জুলাই বিপ্লবকে আমরা ধারণ করি বলেই কখনো কোনো প্রকার ক্রেডিট নিয়ে কাড়াকাড়ি করি নি। কিন্তু এটাকে সুযোগ হিসেবে নিয়ে একটা শ্রেণী উঠেপড়ে লেগেছে ইতিহাসকে বিকৃত করতে। যেমন কার্জনের হলগুলো(শহীদুল্লাহ হল) থেকে ছাত্রলীগ তাড়ানোর ব্যাপারটা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রলীগ মুক্ত কল কিন্তু কার্জনের তিনটে হলই। 15 জুলাই দুপুরের পর থেকে কখনো ছাত্রলীগ আমাদের দুর্গে ঢুকতে পারে নি!
এবার আসি আসল কাহিনীতে….
১৪ জুলাই রাতে মেট্রো স্টেশনের নিচের রাজাকার রাজাকার স্লোগানের যে ভিডিওটি দেশ ও বিশ্বজুড়ে সমাদৃত হয়েছিল সেই মিছিলটিও ছিলো কিন্তু কার্জনের তিনটে হলের। ওইদিন রাতেই যারা বোঝার তারা বুঝে গিয়েছিলো এই সরকারের ঘুঁটি নড়ে গেছে।
তার পরের দিন দুপুরে বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বেলা ১১ টায় রাজুতে আমাদের সমবেত হওয়ার কথা। আগেরদিন রাতে কিছু ভাইটাল ফুটবল ম্যাচ থাকায় বিশেষ করে ছেলেদের রাজুতে পৌঁছাতে দেরি হয়েছিলো। রাজুতে গিয়ে আমরা খবর পাই, আমাদের হলপাড়ার কিছু ভাইকে আন্দোলনে আসতে বাধা দিচ্ছে ছাত্রলীগ। খবর পেয়েই প্রায় ৩০০/৪০০ আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের একটা মিছিল হল পাড়ার দিকে রওনা হই। সেই মিছিলের স্লোগান ছিল,
“বাধা দিলে বাধবে লড়াই,
সেই লড়াইয়ে জিততে হবে।”
মাইকে স্লোগান ধরছিলেন
Md. Abu Baker Mojumder ভাই। আমাদের মিছিল গিয়ে বঙ্গবন্ধু হল ও শহীদ জিয়াউর রহমান হল থেকে শান্তিপূর্ণ ভাবেই আটকে থাকা শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে দিয়ে আসে। কিন্তু ঝামেলার শুরুটা হয় বিজয় একাত্তর হল থেকে। সেখানে আমাদেরকে ছাত্রলীগের কিছু নেতা কর্মী বাধা দেয়। আর সেখান থেকে ১৫ জুলাইয়ের ঝামেলার সুত্রপাত হয়। তারপর শুরু হয় ইট পাটকেল ছুড়াছুড়ি, ধাওয়া – পাল্টা ধাওয়া। ঘটনা শুরুর প্রায় আধ ঘণ্টা পর রাজুতে থাকা সকল শিক্ষার্থী ভিসি চত্বর হয়ে মল চত্বর/ সূর্যসেন হলের সামনের রাস্তায় চলে আছে। সেখানে আমরা অবস্থান গতভাবে দুর্বল জায়গায় ছিলাম । আর সেই সুযোগটাই নেয় ছাত্রলীগ।
ছাত্রলীগের হ্যালমেট বাহিনী আমাদের নিরস্ত্র ভাই – বোনদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। যাকে যেভাবে পেয়েছে গণ পিটুনি দিয়েছে। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের কারো মাথা ফেটেছে, করো হাত ভেঙেছে, কারো পা ভেঙেছে। ওইদিন আমরা যত রক্ত দেখছি তত রক্ত কেউ এক জীবনেও দেখে না।
আমাদের নিরস্র নির্দোষ আপু ভাইদের প্রতি যখন বর্বর হামলাটি হয় তখনি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম, ” হয় ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগ থাকবে নইলে আমরা থাকবো!”
