রোহীরা গুলি ছুঁড়ে বিদ্রোহের জানান দেন। তারা প্রথমেই জেলের তালা ভেঙে আটক স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মুক্ত করে। বিদ্রোহের ডামাডোলে চট্টগ্রামে থাকা ব্রিটিশরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সমুদ্রে জাহাজে আশ্রয় নেন।
১৮৫৭ সালের ১৮ নভেম্বর, চট্টগ্রামের প্যারেড গ্রাউন্ডে ব্রিটিশ শোষণের বিরুদ্ধে পূর্ববঙ্গে স্বাধীনতা আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন ৩৪ নম্বর নেটিভ বেঙ্গল পদাতিক বাহিনীর একজন মুসলিম হাবিলদার। চট্টগ্রামের মাটিতে ব্রিটিশ বেনিয়া হানাদারদের বিরুদ্ধে প্রথমবারের মতো বিদ্রোহের পতাকা সেদিন উড়িয়েছিলেন হাবিলদার মুহম্মদ রজব আলী খাঁ।
বৃটিশ ভারতের ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের একজন সৈনিক হাবিলদার রজব আলী । ১৮৫৭ সাথে সিপাহী বিপ্লবের সময় চট্টগামের বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন। তার নের্তৃত্বে ব্রিটিশ জেলখানায় আক্রমণ করে সকল বন্দীকে মুক্ত করে। সিপাহী জামাল খানকে সাথে নিয়ে ২, ৩ ও ৪ নম্বর কোম্পানীর বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন এবং ব্যারাকে হামলা চালিয়ে হাতি, গোলাবারুদ ও প্রয়োজনীয় অন্যান্ন রসদ নিয়ে চট্টগ্রাম ত্যাগ করে তবে বিভিন্ন স্থানে লড়াই শুরু করেন।
বিদ্রোহের আগে ৪ নম্বর কোম্পানির হাবিলদার পদে উত্তীর্ণ হন এই বীর সিপাহি। কোম্পানির সেনাবাহিনীর ৩৪ নম্বর নেটিভ বেঙ্গল পদাতিক বাহিনীর ১২০ জন হাবিলদার ছিলেন। ব্যক্তিগতভাবে পরহেজগার ও আল্লাহওয়ালা ব্যক্তি রজব আলী ছিলেন তাদের একজন। ক্যাপ্টেন পিএইচকে ডিউলের অধীনে চট্টগ্রাম পাহাড়তলী সংলগ্ন প্যারেড গ্রাউন্ডের সেনানিবাসে থাকতেন তিনি।
১৮ নভেম্বর রাতে স্বাধীনতাকামী মুসলিম সেনাসদস্যরা গুলি ছুড়ে বিদ্রোহের জানান দেন। তারা প্রথমেই জেলের তালা ভেঙে আটক স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মুক্ত করেন। একদল মুসলিম সিপাহি রজব আলীর নেতৃত্বে বন্দরনগরীর অস্ত্রাগার এবং কোষাগার দখল করেন এবং সেখান থেকে তিন লক্ষাধিক টাকা উদ্ধার করেন। সৈন্যব্যারাক দখল করে অস্ত্র সংগ্রহ করে নিয়ে অস্ত্রোগারটি পুড়িয়ে দেন তারা। বিদ্রোহের আকশ্মিকতায় চট্টগ্রামে থাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জালিমরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে বঙ্গোপসাগরে থাকা জাহাজে আত্মগোপন করে।
চট্টগ্রামে সংঘবদ্ধ বিদ্রোহের নেতৃত্ব দেন তিনি। জানা যায়, হাবিলদার রজব আলী খাঁর নেতৃত্বে চট্টগ্রাম প্রায় ৩০ ঘণ্টা ব্রিটিশ শাসনমুক্ত রাখা হয়েছিল। এই বিদ্রোহের সময় গুলি বিনিময়কালে একাধিক মুসলিম সৈন্য শহীদ হন। যাদের কবর দেওয়া হয় আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের আঙিনায়।
