অপহরণের মিথ্যা ঘটনা সাজানোর অভিযোগে ফরহাদ মজহার ও তার স্ত্রী ফরিদা আক্তারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের মামলা আমলে নিয়ে তাদের সশরীরে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রবিবার ঢাকা মহানগর হাকিম শুব্রত ঘোষ শুভ প্রসিকিউশন আবেদন আমলে নিয়ে ৩০ জানুয়ারির মধ্যে এই দম্পতিকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেন।
এর আগে গত ২৮ ডিসেম্বর ঢাকা মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে আদাবর থানার নন-জিআর শাখায় প্রসিকিউশন মামলাটি ডাকযোগে পাঠান মামলার বাদী ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মাহাবুবুল ইসলাম। এতে তাদের শাস্তি ও গ্রেপ্তারের আবেদন জানানো হয়েছে।

ফরহাদ মজহার ও তার স্ত্রী ফরিদা আক্তার
গত ৭ ডিসেম্বর বিকালে ঢাকা মহানগর হাকিম খুরশীদ আলম ফরহাদ মজহার ও তাঁর স্ত্রী ফরিদা আখতারের বিরুদ্ধে ২১১ ও ১০৯ ধারায় প্রসিকিউশন দেওয়ার আদেশ দেন। এর আগে গত ১৪ নভেম্বর ফরহাদ মজহার অপহরণ মামলার চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে ভুক্তভোগী ফরহাদ মজহার ও মামলার বাদী তাঁর স্ত্রী ফরিদা আখতারের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা করার অভিযোগ আনে পুলিশ।
গত ৩১ অক্টোবর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মাহাবুবুল ইসলাম আদালতে কবি ও প্রাবন্ধিক ফরহাদ মজহারকে অপহরণ করে চাঁদা দাবি করার অভিযোগে যে মামলা দায়ের করা হয়েছিল সেটিতে অভিযোগের বিষয়ে সত্যতা প্রমাণিত না হওয়ায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন।
অপরদিকে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বিভ্রান্ত ও হয়রানির অভিযোগ দণ্ডবিধির ২১১ ও ১০৯ ধারায় ফরহাদ মজহার ও তার স্ত্রী ফরিদা আক্তারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন মামলার অনুমতি চান তদন্ত কর্মকর্তা।
গত ৩ জুলাই ভোরে শ্যামলীর রিং রোডের ১নং হক গার্ডেনের বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হন ফরহাদ মজহার। পরে স্ত্রীকে নিজের মোবাইল ফোনে জানান, কে বা কারা তাকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। তাকে মেরেও ফেলা হতে পারে। সন্ধ্যা পর্যন্ত ছয়বার কল করে ৩৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নিয়ে মোবাইল ট্র্যাকিং করে তার অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হয় এবং ১৯ ঘণ্টা পর যশোরের অভয়নগরে হানিফ পরিবহনের একটি বাস থেকে তাকে উদ্ধার করে।
ফরহাদ মজহারের নিখোঁজের ঘটনায় ওই দিন রাতেই স্ত্রী ফরিদা আক্তার বাদী হয়ে আদাবর থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন।
উল্লেখ্য, গত ৩ জুলাই ভোররাতে মোহাম্মদপুর লিংক রোডের হক গার্ডেনের নিজ বাসা থেকে বের হন ফরহাদ মজহার। এরপর ভোর ৫টা ২৯ মিনিটে তিনি তার স্ত্রীকে ফোন করে জানান, ‘ফরিদা, ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ পরে তার স্ত্রী আদাবর থানায় অভিযোগ করেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার রাতে র্যাব-৬ যশোর নওয়াপাড়া থেকে তাকে উদ্ধার করে মিন্টো রোডের গোয়েন্দা কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জবানবন্দি দেওয়ার জন্য তাকে আদালতে পাঠানো হয়েছিল।