হামলার এক পর্যায়ে ভিসি চত্বরের রাস্তায় এক ভাইকে পড়ে থাকতে দেখি। মারাত্বক ভাবে মাথা ফেটেছে তার! অনেক বেশি ব্লিডিং হচ্ছে। ভালোভাবে খেয়াল করতেই দেখি ভাইটি কিছু একটা বলার চেষ্ঠা করছে। ভাইয়ের মুখের কাছে কান নিতেই শুনি ভাই বলছে, ” আমার আম্মাকে একটা ফোন দেন। আমি আর বাঁচবো না মনে হয়। আম্মার সাথে কথা বলবো, আম্মার সাথে একটু কথা বলবো।”
তখনি কয়েকজন মিলে ভাইটিকে ধরে DMC তে নিয়ে আসি। তারপর DMC তে ঘন্টা খানেক ছিলাম। এই ১ ঘণ্টায় প্রায় ১০০+ আন্দোলকারী আহত শিক্ষার্থীকে DMC তো ভর্তি করিয়েছি আমরা কয়েকজন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থী। এই ১০০ জনের ভেতরে সম্ভবত ৯০ জনই ছিলো মাথা ফাটা আহত শিক্ষার্থী। কখনো এতো তাজা রক্ত দেখিনি এর আগে। এতো পরিমাণ তাজা রক্ত দেখে আর নিতে পারছিলাম না, শরীর খারাপ করতে শুরু করে। মাথা ঝিম ঝিম করছিলো, বমি আসছিলো। তখন বাধ্য হয়েই হলে(শহীদুল্লাহ হল) ফিরে আসি।
এসে দেখি জুনিয়ররা হলের মেইন বিল্ডিং এর সামনে দাড়িয়ে আছে। সবার মুখেই ক্রোধের আগুন। সবাই বলতেছে ছাত্রলীগকে আজকে হল ছাড়া করবো। যেই ছাত্রলীগ তার জুনিয়রকে বাইরে থেকে টোকাই ভাড়া করে এনে মারে তাদের সাথে আমরা আর থাকতে পারবো না।
আমরা তখনি মেইন বিল্ডিং এর ভেতরে যাই। ছাত্রলীগের যে নেতাকর্মীরা সরাসরি আন্দোলন এর বিরোধিতা করেছে বা আমাদের উপর হামলা করছে তাদের রুম ভাংচুর করে রুমের জিনিসপত্র সব বাইরে ফেলে দিই। আর এই দিনটাই ছিলো সাইন্স এর হলে ছাত্রলীগের শেষ দিন!
রুম ভেঙে যখন আমরা আবার মেইন বিল্ডিং এর সামনে আসি তার একটু পরেই শুনতে পাই টোকাইদের হাকডাক। ছাত্রলীগ এতক্ষন তাদের রুম ভাঙার খবর কিছু বিশ্বাসঘাতকের কাছ থেকে পেয়ে গেছে। তারা এখন আমার শহীদুল্লাহ হলে হামলা করতে এসেছে। কতটা নির্লজ্য আর বেহায়া হলে নিজের হলের উপর কেউ হামলা করতে পারে।
তারপরের ৩/৪ ঘটা ছিলো আমাদের জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার একটি। ব্রেইন ডেড হওয়ার আগ পর্যন্ত এই দিনটার কথা আমরা ভুলতে পারবো না! প্রায় ৪/৫ হাজার ছাত্রলীগের টোকাইদেরকে আমরা মাত্র ৫০০/৬০০ শিক্ষার্থী মিলে প্রতিহত করেছি। মোটা দাগে বলতে গেলে ৬০/৭০ জন।
সম্মুখ যুদ্ধটি আমরা অনেক কৌশল এ করেছি। নইলে আমাদের ক্ষুদ্র শক্তি দিয়ে তাদের সাথে এতক্ষন সার্ভাইব করতে পারতাম না। আমাদের একটা অংশ অবস্থান নেয় তিনতলা ক্যান্টিন এর ছাদে। কয়েকজন অবস্থান নেয় মসজিদের ছাদে। আর বাকিরা থাকে গ্রাউন্ড এ।
ছাত্রলীগের করো হাতে ছিল পিস্তল, করো হাতে ধারালো রাম দা, করো হাতে চাপাতি, করো হাতে হকিস্টিক, করো কাছে ছিলো ককটেল। বেশিরভাগই ছিলো হেলমেট পরিহিত। এক কথায় ওরা ছিলো সশস্ত্র।
আর আমরা ছিলাম নিরস্র! কিন্তু আমদের একটা জিনিস ছিলো। সেটা হলো মাতৃভুমির প্রতি ভালোবাসা, সততা আর আল্লাহর রহমত। নইলে আমাদের কোনভাবেই সেই যুদ্ধে টিকে থাকার কথা ছিলো না।