চট্টগ্রাম বিপ্লবে, ১৯৭৪ সূত্রে জানা যায় , ১৯ নভেম্বর রাতে সিপাহিরা পিলখানা থেকে হাতি নিয়ে সদলবলে চট্টগ্রাম ত্যাগ করেন। মুসলিম সেনারা উত্তর দিকে চলে যান। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ঢাকায় অবস্থানরত ৭৩ নম্বর দেশীয় পদাতিক বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেওয়া। কিন্তু তার আগেই ঢাকায় অবস্থানরত সিপাহীদের অস্ত্র কেড়ে নেওয়া হয় এবং তাদের শহীদ করা হয়। এদিকে চট্টগ্রামের সিপাহীরা বিভিন্ন জায়গায় বাধার মুখোমুখি হলে রজব আলী এবং বাকি মুসলিম সিপাহিরা ফেনী নদী অতিক্রম করে সীতাকুন্ড হয়ে ঢাকা অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। তবে তিনি সংবাদ পান যে, তাদেরকে ঘেরাও করার জন্য ফেনী নদীর তীরে অবস্থান করছে বিপুল ব্রিটিশ জালিম।
তাই রাস্তা পরিবর্তন করে কুমিল্লার পাহাড়ি এলাকার দিকে অগ্রসর হন সবাই। পরবর্তীতে মুসলিম সেনারা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে মণিপুর রাজ্যের কাছাকাছি সিলেট পৌঁছে যান। সীমান্তবর্তী এলাকায় সিলেট লাইট ইনফ্যান্ট্রির মেজর বাইং সেখানে মুসলিম সেনাদের উপর হামলা করে। মুসলিম সেনাদের পাল্টা প্রতিরোধে বাইং নিহত হয় এবং তার অধীন ইংরেজ বাহিনী পরাজিত হয়। পর পর কয়েকটা যুদ্ধে রজব আলীর পক্ষের অনেক সিপাহি শহীদ হন। যারা বেঁচে ছিলেন আক্রমণের তীব্রতায় শেষ পর্যন্ত তাদের পার্বত্য অঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়।
মহাবিদ্রোহের কাহিনী সূত্রে জানা যায় , রজব আলী খাঁ শেষবারের মতো যুদ্ধে অবতীর্ণ হন করিমগঞ্জের মালগ্রামে। মুসলিম বাহিনী পার্বত্য এলাকা জেলা কাছাড়, হাইলাকান্দি ইত্যাদি পাড়ি দিয়ে মোহনপুর চা বাগানের নিকটবর্তী সাবাশপুরে অবস্থান নেন। কিন্তু স্থানীয় গাদ্দার জমিদারের চরদের মাধ্যমে ইংরেজ বাহিনী সে খবর পেয়ে যায় এবং লেফটেন্যান্ট রসের নেতৃত্বে অতর্কিতে হামলা করা হয়। হাবিলদার রজব আলী তার অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে বীর বীক্রমে যুদ্ধে যোগ দেন। সেই যুদ্ধে ৭০ জন মুসলিম সিপাহী যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হন। হাবিলদার রজব আলী খাঁসহ তিন বা চারজন সিপাহি শেষ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। কোম্পানির বাহিনীর অব্যাহত অনুসরণের মুখে তারা গহিন পাহাড়ি জঙ্গলে চলে যান। ইংরেজ বাহিনীর ফাইনাল রিপোর্টে বলা হয়, তাদের আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বাস্তবেও কেউ আর কোনোদিন বীর যোদ্ধা রজব আলীকে দেখেননি।