আখতারের মৌখিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রযুক্তির সাহায্যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা জানতে পারেন ফরহাদ মজহারকে গাবতলী, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, যশোর হয়ে খুলনার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুলনা থেকে ঢাকায় আসার পথে ফরহাদ মজহারকে যশোরের নওয়াপাড়ায় হানিফ বাস থেকে উদ্ধার করে। ৪ জুলাই তাকে ঢাকায় আনার পর আদালতে নেওয়া হলে তিনি ১৬৪ ধারায় ভিকটিম হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দেন। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
এ ঘটনায় ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতার বাদী হয়ে সোমবার (৩ জুলাই) রাতেই আদাবর থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। ওই মামলার তদন্তভার প্রথমে আদাবর থানা ও পরবর্তীতে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
১০ হাজার টাকা মুচলেকায় তাঁকে নিজ জিম্মায় বাড়ি যাওয়ার অনুমতি
০৪ জুলাই ২০১৭ তারিখে মজহারকে তাঁর নিজ জিম্মায় দিয়েছেন আদালত। এর আগে বেলা ৩টা থেকে বিকেল ৫টা ৪০ মিনিট পর্যন্ত তিনি জবানবন্দি দেন। ঢাকার মহানগর হাকিম আহসান হাবীব তাঁর জবানবন্দি রেকর্ড করে ১০ হাজার টাকা মুচলেকায় তাঁকে নিজ জিম্মায় বাড়ি যাওয়ার অনুমতি দেন।
আদালত ফরহাদ মজহারের কাছে জানতে চান, তিনি নিজ জিম্মায় যেতে যান কি না? জবাবে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই যেতে চাই।’ আদালতে তাঁকে বিমর্ষ দেখা গেছে।
বিকেল ৫টা ৫২ মিনিটে একটি মাইক্রোবাসে করে আদালত প্রাঙ্গণ ত্যাগ করেন ফরহাদ মজহার। এ সময় সাংবাদিকেরা তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চান। তবে তিনি কথা বলতে চাননি।
জানতে চাইলে ফোনে ফরিদা আখতার প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বামীকে ফিরে পেয়েছি। এতেই খুশি।’
আদালত সূত্র জানা যায়, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির পরিদর্শক মাহবুবুল ইসলাম মামলায় চূড়ান্ত প্রতিবেদন সম্প্রতি ঢাকার মহানগর মুখ্য হাকিম আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় জমা দেন। এতে বলা হয়েছে, ফরহাদ মজহার অপহরণের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়নি। মিথ্যা তথ্য দিয়ে মামলা করায় দণ্ডবিধির ২১১ ও ১০৯ ধারায় মামলার বাদী ও ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতার এবং ভুক্তভোগী ফরহাদ মজহারের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন দাখিলের আবেদন করা হয়।
ফরহাদ মজহারের পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, গত ৩ জুলাই ভোর পাঁচটার দিকে শ্যামলীর হক গার্ডেনের বাসা থেকে বের হন ফরহাদ মজহার। ভবনের সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, ভোর ৫টা ৫ মিনিটে ফরহাদ মজহার খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামেন। ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফরহাদ মজহার স্ত্রী ফরিদা আখতারকে ফোন করে বলেন, ‘ওরা আমাকে নিয়ে যাচ্ছে। ওরা আমাকে মেরে ফেলবে।’ এ ঘটনায় রাজধানীর আদাবর থানায় ফরহাদ মজহারের স্ত্রী বাদী হয়ে মামলা করেন।
সেদিন রাত সাড়ে ১১টার দিকে যশোরের অভয়নগর এলাকায় খুলনা থেকে ঢাকাগামী হানিফ পরিবহনের একটি বাস থেকে তাঁকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারের পর প্রথমে ফরহাদ মজহারকে খুলনায় পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। পরে সেখান থেকে সকাল পৌনে ৯টার দিকে তাঁকে ঢাকার আদাবর থানায় আনা হয়। এরপর নিয়ে যাওয়া হয় মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে, সেখান থেকে আদালতে নিয়ে যাওয়া হয়। ভিকটিম হিসেবে সেদিন তিনি আদালতে জবানবন্দি দেন। পরে তাঁকে নিজের জিম্মায় দেন আদালত।