ওইদিন আমি/আমরা/আমাদের কিছু সাহসী সহযোদ্ধা যা কিছু করেছি তা এখন চিন্তা করলেও গায়ে কাটা দিয়ে উঠে। আমাদের হেলমেট পড়া লোক ছিলো ৩৫/৪০ জন মতো। এই লোকগুলোই শুধু গেটের বাইরে গিয়ে সম্মুখ যুদ্ধ করেছে। এক দিকে কয়েক হাজার আর অন্যদিকে ৩৫/৪০ জন অকুতোভয় দেশপ্রেমী অদম্য সাহসী যোদ্ধা। যারা নিচে ফাইট করছিলাম তাদেরকে একটা ভালো সাপোর্ট দেয় ক্যান্টিনের ছাদে থাকা সহযোদ্ধারা। আমাদের পর্যাপ্ত হেলমেট ছিলো না। অনেককে দেখছি ক্রিকেট এর হেলমেট পড়ে সম্মুখ যুদ্ধ করতে, আমরা বন্ধ Touhid Akram কে দেখেছি মাথায় বালিশ বেঁধে ছাত্রলীগের সাথে সামনাসামনি ফাইট করতে।
যুদ্ধের একটা সময়ের কথা আমি কখনো ভুলবো না। তখন ছাত্রলীগ এর একটা অংশ ছিলো ঢাকা মেডিকেল এর সামনের রাস্তাটায় আর আমরা ছিলাম আমাদের হল গেটের দিকে। ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার একটা মুহূর্তে আমি ছিলাম আমাদের দলের সবার সামনে আর ছাত্রলীগের বাহিনীর সবার সামনে ছিলো আমারই হলের দুই কুলাঙ্গার সিনিয়র ভাই। ওরা দুজন শুধু আমাকে দেখেছিলো আর আমি শুধু দেখেছিলাম তাদের দুইজনকে। ওই মুহূর্তটাতে কয়েক সেকেন্ড আমি স্থির দাঁড়িয়ে ছিলাম। ভেবেছিলাম আমাকে অন্তত ঢিল দিবে না। অল্প সময় পরেই বুঝতে পারি আমি আসলে ভুল ছিলাম। আমার দুই হতে দুইটা ইট থাকার পরেও আমি ওদেরকে ঢিল মারি নি কিন্তু ওরা ঠিকই মেরেছিলো!
যুদ্ধের এক মুহূর্তে ওরা আমদের দিকে গুলি, ককটেলও ছুঁড়ে। কিন্তু ভাগ্য ভালো থাকতে আমাদের কারো তেমন কোনো ক্ষতি হয় নি।
একবার ওদেরকে আমরা ধাওয়া দিয়ে দোয়েল চত্বর পর্যন্ত দিয়ে আসছিলাম। তারপর ওরা আমাদেকে আবার ধাওয়া দেয়। হল গেটে গেটে চলে ননস্টপ ইট পাটকেল নিক্ষেপ। অবস্থা এতটাই খারাপ ছিলো যে কোনো সংবাদকর্মী তখন স্পটে আসতে পারছিলেন না।
শেষ পর্যন্ত আকাশ রক্তিম করে সন্ধ্যা নামে। আর সাজানো পুলিশ বাহিনী এসে ঘটনা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। আর শেষ হয় আমাদের সেই যুদ্ধ! ছাত্রলীগ হয় হল ছাড়া!
১৫ জুলাইয়ের এই সম্মুখ যুদ্ধে ফ্রন্টলাইনে ছিলো শহীদুল্লাহ ও ফজলুল হক হলের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। সবাই আমার/আমাদের পরিচিত। কেউ সিনিয়র, কেউ ব্যাচমেট আর কেউ জুনিয়র। মানে সব আমরাই ছিলাম। এখানে কেউ কোনো গুপ্ত সংগঠনের ছিলো না। যদি কোনো কর্মী থেকেও থাকে তাহলে ফ্রন্ট লাইনে ছিলো না অন্তত। আর প্লানিং এ তো ছিলোই না। প্লানিং এ আসলে থাকবে কিভাবে। কিছুই তো প্ল্যান করে করিনি।
যারাই ইতিহাসকে বিকৃত করতে চাচ্ছেন বা করছেন তাদেরকে তারা ভুলেও এই কাজটি করতে যাবেন না। লড়াইটা আমাদের অস্তিত্বের লড়াই ছিলো। আমরা জীবন বাজি রেখে সেদিন লড়াই করেছিলাম। আমরা কখনো ক্রেডিট চাইনি, চাইবো কেন? ক্রেডিটের জন্য তো আমরা জীবন বাজি রাখিনি!
কিন্তু একটা কথা সাফ সাফ বলে দিচ্ছি, ১৫ জুলাই শহীদুল্লাহ হলকে ছাত্রলীগ মুক্ত করেছিলাম আমরা। আমার সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কোনো গুপ্ত সংগঠন করে নি!!
- সৈয়দ ইব্রাহীম খলিল
-
Studies at University of Dhaka
Studies at Department of Nuclear Engineering, University of Dhaka