ইতিহাসে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের কথা বলা হলেও সেই তালিকায় রাখা হয়নি মুহম্মদ রজব আলীকে। অথচ তিনিই স্বাধীনতা আন্দোলনের সুচনা করেছিলেন অত্র অঞ্চলে। বলা হয়ে থাকে, মুসলিম হওয়ার কারণেই ইতিহাসবিদ নামধারী কিছু কলমসন্ত্রাসীরা তার বীরত্বপূর্ণ ইতিহাস মুছে দেবার চেষ্টা করেছে।
হাবিলদার রজব আলীদের সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের রক্ত মাড়িয়েই ইংরেজদের নিকট থেকে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছিল। দুর্ভাগ্যজনকভাবে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর প্রায় অর্ধশতাব্দি অতিক্রান্ত হলেও রজব আলীর মত অসীম সাহসী বীরদের এখনো আমরা প্রাপ্ত সম্মান দিতে পারি নাই। জাতি হিসাবে এ আমাদের নিদারুণ ব্যর্থতা। প্রতি বছর ১৮ই নভেম্বর চট্টগ্রামের প্যারেড মাঠে কুচকাওয়াচের মাধ্যমে হাবিলদার রজব আলী দিবস পালন করা সম্ভব।
ঐতিহাসিক ভাবে বিশ্লেষণ করে জানা যায়, রজব আলীর নেতৃত্বে বিদ্রোহে চট্টগ্রাম প্রায় ত্রিশ ঘন্টা ব্রিটিশ শাসনমুক্ত ছিল। এই বিদ্রোহের সময় গুলি বিনিময়কালে একাধিক বিপ্লবী সৈনিকের মৃত্যু হয়। যাদের কবর দেয়া হয় আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের আঙ্গিনায়। ১৯ নভেম্বর রাতে সিপাহীরা পিলখানা থেকে হাতি নিয়ে সদলবলে চট্টগ্রাম ত্যাগ করেন। বিদ্রোহীরা উত্তর দিকে চলে যান। তাদের উদ্দেশ্য ছিল ঢাকায় অবস্থানরত ৭৩ নম্বর দেশীয় পদাতিক বাহিনীর সাথে যোগ দেয়া। কিন্তু তার আগেই ঢাকায় অবস্থানরত সিপাহীদের অস্ত্র কেড়ে নেয়া হয়। বহু সিপাহীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়। এদিকে চট্টগ্রামের সিপাহীরা স্থানে স্থানে বাধার সম্মুখীন হলে ত্রিপুরা হয়ে মনিপুরের জঙ্গলে চলে যান। বিদ্রোহীরা স্থির করেছিলেন যে, তারা ইংরেজের রাজত্ব ছেড়ে স্বাধীন ত্রিপুরার নিরাপদ অঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় নেবেন। বিদ্রোহী সিপাহীদের পরিচালনার ভার এসে পড়ল হাবিলদার রজব আলী খাঁর উপরে। বেঙ্গল রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন পিএইচ কে ডেওলের রিপোর্টে স্থানীয় সূত্রের বরাতে বলা হয় রজব আলী বিদ্রোহী বাহিনীকে নিয়ে ফেনী নদী পার হয়ে ত্রিপুরা সীমানার দিকে যাত্রা করেছেন।
সূত্র -তথ্যসুত্র : Rethinking 1857, Sabyasachi Bhattacharya, Indian Council of Historical Research Orient Longman, 2007 – India