ফরহাদ মজহারের বিষয়ে আদালতে সাক্ষী হিসেবে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়ে আলোচনায় এসেছেন এক নারী। অর্চনা নামের ওই নারী আগে ফরহাদ মজহার ও তার স্ত্রী ফরিদা আখতার পরিচালিত বেসরকারি সংস্থা উবিনীগ-এর কর্মী ছিলেন। সোমবার (১১ জুলাই) ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম সত্যব্রত শিকদারের আদালতে কঠোর গোপনীয়তার মধ্যে অর্চনা সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন।
অর্চনা তার জবানবন্দিতে বলেন, ‘আমার বাড়ি মঠবাড়িয়ায়। বাবার সঙ্গে ঝগড়ার কারণে পিরোজপুর শহরে মামার বাড়িতে চলে আসি আনুমানিক ২০০৫ সালের শেষ দিকে। ২০০৬ অথবা ২০০৭ সালের মাঝামাঝি ফরহাদ মজহারের এনজিও উবিনীগে চাকরি পাই। ২০০৭ সালের দিকে আমি চাকরি পেলে ১৫ দিনের ট্রেনিংয়ের জন্য টাঙ্গাইলে যাই। সেখানে ট্রেনিং শেষে আমি কক্সবাজার ব্রাঞ্চে যোগদান করি। কক্সবাজারে চাকরির সময়ে ফরহাদ মজহারের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। এরপর আমি ঈশ্বরদীতে বদলি হয়ে আসি। সেখানে থাকাবস্থায় আমি ফরহাদ মজহারের ভক্ত হই। তার কাছে দীক্ষা নেই। তাকে ‘গুরুবাবা’ বলে ডাকতাম। তিনি আমাকে ফকির ও বৈষ্ণব আদর্শে অনুপ্রাণীত করেন।
অর্চনা বলেন, ‘একবছর পর টাঙ্গাইলে বদলি হই। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতার… আমাকে চাকরি থেকে বের করে দেন। চাকরি থেকে বের করে দেওয়ার পর ফরহাদ মজহারের সঙ্গে আমার মোবাইলে যোগাযোগ হতো। এরপর বর্তমান বাসায় গুরুবাবা মাঝে মাঝে আসতেন। … গুরুবাবা মাঝে মাঝে আমার প্রয়োজন মোতাবেক ১০/১২ হাজার করে টাকা দিতেন। অসুখ-বিসুখ হলে বেশি টাকা দিতেন।… আমি ভাটারা এলাকায় টিফিন ক্যারিয়ারে ভাত-তরকারি সরবরাহ করেও টাকা আয় করতাম।’
অর্চনা বলেন, ‘১৬/৪/২০১৭ ইং তারিখ … গুরুবাবার কাছে টাকা চাই। গুরুবাবার কাছে টাকা না থাকায় তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। ০৩/০৭/২০১৭ ইং তারিখ সকাল ৬টা ২০ মিনিটে গুরুবাবা ফোন করে আমাকে জানান, তোমার টাকা সংগ্রহের জন্য বাহির হয়েছি। চিন্তা করো না। ০৩/০৭/১৭ ইং তারিখ সকাল ১১টায় আমি গুরুবাবাকে মোবাইল ফোনে জিজ্ঞাসা করি, আপনি অপহৃত হয়েছেন কিনা? তিনি আমাকে বলেন, কোনও সমস্যা নাই। আমি ভালো আছি। এরপর সন্ধ্যা ৭ টার দিকে গুরুবাবা আমাকে মোবাইল করে একটি অ্যাকাউন্ট নম্বর চান। তখন আমি তাকে ডাচবাংলা ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট নম্বর পাঠাই। তিনি আমাকে দুটি নম্বর থেকে ১৫ হাজার টাকা পাঠান। আমার কাছে জিজ্ঞাসা করেন, টাকা পেয়েছি কিনা? আমি বাসায় এসে মোবাইল ফোন চেক করে টাকা পাওয়ার কথা জানাই। পুনরায় তিনি আমাকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করেন, আমি খেয়েছি কিনা? ভক্তি দিয়েছি কিনা? তিনি কথা বলার পর ফোন কেটে দেন। ০২/০৭/২০১৭ তারিখ গুরুবাবার সঙ্গে মোট ২-৩ বার কথা হয়। ০৩/০৭/২০১৭ তারিখ গুরুবাবা মোট ৫-৬ বার ফোন করেন। আমি ২-৩ বার ফোন করি। এরপর আমি ০৪/০৭/১৭ ইং বিকাল ৬ টায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় আমার আত্মীয় রবি সমাদ্দারের শ্বশুড়বাড়ি বেড়াতে যাই। ০৯/০৭/১৭ তারিখে ডিবি পুলিশ আমাকে রাঙ্গুনিয়া থানা পুলিশের সহায়তায় ঢাকা নিয়ে আসে। পরে পুলিশ আমার বাসা হতে মোবাইল ফোন ও ডায়েরি উদ্ধার করে। এই আমার জবানবন্দি।’