বিদ্রোহীরা সীতাকুন্ড হয়ে ২রা ডিসেম্বর তারিখে ‘স্বাধীন’ ত্রিপুরার প্রবেশদ্বারে গিয়ে দেখেন বহু সৈন্য সেখানে তাদের প্রতিহত করার জন্য প্রস্তুত। ফলে পিছু হটেন তারা। রাস্তা পরিবর্তন করে কুমিল্লার পাহাড়ি এলাকার দিকে অগ্রসর হন সবাই। এ সময় ত্রিপুরার সেনাবাহিনীর ধাওয়ায় বিদ্রোহীরা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে মণিপুর রাজ্যের কাছাকাছি সিলেট পৌছে যান। সীমান্তবর্তী এলাকায় সিলেট লাইট ইনফ্যান্ট্রির মেজর বাইং সেখানে বিদ্রোহীদের উপর হামলা করে। তীব্র যুদ্ধে মেজর বাইং নিহত হন এবং তার অধীন ইংরেজ বাহিনী পরাজিত হয়। পর পর কয়েকটা যুদ্ধে রজব আলীর পক্ষের অনেক লোক মারা যান। যারা বেঁচে ছিলেন আক্রমণের তীব্রতায় শেষ পর্যন্ত তাদের পার্বত্য অঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়।
হাবিলদার রজব আলী শেষবারের মতো যুদ্ধে অবতীর্ণ হন করিমগঞ্জের মালগ্রামে। বিদ্রোহী বাহিনী পার্বত্য এলাকা জেলা কাছাড়, হাইলাকান্দি ইত্যাদি পাড়ি দিয়ে মোহনপুর চা বাগানের নিকটবর্তী সাবাশপুরে অবস্থান নেন। কিন্তু স্থানীয় জমিদারের চরদের মাধ্যমে ইংরেজ বাহিনী সে খবর পেয়ে যান এবং লেফটেন্যান্ট রসের নেতৃত্বে অতর্কিতে হামলা করা হয়। হাবিলদার রজব আলী তার অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হন। যুদ্ধে তার ৭০ জন সিপাহী মারা যান। আহত হয়ে এবং ক্ষুধার যন্ত্রণায় মারা যান আরো কিছু সিপাহী। হাবিলদার রজব আলীসহ তিন বা চারজন সিপাহী শেষ পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন। ইংরেজ বাহিনীর অব্যাহত অনুসরণের মুখে তারা গহীন পাহাড়ী জঙ্গলে হারিয়ে যান। ইংরেজ বাহিনীর ফাইনাল রিপোর্টে বলা হয়, তাদেরকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
SEPOY MUTINY AND THE REVOLT OF 1857, RC Majumder, Calcutta, 1957, page-88 ,মহাবিদ্রোহের কাহিনী, সূত্রে জানা যায় ,হাবিলদার রজব আলী শেষ বারের মত যুদ্ধে অবতীর্ণ হন করিমগঞ্জের মালগ্রামে। বিদ্রোহী বাহিনী পার্বত্য এলাকা জেলা কাছাড়, হাইলাকান্দি ইত্যাদি পাড়ি দিয়ে মোহনপুর চা বাগানের নিকটবর্তী সাবাশপুরে অবস্থান নেয়। কিন্তু ব্রিটিশ সরকারের সুবিধাভোগী স্থানীয় হিন্দু জমিদারদের চরদের মাধ্যমে ইংরেজ বাহিনী সে খবর পেয়ে যায় এবং লেপটেন্যান্ট রসের নেতৃত্বে অতর্কিতে হামলা করে। হাবিরদার রজব আলী তার অল্প সংখ্যক সৈন্য নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হন কিন্তু ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পরাজিত হন।৭০ জন বিদ্রোহী সিপাই মারা যায়।
সোহেল মোঃ ফখরুদ-দীন এর লেখা তথ্য থেকে জানা যায় – ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহ আন্দোলনের মহানায়ক হাবিলদার রজব আলীকে স্মরণ করে বাংলার কবি মোহিনী চৌধুরী ১৯২০ সালে এই বীরদের উদ্দেশ্যে রচনা করে তাঁর বিখ্যাত কালজয়ী কবিতা-
“মুক্তির মন্দির সোপান তলে
কত প্রাণ হল বলিদান
লেখা আছে অশ্রু জলে॥”
এরকম শত শত সাহিত্যিক কবিগণ ভারতীয় উপমহাদেশের বাংলাদেশ নামক দেশের চট্টগ্রামকে নিয়ে কালজয়ী গান, কবিতা, সাহিত্য রচনা করেছেন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনকে নিয়ে। সে রকম একজন বিপ্লবী বীর যোদ্ধা হাবিলদার রজব আলী। যাঁর আত্মদানে আজকের ভারতবর্ষের স্বাধীনতা।
Orlich, Leopold von (১৮৫৮)। The Military Mutiny in India: Its Origin and Its Results (ইংরেজি ভাষায়)। T. and W. Boone, 29, New Bond Street সূত্রে জানা যায় , ১৮৫৭ সালে ভারতবর্ষে সিপাহী বিদ্রোহে তাঁর অগ্রণী ভূমিকার কারণে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয় ও হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলার শাসন ক্ষমতা দখল করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী। পরবর্তীতে সমগ্র ভারতবর্ষ ইংরেজদের দখলে চলে যায়। ভারতবর্ষ ছিল অপার সম্পদে সমৃদ্ধ, ইংরেজরা ছলে বলে কৌশলে এদেশ দখলের পর এর সম্পদ পাচার করে ইংল্যান্ডে ও এদেশবাসীর ওপর অব্যাহত নির্যাতন চালায়। এদেশীয় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাজ্যের নবাব ও রাজা মহারাজাদের ক্ষমতাচ্যুত করা হয়, তাতে ঐতিহ্যবাহী পরিবারগুলো নিঃশেষ হয়ে যায়। হিন্দু মুসলমান বিভেদ সৃষ্টি করে ইংরেজগণ ভারতবাসীর হৃদয়ে ক্ষত সৃষ্টি করে। অচিরেই ভারতবাসী তা বুঝতে পারে এবং বিভিন্ন স্থানে ক্ষুদ্র আকারে হলেও আন্দোলন সংগ্রামে নেমে পড়ে। ক্রমে তা বৃহৎ আকার ধারণ করে।
সূত্রে জানা যায় , ১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে স্বাধীনতা হারানোর মর্মবেদনা ভুলতে পারেনি স্বাধীনতাকামী ভারতবাসী। এর শত বছর পর ১৮৫৭ সালে পরিকল্পিতভাবে সংগ্রাম শুরু হয়। প্রথমে পশ্চিম বাংলার মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুরে ও পরবর্তীতে ব্যারাকপুরে দেশি সিপাহীদের ছাউনিতে বিদ্রোহ সংঘটিত হয়। সিপাহী বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে কানপুর, লক্ষেèৗ, মীরাট হয়ে সমগ্র উত্তর ও মধ্য প্রদেশে। বিদ্রোহীরা দিল্লী দখল করে ভারতের মোগল বংশের শেষ সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরকে (দ্বিতীয়) সম্রাট হিসেবে ঘোষণা দেয় ও তার নেতৃত্বে স্বাধীনতা যুদ্ধ চালায়। কিন্তু প্রথমদিকে ব্যাপক সাফল্য আসলেও পরবর্তীতে বিদ্রোহ ব্যর্থ হয়ে যায়। স্বয়ং সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর বন্দী হন ও তাঁকে চট্টগ্রাম আরাকান সড়ক দোহাজারী হয়ে রেঙ্গুন নির্বাসন দেয়া হয়। রাজপরিবারের শাহজাদাদের হত্যা করা হয়। বাহাদুর শাহ জাফরের সমাধী এখনো রেঙ্গুনে অবস্থিত। সে বছর নভেম্বর মাসে সুদূর চট্টগ্রামের দেশীয় সিপাহীরা হাবিলদার রজব আলী খাঁ’র নেতৃত্বে বিদ্রোহ করেন। চট্টগ্রামে অবস্থান করতো ৩৪ নম্বর দেশীয় পদাতিক বাহিনীর ২, ৩ ও ৪ নম্বর কোম্পানি। ১৮ নভেম্বর (কারও মতে ১২ নভেম্বর, অবশ্য ইসলামিক ফাউন্ডেশনের বাৎসরিক ডাইরীতে ১২ নভেম্বর ব্রিটিশ সিপাহী বিপ্লবের কথা উল্লেখ আছে) দেশীয় সিপাহীরা হাবিলদার রজন আলী খাঁ’র নেতৃত্বে বিদ্রোহ করেন। ইতিপূর্বে কলকাতার ব্যারাকপুরে ও বহরমপুরের কোথাও সংঘবদ্ধ অভ্যুত্থান হয়নি কিন্তু চট্টগ্রামে হয়েছে।
স্বাধীনতা সংগ্রামে চট্টগ্রাম, পূর্নেন্দু দস্তিদার, বইঘর প্রকাশিনী, অক্টোবর ১৯৬৭ ১৮ নভেম্বর ১৮৫৭ সালের রাত ৯ টার দিকে বিদ্রোহীরা গুলি ছুঁড়ে বিদ্রোহ করে। জেলের তালা ভেঙ্গে কয়েদীদের মুক্ত করে। সিপাহীরা আন্দরকিল্লা জামে মসজিদে অবস্থান নেয়। এদিকে ব্রিটিশরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সমুদ্রে জাহাজে আশ্রয় নেন। ইতিহাসবিদদের লেখায় বলা হয় ঐসময় চট্টগ্রাম প্রায় ত্রিশ ঘন্টা ব্রিটিশ শাসনমুক্ত ছিল। ১৯ নভেম্বর শেষ রাতে সিপাহীরা পিলখানা থেকে হাতি নিয়ে সদলবলে চট্টগ্রাম শহর ত্যাগ করে। (হাবিলদার রজব আলী সৈন্যদের নিয়ে যে মাঠে একত্রিত হয়েছিল সে চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক মাঠকে প্যারেড মাঠ হিসেবে চিহ্নিত। বর্তমানে এই প্যারেড মাঠ চট্টগ্রাম সরকারী কলেজের সম্পত্তি) এই বিদ্রোহের সময় গুলি বিনিময়কালে একাধিক বিপ্লবী সিপাহীর মৃত্যু হয়। যাঁদের কবর দেয়া হয় আন্দরকিল্লা জামে মসজিদের আঙ্গিনায়। পরবর্তীতে মসজিদের সম্প্রসারণকালে এই কবরগুলো ভেঙ্গে ফেলা হয়। বিদ্রোহীরা চট্টগ্রাম ত্যাগ করে উত্তর দিকে চলে যায়। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল ঢাকায় অবস্থানরত ৭৩ নম্বর দেশীয় পদাতিক বাহিনীর সাথে যোগ দেয়া। কিন্তু তার আগেই ঢাকায় অবস্থানরত সিপাহীদের অস্ত্র কেড়ে নেয়া হয়। বহু সিপাহীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়।
এদিকে চট্টগ্রামের সিপাহীরা স্থানে স্থানে বাধার সম্মুখীনে ত্রিপুরা হয়ে মনিপুরের জঙ্গলে চলে যায়। দীর্ঘ যাত্রাপথে একের পর এক যুদ্ধ, খাদ্যাভাব ও অসুস্থতার কারণে ধ্বংস হয়ে যায় চারশ’ সিপাহীর এই দেশপ্রেমিক বাহিনী। চট্টগ্রামে সিপাহী বিদ্রোহের মহানায়ক হাবিলদার রজব আলী খাঁ’র কোন সন্ধান আর পাওয়া যায়নি। তিনি চট্টগ্রামের অধিবাসী কিনা তাও এখনো অজানা, তবে অনেক ইতিহাস গবেষক ও বিশ্লেষকদের মতে, হাবিলদার রজব আলী সন্দ্বীপের, আবার কারো মতে তিনি দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়ার হাইদগাঁও, লোহাগাড়া ও দোহাজারী চট্টগ্রাম এর অধিবাসী বলে মনে করেন। যেখানেই তার জন্ম হোক অথবা মৃত্যু হোক তিনি চট্টগ্রামের বিপ্লবী বীর হিসেবে সম্মানিত। তিনি চট্টগ্রামের কালজয়ী মানুষ। তাঁর স্মৃতি চট্টগ্রামের ঐতিহাসিক প্যারেড ময়দান আজও সংরক্ষিত। চট্টগ্রাম এমন হাজারো বিপ্লবীর রক্ত আর পদস্পর্শে ধন্য। বিপ্লবী হাবিলদার রজব আলীর ১৬০তম সিপাহী বিদ্রোহ দিবস ১৮ নভেম্বর ২০১৭। এই দিবসে তাঁকে সহ তাঁর সহযোদ্ধা চারশত বৃটিশ বিরোধী বিপ্লবী বীর যোদ্ধাদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা।
Judicial Proceedings Number 384, 17 September 1857, Government of Bengal, WBSA.তথ্য থেকে যান যায় ,১৮৫৭ সালের ১২ নভেম্বর চট্টগ্রামে ৪শত সিপাহী ৩৪বেঙ্গল রেজিমেন্ট এদেশীয় সৈনিক বৃটিশ শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক দেন। চট্টগ্রামের সিপাইদের মধ্যে ব্যারাকপুরের সিপাইদের একটা দলও ছিলো, ধারণা করা হয় তারাই সেখান থেকে তারা বিদ্রোহের অগ্নিমন্ত্র বহন করে নিয়ে এসেছিল। সিপাহীরা অস্ত্রাগার এবং ট্রেজারীতে হামলা করে অস্ত্র এবং রসদপাতি সংগ্রহ করে।[৬][৭] ঐ সময় বেশ কিছু অফিসার হতাহতের ঘটনা ঘটে। বৃটিশ সৈন্যরা আতংকে সমূদ্রে জাহাজে আশ্রয় নেয়। ঐদিন চট্টগ্রাম ৩০ ঘণ্টা বৃটিশ শাসন থেকে মুক্ত ছিল। বিদ্রোহীরা স্থির করেছিল যে, তারা ইংরাজের রাজত্ব ছেড়ে স্বাধীন ত্রিপুরার নিরাপদ অঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় নেবে।
SEPOY MUTINY AND THE REVOLT OF 1857, সূত্রে জানা যায় , বিদ্রোহী সিপাইদের পরিচালনার ভার এসে পড়ল হাবিলদার রজব আলী খাঁর উপরে। বেঙ্গর রেজিমেন্টের ক্যাপ্টেন পি এইচ কে ডেওলের রিপোর্টে স্থানীয় সূত্রের বরাতে বলা হয় রজব আলী বিদ্রোহী বাহিনীকে নিয়ে ফেনী নদী পার হয়ে ত্রিপুরা সীমানার দিকে যাত্রা করেছেন। তবে তার আগেই চট্টগ্রামের কমিশনার ত্রিপুরা রাজার কাছে সংবাদ পাঠালেন, বিদ্রোহী সিপাইদের প্রতিহত করার জন্য। ত্রিপুরার রাজা ইংরেজদের সাথে হাত মিলিয়ে বিদোহীদের ঠেকানোর জন্য প্রস্ততি নেয়। বিদ্রোহীরা সীতাকুন্ড হয়ে ২রা ডিসেম্বর তারিখে ‘স্বাধীন’ ত্রিপুরার প্রবেশদ্বারে গিয়ে পৌঁছল। গিয়ে দেখল, বহু সশস্ত্র সৈন্য সেখানে তাদের প্রতিহত করার জন্য অপেক্ষা করছে। বাধ্য হয়ে বিদ্রোহীরা কুমিল্লার পাহাড়ি এলাকার দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। কিন্তু ত্রিপুরার সেনাবাহিনী তাদেরকে ধাওয়া করে। অতপর বিদ্রোহীরা দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে মণিপুর রাজ্যের কাছাকাছি সিলেট পৌছে যায়। সীমান্তবর্তী এলাকায় সিলেট লাইট ইনফ্যান্ট্রির মেজর বাইং সেখানে বিদ্রোহীদের উপরে হামলা করে। তীব্র যুদ্ধে মেজর বাইং নিহত হন এবং তার অধীন ইংরেজ বাহিনী পরাজিত হয়। এরপরেও ইংরেজ ও স্থানীয় বাহিনীর সাথে সঙ্গে তাদের খন্ড খন্ড যুদ্ধ হয়। পর পর কয়েকটা যুদ্ধে তাদের পক্ষের অনেক লোক মারা যায়! যারা বেঁচে ছিলো আক্রমণের তীব্রতায় শেষ পর্যন্ত তাদের পার্বত্য অঞ্চলে গিয়ে আশ্রয় নিতে হয়।